অন্ধকার পর্যটনে বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্বের কাছে তুলে ধরা সম্ভব

অন্ধকার পর্যটনে বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্বের কাছে তুলে ধরা সম্ভব

 

ঢাকা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ :

 

অন্ধকারাচ্ছন্ন পর্যটন বর্তমানে আর নতুন ধারণা নয় যদিও এটি সম্প্রতি একই নামে  নেটফ্লিক্স সিরিজ চালু হওয়ার পরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সহজ ভাষায় বলতে অন্ধকারাচ্ছন্ন পর্যটন হল ঐতিহ্যবাহী পর্যটনের বিপরীত। অনুপ্রেরণাদায়ক ও পরিচিত স্থান পরিদর্শনের পরিবর্তে ভ্রমণকারীরা এমন জায়গাগুলি দেখার জন্য যেখানে মানব ইতিহাসের কিছু অন্ধকার ঘটনা ঘটেছিল বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে । এর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে যুদ্ধ এবং হত্যাকাণ্ড। 

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রফিক, সালাম, বরকত,‌ জব্বার ও শফিউর এর মত বাংলার দামাল ছেলেরা “রাস্ট্রভাষা বাংলা চাই” এর দাবিতে নিজের তাজা প্রাণ দিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে এবং ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় ও এতে ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে বাঙ্গালীরা ভাষা শহীদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।   

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ জীবকে স্পর্শ করেছিল এমনকি ১৯৭০ এর দশকে যখন যোগাযোগের আজকের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ছিল না। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চে নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙ্গালীর উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মর্মান্তিক অত্যাচার চালায় ও হত্যা করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে বাঙ্গলাদেশের স্বাধীনতার ডাক আছে এবং ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা – বোনের সম্ভ্রম হরণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পনে মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বিজয় অর্জিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, মিরপুর জল্লাদখানা, রেসকোর্স ময়দান, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় সংসদ ভবন, জামালপুরের সম্মুখ যুদ্ধ, চট্টগ্রামের অপারেশন জ্যাকপট, কালুরঘাট রেডিও স্টেশন, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু স্মৃতিসৌধ, মেহেরপুরে স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার – বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্ধকার অধ্যায়ের সাক্ষী বহন করে চলেছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতা ও বিজয় স্তম্ভ আজীবন ১৯৭১ এর স্মৃতি বহন করবে।

এছাড়া রায়ের বাজারের বধ্যভূমি আমাদের স্মৃতিতে থেকে যাবে ইতিহাসের অনন্য উদাহরণ হিসেবে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরের রাতে বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবী প্রভাষক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, ডাক্তার, শিল্পী, প্রকৌশলী এবং লেখকদের ঢাকায় ঘিরে ফেলা  হয়। তাদের চোখ বেঁধে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, নাখা এলপাড়া, রাজারবাগসহ  শহরের বিভিন্ন স্থানে টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করে রায়েরবাজারে জলাভূমিতে ফেলে দেওয়া হয়। 

১৯৭১ সালের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয়েছে। আল বদর ও আল শামস পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের  বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে বের করতে সাহায্য করেছিল এবং রাতের বেলা তাদের এবং আরও অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। হত্যাকাণ্ডের পর তারা লাশ এনে ফেলে চলে যায় রায়ের বাজারের জলাভূমিতে। মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকাবাসী জানতে পেরেছে যে সমস্ত মহান বুদ্ধিজীবী এবং নিরীহ মানুষের মৃতদেহ এখানে আনা হয়েছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট জাতিক জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে ধানমন্ডি ৩২ এ নিজ বাসভবনে স্বপরিবারে হত্যা করা হয় এবং তার ই রেশ ধরে এক ই বছরের ৩রা নভেম্বর জাতীয় চার নেতা সাবেক উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সাবেক বাংলাদেশী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান কে জেলখানায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

আমরা এই সত্যটিকে উপেক্ষা করতে পারি না যে আমরা সবাই একদিন মারা যাব। কিন্তু এটা কি সম্ভব যে আমাদের মৃত্যুর আগে আমাদের কবরগুলো সংরক্ষিত থাকবে? বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের জন্য এটা অসম্ভব কিন্তু কিছু বিপর্যস্ত মানুষের জন্য এটা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ দুটি কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রি বাংলাদেশের কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে অবস্থিত এবং এই দুটি ওয়ার সিমেট্রি ‘কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন এর অধীনে রয়েছে যার প্রধান কাজ হল দুটি বিশ্বযুদ্ধে মারা যাওয়া কমনওয়েলথ দেশের সদস্যদের কবর এবং স্থানগুলি চিহ্নিত করা, রেকর্ড করা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা।  

অন্ধকারাচ্ছন্ন পর্যটনের উন্নয়নের যে গন্তব্যগুলি কয়েক বছর ধরে বা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কিছু দুর্যোগের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে সেগুলি পর্যটকদের একই অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত করা হলে হয় এই অঞ্চলগুলিতে অন্ধকার পর্যটনের সম্পূর্ণ বিকাশ এবং প্রচার প্রসার বাড়বে। 

এই এলাকার দর্শনীয়  স্থানগুলোতে যাতায়াত ব্যবস্থা আরো সমৃদ্ধ করা নিশ্চিতের জন্য এই অঞ্চলের বিশেষ পর্যটন সেক্টরগুলির জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা এবং সুবিধা প্রদান করতে হবে। স্থানীয় যারা এই স্থান সম্পর্কে জ্ঞান রাখে তাদের গাইড হওয়ার জন্য আরো প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত।

 পর্যাপ্ত সংখ্যক বিদেশী পর্যটকের দর্শনীয় স্থানগুলোর পরিদর্শন নিশ্চিত করার মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এটি একটি অন্যতম মাধ্যম হবে। এলাকার শিক্ষার্থীরা গবেষণালব্ধ কাজের জন্য এসব  স্থান ভ্রমণ আরো বাড়ালে বাংলাদেশের এই ইতিহাস বিশ্বের কাছে তুলে ধরা ও সম্ভব হবে।

 

লিখেছেন : মোঃ ইকবাল হোসেন, প্রভাষক, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ড্যাফোডিল ইন্সটিটিউট অব আইটি

সর্বশেষ