Thursday, May 26, 2022
Homeজাতীয়একটি দূর্লভ অর্কিড : ফারাহ তাসকিন

একটি দূর্লভ অর্কিড : ফারাহ তাসকিন

একটি দূর্লভ অর্কিড : ফারাহ তাসকিন

ঢাকা ১৪ মে ২০২২ :

ঝকঝক করছে গ্রীষ্মের রূপালী দুপুর, টাইলসের স্বচ্ছ আয়নার মতো মেঝেতে গভীর নীল আকাশের ছায়া পড়েছে, এমন কী ভাসন্ত মেঘের প্রতিবিম্বও দেখা যাচ্ছে। গরম কালে তেষ্টার মতো ক্লান্তিটাও বড্ড বেশী লাগে, টাইলস বাধানো ঠাণ্ডা ফ্লোরে গা এলিয়ে বসে আছে এপ্রিল। এপ্রিল মাসে ওর জন্ম, তবু গরম ওর আদৌ পছন্দ নয়। চিটচিটে, দুঃসহ, বিচ্ছিরী সিজন।

মেঝেতে ঠাণ্ডায়, বাতাসের স্পর্শে শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে, রোদ্দুরের দাপট নেই দখিনের এই বারান্দায়। কটা দিন ভীষণ ধকল গেল ওর ওপর দিয়ে, মা টা যে কী কাণ্ড করে বসে না! বাসার খুব কাছেই মার্কেটটা, মার কিছু জিনিস কেনার প্রয়োজন ছিল, মা এপ্রিলকে নিয়ে তাই বের হয়েছিল। পায়ে হেঁটেই দুজন মার্কেটে গেল, ফিরছিলও পায়ে হেঁটে, আর দেখো দেখি কাণ্ড! মাঝ পথে জিনিসপত্র মাটিতে ফেলে মা দুম করে অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ল। হিট স্ট্রোকের কারণে, বাসায় ফেরার পর, ডক্টরকে ডেকে আনা হলে তিনি তাই বলেছেন ।

রাস্তা বোঝাই মানুষের সামনে কী জঘন্য ব্যাপার, ইস! পোটলাপুটলিগুলো হাত থেকে ঝপাস করে ফেলে দিয়ে, এপ্রিল ঝুঁকে মাকে নিয়ে অস্থির, বেসামাল হয়ে পড়েছিল, কৌতুহলী মানুষেরা ভীড় করে দেখছিল ওদের, কেউ এগিয়ে এসে সাহায্য করার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন বোধ করেনি। অসহায় এপ্রিল কী করে পরিস্থিতি সামাল দেবে, একদমই বুঝতে পারছিল না। ফোন করে হেল্প চাওয়ার কথা মনেই আসেনি তখন।

মাকে নিয়ে কয়েক মিনিট এভাবে কাটানোর পর, ভীড় ঠেলে হাজির হল, এক স্মার্ট চেহাড়ার সুন্দর তরুণ। ব্যাস্তভঙ্গীতে এগিয়ে এসে মার মাথাটা কোলের ওপর তুলে নিল, অকৃত্রিম আন্তরিক গলায় জিজ্ঞেস করল, আপনার মা? কৃতজ্ঞ এপ্রিলের চোখ ততক্ষণে ভিজে গেছে, বলল, আমার মা, কী করি বলুন তো? বলতে গিয়ে গলাটা যেন একটু কেঁপে গেল। তরুণটি জানতে চইল, আপনাদের বাসা কোথায়?

পরে সেই তরুণটি মাকে পাঁজাকোলা করে বাসা অবধি পৌঁছে দিল। এপ্রিল ছেলেটিকে অবশ্য দোরগোড়াইে বিদেয় করেনি, সেরকম মানসিক অবস্থা নিয়েই ড্রইংরুমে বসিয়ে সাধ্যমতন আপ্যায়ণ করেছে। জেনেছে, ছেলেটির নাম তীর্থ। থাকে এপ্রিলদের পাশের মাল্টি স্টোরিডটায়। অল্প দিনের আলাপ, অথচ এপ্রিলের মনে হচ্ছে তীর্থ ওর বহুদিনের চেনা।

এপ্রিল গতবছর প্রাইভেট কলেজের লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছে, অল্প কটা দিন ক্লাস নিতে না নিতেই কলেজ বন্ধ হয়ে গেলো করোনা মহামারীর কারণে। কলেজের পরিবেশ, কলিগদের এবং স্টুডেন্টদের খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভাল লাগতে শুরু করেছিল, হঠাৎই এই ছন্দপতন। মাস্টার্স করার সময়ই এপ্রিলের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে বোনের দেওর আর্যর সঙ্গে। এপ্রিলের বড় বোন এরিসের বিয়ে হয়েছে বছর চারেক হল, এরিসের ঘর আলো করে ভারী ফুটফুটে একটা ছেলে আছে। এরিস বিয়ের পরপরই হাসবেন্ডের সঙ্গে নিউ ক্যারোলিনা চলে গেছে। বছরে একবার আসে স্বদেশে। এরিস বিয়ে করে প্রবাসী হওয়ার পর থেকেই একাকীত্ব বাসা বেধেছে এপ্রিলের মনে।

আর্যকে কখনোই তেমন ভালো লাগেনি এপ্রিলের, দেখতে শুনতে খুবই সাধারণ, তবে প্রফেশনাল ব্যারিস্টার। বাবা-মার আর্যকে খুবই পছন্দ। এরিসের শ্বাশুড়ী যখন এপ্রিলকে নিজের ছোট ছেলের বউ করতে চাইলেন, সবাই খুশী হল, কেবল এপ্রিল ছাড়া। তবু সেই মনের ভাব মনেই চেপে রাখল, ওপর দিয়ে কাউকে কিছু বুঝতে দেয়নি। এপ্রিলের ধারণা, আর্যকে যদি ও ফিরিয়ে দেয়, তবে এরিসের মাদার-ইন-ল আর ফাদার-ইন-ল বিষয়টা ভাল চোখে দেখবেন না। এপ্রিল এরিসকে খুব ভালোবাসে, এরিস ওর কারণে কোন প্রবলেমে পড়ুক, এটা এপ্রিলের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়, বরং, আর্যকে বর হিসেবে মেনে নেয়া তারচে’ অনেক বেশী সহজ।

এরিস একদিন হাসতে হাসতে ঠাট্টা করে ফোনে বলছিল, জানিস, আর্য শ্রেষ্ঠত্ব সবসময়ই অনার্যের ওপর হা হা! এপ্রিল প্রতিবাদ- করেছে এই পান্ডব বর্জিত বঙ্গে আর্য সন্তান আসবে কী করে শুনি! এখানে কেউ ভুল করে এসে পড়লে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হত, জানিস না বুঝি?

সবার সুখের কথা বিবেচনা করে আর্যকে নিজের হবু হাসবেন্ড হিসেবে মেনে নেয়ার পর গোপন এক যন্ত্রণা ওর মনকে আছন্ন করে রেখেছে। কাউকে বলে বলে না, জানায়ও না, মনে মনে শুধু গুমড়ে মরে।

নিরালা দুপুরে দখিনা হাওয়ায় আর্যর কথা মনে পড়ছে না এপ্রিলের। গোপন পাপের মতো মনে বাসা বেঁধেছে তীর্থের ভাবনা। তীর্তের কথা ভাবতে ভাবতে খেয়াল হল, কাজটা  ঠিক হচ্ছে না, খুব নিষিদ্ধ এক নেশা এপ্রিলকে পেয়ে বসেছে। না এমনটা চলতে দেয়া যায় না। অল্প দিনের স্বল্প পরিচিত তীর্থকে ভুলে যাওয়ায়টাই বুদ্ধিমানের কাজ।

দেখা গেল কয়েক মাসের মধ্যেই তীর্থ এপ্রিলদের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছে। মানুষকে কেমন করে আপন করে নিতে হয়, সেটা খুব ভাল করেই জানে তীর্থ। এপ্রিলের মা বাবার মনেও  তীর্থ একটা পাকাপোক্ত আসন করে নিয়েছে। এপ্রিল যদিও কোএডুকেশানে পড়েছে; তবুও ছোটবেলা থেকেই ও ছেলেদের সঙ্গে সহজভাবে মিশতে পারে না। অশ্চর্য ব্যাপার হল, এপ্রিলের তীর্থর সঙ্গে এমনিই বন্ধুত্ব হয়েছে, কোন মেয়ে সঙ্গেও বোধ হয় ওর এতো সুনিবিড় ফ্রেন্ডশিপ হয়নি। তীর্থর মধ্যে এমন একটা সরলতা আছে। মা-বাবাও তীর্থ, এপ্রিলের বন্ধুত্বের মাঝে সন্দেহের কোন আবকাশ খুঁজে পায়নি।

কিন্তু এপ্রিল জানে, তীর্থ এপ্রিলের জন্যে শুধু বন্ধু নয়, বন্ধুত্বের বাইরে যে ভালোবাসার একটা বিশাল পৃথিবী আছে, সেই জগতের বাসিন্দা। তীর্থ একদিন দ্ষ্টুুমী করে এপ্রিলকে বলেছিল, আমি তোমাকে এপ্রিল ফুল বলে ডাকব! দু’মাস হল ওরা দু’জন দু’জনকে তুমি বলে সম্বোধন করে, তাতেও বাবা মার আপত্তি নেই। এপ্রিল ভ্রুকুটি করল, এপ্রিল ফুলের পেছনে খুব নির্মম একটা ইতিহাস আছে, এটা মজার ব্যাপার না। তীর্থ তৎক্ষণাত নিজের ভুলটা ধরতে পারে, লজ্জিত মুখে বলে, সরি। তীর্থকে লজ্জা পেতে দেখে খুব মজা পায় এপ্রিল; খিলখিল করে হাসে। আমি তোমায় তীর্থের কাক বলে ডাকব, কেমন? তীর্থও হাসিতে যোগ দেয়।

ওপর দিয়ে খুব সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক দুজনের, কিন্তু এপ্রিল ভেতরে ভেতরে তলিয়ে যায় প্রেমের চোরাবালিতে। তীর্থ হয়ত এপ্রিলকে সেই চোখে দেখে না, তাতে এপ্রিলের কিছুই এসে যায় না, পৃথিবীতে প্রেম তো অনেক সময়ই হয় একতরফা।

তীর্থ, আর্যর কথা জানে, মাঝেসাঝে আর্যকে নিয়ে তরল রসিকতা করে এপ্রিলের সঙ্গে! আর্যও তীর্থের কথা জানে, আর্য জটিল মনের মানুষ বোধ হয়, এপ্রিলের প্রায়ই মনে হয় আর্য তীর্থকে সহ্য করতে পারে না। আর্যর হাবে ভাবে সেটা বুঝতে পারে এপ্রিল, অবশ্য এপ্রিলের বাবা-মা সেটা বুঝতে পারে না, বুঝতে পারলে তীর্থ প্রতি নিশ্চয়ই ওদের দূর্বলতাটা থাকত না। এপ্রিল নিজেও বাবা-মাকে সেটা বুঝতে দেয় না।

আজ ফ্রাইডের সন্ধ্যেতে এক ঝলক টাটকা রজনীগন্ধার সৌরভ ছড়িয়ে তীর্থ এসেছে, হাসি, ঠাট্টা, হল্লোর দিয়ে মাতিয়ে রেখেছে মা, বাবা, এপ্রিলকে। সাধাসিধে মনের নয়নকাড়া এই ছেলেটা খুব হুল্লোর করতে পারে। তীর্থকে যতই দেখে ততই মনে মুগ্ধ হয় এপ্রিল। এপ্রিল তখন মোটেই নিঃসঙ্গ বোধ করে না, সেদিন এরিসও ফোনে অনুযোগ করছিল, বলি, ব্যাপারটা কী? আগে তো ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন করতিস আমাকে। আর এখন তুই যেন অমবস্যার মুন, ফোন করলেও সবসময় রিসিভ করিস না! এত কীসের ব্যস্ততা তোর? সেদিন আর্যকে ফোন করলাম, বললাম, খুব আমার বোনকে নিয়ে ফুর্তি করা হচ্ছে, না? ও কিছুটা রেগে গিয়ে বলল, ভাবী তোমার বোন এখন ভিআইপি, আমার মতোন সাধারণ পাবলিকের নাগালের বাইরে উনি। ব্যাপারটা আসলে কীরে? কোন ঝামেলা চলছে নাকি তোদের দুজনের? এপ্রিল কী বলবে বুঝতে পারছিল না, অসংলগ্নভাবে কী বলে এরিসকে নিরস্ত করেছিল তা ঠিক মনে নেই।

আর্যকে আগেও ভাল লাগত না, ইদানিং এমনই সন্দেহ কুটিল চোখে এপ্রিলের দিকে চেয়ে থাকে, আর্য এপ্রিলের খুব  অসহ্য লাগে ওকে। দুঃখের বিষয় হল, এপ্রিল তীর্থের বাগদা আর্যকে দেখলেই বোঝায় যায় তীর্থকে দেখলে ও হিংসেয় জ¦লে পুড়ে মরে, তীর্থ ঠিক তার উল্টো। আর্যকে দেখলে মিষ্টি হেসে বন্ধুত্বপূর্ণ চোখে তাকায়। মানুষে মানুষে কত তফাৎ, এপ্রিল উদাস হয়ে ভাবে কখনো কখনো।

তীর্থর উপস্থিতিতে বাসায় যেন আনন্দের হিল্লোল বইছে, যতই আর্য মা-বাবার পছন্দের পাত্র হোক না কেন, তীর্থ এলে, মা বাবার মুখটা খুশীতে যেমন চকচক করে, সেই চকচকে ভাবটা আর্য এলে দেখতে পায় না এপ্রিল।
কথায় কথায় মা বলে, এই যাহ, বাবা তীর্থ তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, সামনের মাসের সাত তারিখ এপ্রিলের বিয়ে, কার্ড তো অবশ্যই পাবে, পুরো পরিবারসহ আসতে হবে কিন্তু। কথাটা শুনে তীর্থ কী একটু চমকাল, একটু কী কষ্টের নীল ছুঁয়ে গেল ওর সুন্দর মুখশ্রী? এপ্রিল লক্ষ্য করল, তীর্থ মুক্তোর মতো দাঁত বের করে খুব সুন্দর ভঙ্গীতে হাসল, অভিমানে মনটা বিষিয়ে গেল এপ্রিলের। চেয়ার ছেড়ে উঠে নিজের রুমে এসে খাটের ওপর বসল, অভিমানে ফেনিয়ে আছে পুরো মন। এপ্রিলের বিয়ে! তীর্থর কথাটা শুনে একটুও খারাপ লাগল না? পলকের জনেও বিষন্ন হল না ওর চমৎকার মুখটা!

চোখ দুটো ভিজে যাচ্ছে, হাত দিয়ে মুছল। কিছুক্ষণ পর তীর্থ এসে ঢুকল, ঘর অন্ধকার হয়ে এসেছে, তীর্থকে দেখে অভিমানটা আরো বাড়ল, মুখটা ফিরিয়ে নিল। তীর্থ নরম গলায় বলল, ঘর তো একদম অন্ধকার হয়ে আছে, লাইটা জ্বেলে দেবো?

অভিমানে ফেটে পড়তে পড়তে এপ্রিল বলল, দরকার নেই। তীর্থ বলল, রাগ করেছ!
-রাগ করার মতো কিছু হয়েছে?
-তাহলে চলে এলে কেনো?
– আমার ইচ্ছে
তীর্থ আর কথা খুঁজে পেল না, চুপ করে রইল। এপ্রিলই নীরবতা ভাঙ্গল, আমার বিয়েতে অনেক আনন্দ করবে, না? তীর্থ হাসল, তোমার বিয়ের অনুষ্ঠানে আনন্দ করব না কেন? কথাটা শুনে কষ্ট যেন দলা পাকিয়ে গলায় আটকে গেল এপ্রিলের, নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রাণপন চেষ্টা করল ও। তীর্থ বলে, তোমার বিয়েতে কী গিফ্ট দিলে তুমি খুশী হবে? এপ্রিল মলিন মুখে বলল, আমার খুব প্রিয় ফুল অর্কিড, আর কিছু নয়, তুমি আমাকে এক গোছা অর্কিড দিলে আমি খুশি হব। তীর্থ বলল, দুর, তাই কখনো হয় নাকি, শুধু ফুল! তোমাকে আমি একটা দারুন শাড়িও দেবো!
এপ্রিল উঠে দাঁড়াল, তীর্থ দাঁড়িয়েই ছিল, এপ্রিল সরাসরি তীর্থর দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার যা ইচ্ছে, যা খুশী, তাই উপহার হিসেবে দিয়ো, আমার সেসব নিয়ে কোন উৎসাহ নেই, মেয়েদের নিলর্জতা মানায় না, তবুও একটা সত্যি তোমাকে আজ না জানিয়ে পারছি না, আমার বিয়ের দিন বর হিসেবে আর্যকে নয়, তোমাকে পেলে, আমার জীবনে সেটাই হতো শ্রেষ্ঠ উপহার।

কথাগুলো বলে আর এপ্রিল দাঁড়ালো না। রুম থেকে দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে গেল। অবাক তীর্থ গোধুলীর কনে দেখায় আলোয় হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular