‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত বসন্ত উৎসব; বৈচিত্রের ঐক্য সর্বমানবের

গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঋতুভিত্তিক উৎসবের মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষ এবং বিশ্বজগতের বন্ধন শান্তিপূর্ণ করতে চেয়েছেন। মানবের জীবন যাপনে প্রকৃতির সম্পর্ক যত বেশি উপেক্ষিত হবে, ততই নেতিবাচক হবে পরিবেশ। প্রকৃতির উপর মানব আধিপত্য স্থাপন করতে গিয়ে বৈচিত্র্যের পৃথিবীতে স্বাভাবিক সৌন্দর্য দিন দিন লোপ পেতে বসেছে। দেশের সাথে অন্য দেশের অসম প্রতিযোগিতা, অসম বাণিজ্য, শিল্প কারখানা নগর আলয়ের অপরিকল্পিত বিস্তার, অবাধ তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষমতা আধিপত্য স্থাপনে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার, যা মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করছে। প্রতিনিয়ত মানুষের সাথে অন্যের প্রীতিবন্ধন, আত্মীয়তা হিংস্র হয়ে উঠছে। স্বপ্নের মতো সুন্দর বিশ্ব প্রতিনিয়ত সকল জীবজন্তুর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। মানবের উদ্ভাবন, নিরীক্ষা আনন্দদায়ক, তবে তার প্রয়োগ আধিপত্যকে নিশ্চিত করে। এই আধিপত্যের নির্মমতায় বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ, জীবজন্তু, গাছপালা অসহায় হয়ে পড়েছে। নদ নদী সমুদ্র মহাসাগর, পাহাড় পর্বত সমতল ভূখণ্ড, গভীর বন জঙ্গল পর্যায়ক্রমে চিরায়ত সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছে। বিশেষ করে বিলীন হতে চলেছে বহুযুগের ভারসাম্য। গ্রহ নক্ষত্র সৌরজগতের উপর অবাধ নিরীক্ষায় মানবের শান্তির আবাসস্থল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চরম সংকটে পড়তে শুরু করেছে। প্রতিকূল বিপন্ন বিশ্বে মানব সমাজ দোল, হোলি নামক উৎসবের মাধ্যমে সর্বমানবের ঐক্য সূচনা করতে পারে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বোধকরি সেই উপলব্ধিতে বলেন, ‘ বিশ্বের সহিত স্বতন্ত্র বলিয়াই যে মানুষের গৌরব তাহা নহে। মানুষের মধ্যে বিশ্বের সকল বেচিত্র্যই আছে বলিয়া মানুষ বড়ো। মানুষ জড়ের সহিত জড়, তরুলতার সঙ্গে তরুলতা, মৃগপক্ষীর সঙ্গে মৃগপক্ষী। প্রকৃতি-রাজবাড়ির নানা মহলের নানা দরজা তাহার জন্য খোলা।… পুরা মানুষ হইতে হইলে তাহাকে সবই হইতে হইবে, এ কথা না মনে করিয়া মানুষ মনুষ্যত্বকে বিশ্ববিদ্রোহের একটি সংকীর্ণ ধ্বজাস্বরূপ খাড়া করিয়া তুলিয়া রাখিয়াছে কেন? কেন সে দম্ভ করিয়া বার বার এ কথা বলিতেছে– আমি জড় নহি, আমি উদ্ভিদ নহি, পশু নহি, আমি মানুষ; আমি কেবল কাজ করি ও সমালোচনা করি, শাসন করি ও বিদ্রোহ করি। কেন সে এ কথা বলে না– আমি সমস্তই, সকলের সঙ্গেই আমার অবারিত যোগ আছে, স্বাতন্ত্র্যের ধ্বজা আমার নহে (বসন্তযাপন)।

বিশ্বের সবকিছুর সাথে মানুষের অভিন্ন সম্পর্ক থাকলেই প্রকৃতির স্বাভাবিক বিন্যাসের সাথে বৈরী সৃষ্টি হতে পারে না। আর এই সব বিবিধ কারণে উৎসব মানুষের সাথে প্রকৃতির অভিন্ন সত্তাকে উপলব্ধির বহুমাত্রিক আবেদন সৃষ্টি করে। নগর জীবনের দুর্দান্ত প্রভাব বলয়ে একথা কেউ কি বলতে পারবেন, আমি মানুষ, আমিই শক্তিশালী? সকলের উপর আমার আধিপত্য থাকবে! বিস্ময়কর ভাবে সত্য, উনিশ শতকের পর থেকে প্রকৃতির উপর আধিপত্য, দেশের উপর অন্য দেশের সাম্রাজ্য স্থাপনের ফলে ভয়াবহ দুটি মহাযুদ্ধ নির্মম নৃশংসতার বহিঃপ্রকাশ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবিক বিশ্ব এখনও লক্ষ্য করা যায়নি। বরং প্রতিনিয়ত অসম, অসহিষ্ণু, বৈরি বিশ্ব লক্ষ্য করছি। সমকালে প্রকৃতির উপর যথেচ্ছ নিরীক্ষা, সৌরশক্তি অর্জনের প্রতিযোগিতা বিশ্বের জীবজগত, বন জঙ্গল, নদী সমুদ্রর পাহাড় পর্বতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তা এতটাই মারাত্মক, যার পরিণতি ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। আশ্চর্যের বিষয়, এতো উদ্ভাবন, এতো সম্ভাবনা, এতো দম্ভ, তা যেন ধূলিস্যাৎ করে দেয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বহুবিধ রোগের আর্বিভাব, ভাইরাসের আক্রমণে। এর থেকে শিক্ষা নেবে কি শক্তিধর দেশসমূহ?

বিপন্ন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মানুষ ভয়ংকর সংকট ও ঝুঁকি অতিক্রম করছে। গতদু’টি বছর ২০২০-২১ সালে আনন্দময় বসন্ত উৎসব পালিত হয়নি বলে জানি । বাংলাদেশেও ‘মুজিববর্ষে’র আয়োজনের ব্যাপ্তি নানাভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে বিশ্বে যুদ্ধ উত্তাপের ভয়াবহ পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তদুপরি বসন্তোৎসবের নানা আয়োজনে তথ্যাদি পাওয়া যাচ্ছে। যা সত্যিই আনন্দের।

২. গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তের আর্বিভাবকে মনে করেন ‘নবীন’ ‘নূতন প্রাণের’ সমাগত বিশ্ব। যেখানে প্রকৃতি নিত্য নবরূপে সাজ সজ্জায়, পাখির কলতানে মাতিয়ে রাখে। বসন্ত উৎসবটি ‘১৩১৩ সালের ৫ই ফাল্গুন তারিখে শ্রীপঞ্চমীর দিন রবীন্দ্রনাথের কণিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে প্রথম বসন্তোৎসব উদযাপন করেন। সে সময়ের আশ্রমের গুটি কয়েক ছাত্র নিয়ে শমীন্দ্রনাথ আদি কুটিরের হলঘরে এই উৎসব পালন করেন। বর্তমানে সে ঘর নিশ্চিহ্ন। তার পরিবর্তে স্থান নিয়েছে নব প্রাক কুটির। সেই ১৩১৩ বঙ্গাব্দ থেকে শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব পালিত হয়ে আসছে। শ্রীপঞ্চমী এখনো উদযাপিত হয়। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দোলের দিন বসন্তোৎসব পালিত হয়। রবীন্দ্রনাথ এই উৎসবকে ঋতু উৎসব পর্যায় ভুক্ত করেন।’ ( প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ: উৎসব ও ভবন– দিলীপ কুমার দত্ত)

বসন্ত উৎসবের আয়োজনে নানামাত্রিকতায় যুক্ত হয়েছিলেন শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু, শান্তিদেব ঘোষ। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তোৎসবকে দোল বা হোলির নিতান্ত অদ্ভুত আমোদ প্রমোদ থেকে মুক্ত করেন। আচার্য ক্ষিতিমোহন এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘ এই উৎসব সত্য ও সুন্দরের জয়ের প্রতীক।’
শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীরা এই দিনে বাসন্তী রং এর শাড়ী, জামা কাপড় পরে নৃত্যের তালে তালে উৎসব প্রাঙ্গনে আসে। তালপাতার ঠোঙার ভেতর আবীর, সেই আবীরের রঙে আম্রকুঞ্জ থেকে গৌরপ্রাঙ্গন রাঙা হয়ে যায়। কারও হাতে করতাল, কেউ বা লাঠি দিয়ে নৃত্যের তালে তালে সংগীতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
‘ ওরে গৃহবাসী খোল, দ্বার খোল, লাগল যে দোল।
স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল।
দ্বার খোল, দ্বার খোল।।
রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে,
রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে,
নবীন পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল।।
দ্বার খোল, দ্বার খোল।।
বেণুবন মর্মরে দখিন বাতাসে,
প্রজাপতি দেলে ঘাসে ঘাসে।।
মউমাছি ফিরে যাচি ফুলের দখিনা,
পাখায় বাজায় তার ভিখারীর বীণা,
মাধবীবিতানে বায়ু গন্ধে বিভোল।
দ্বার খোল, দ্বার খোল।। ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

কি সুন্দর দৃশ্য!
শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসবে অযাচিত রঙের ব্যবহার, হৈ-হুল্লোড়, রঙ খেলা লক্ষ্য করা যায় না।
গুরুদেব বসন্তোৎসবকে পরিপূর্ণ একটা কাঠামো সৃষ্টি করে গিয়েছেন।
” জানুয়ারিতে ( ১৯৩১) গুরুদেব দেশে ফিরে মার্চ মাসে বসন্ত উৎসবের জন্য ‘নবীন’ -এর আয়োজন শুরু করেন। পূর্বের বসন্ত নাটিকার মতনই বসন্তঋতুর নতুন গান তিনি অনেক রচনা করলেন। এর জন্যে কোনো নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা করেন নি। রাজা বা রাজসভা ছিল না। গুরুদেব রঙ্গমঞ্চের এক কোণে বসে গানগুলির মর্ম ব্যাখ্যা করেছিলেন নিজকণ্ঠের গানে পাঠে ও আবৃত্তিতে। এই অভিনয়কালে শান্তিনিকেতনের বাঙালি ছাত্ররা নাচে বিশেষ স্থান গ্রহণ করে। ‘নবীনে’ মণিপুরী নাচের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবাংলার বাউল, রাইবিশে ও ইউরোপের হাঙ্গেরী দেশের লোকনৃত্য ছিল আরো একটি প্রধান বিশেষত্ব। এই-সব নৃত্য পদ্ধতিকে নানা গানে খুব ভালোভাবেই খাপ খাওয়ানো গিয়েছিল।” ( রবীন্দ্র সঙ্গীত– শান্তিদেব ঘোষ)
গুরুদেবে বসন্তোৎসব আদি হোলি, দোলের মৌলিক বৈশিষ্ট্য অনুসৃত হয়নি। তবে আদি ঐতিহ্যের ধারায় বসন্তোৎসব বাঙালির উৎসবে পরিণত হয়েছে। আর এই উৎসব ‘সত্য ও সুন্দরের জয়ের প্রতীক’ বলে সর্বমানবের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

৩. হোলি উৎসবের উৎপত্তি বহু যুগে পূর্বে বলে জানা যায়। বিশেষ করে পৌরাণিক উপাখ্যানে, প্রাচীন ভারতের জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনে এর নিদর্শন মেলে। রাজা হিরণ্যকশিপুর ব্রহ্মার নিকট থেকে অতি সাধনায় বরলাভ করেন, যা ছিল তাকে অন্য মানুষ, প্রাণী কেউ ঘরে, বাইরে, রাতে দিনে হত্যা করতে পারবে না। এমনকি জলে স্থলে অস্ত্রে সস্ত্রে কোথাও হত্যা করা যাবে না। এরফলে রাজা মহাশক্তিধর, সকলকে তার পূজা করতে নির্দেশ করলেন। কিন্তু তার বিষ্ণুভক্ত পুত্র প্রহ্লাদ এতে আপত্তি জানায়। তখন প্রহ্লাদকে হত্যার নানা চেষ্টায় রাজা ব্যর্থ হলে, রাজার বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করে। হোলিকা জানতো তার গায়ে যা ছিল, তা আগুনে পুড়বে না। কিন্তু বিধি বাম, প্রবাল বাতাসে হোলিকার পরিধেয় সরে গিয়ে প্রহ্লাদকে জড়িয়ে রাখে। আর হোলিকে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়। এই হোলিকা থেকে হোলি উৎসব অনেকেই মনে করেন। ভাগবত পুরাণের সপ্তম অধ্যায়ে বিষয়টি সকলে পাবেন। অন্যায় অত্যাচারের নৃশংসতা থেকে মুক্তি এনেছিলো হোলি বধে। তারপর আনন্দ উৎসব।

সনাতন মতে, চারটি যুগ- সত্যযুগ, ত্রেতাযুগ, দ্বাপর যুগ, কলিযুগ। দ্বাপরযুগে শ্রীকৃষ্ণের আর্বিভাব ফাগুনের পূর্ণিমায়। সেখান থেকেই দোলযাত্রা উৎপত্তি অনেকে মনে করেন। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে রাধা ও তেত্রিশ হাজার গোপীর সাথে রঙ ছোড়াছুড়ির মাধ্যমে এই উৎসবের বৃহৎ পরিধি কালে কালে বহুমাত্রিক আবেদন সৃষ্টি করেছে। এযেন ‘ রসো বৈ সঃ- আনন্দময় রসঘন সত্তা। প্রাচীন ঋষিদের সময়কালে এটা ছিল সর্বমানবীয় উৎসব। অর্থাৎ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তি বিজয়।

শ্রীচেতন্য পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব সূচনা করেন। যাকে বলা হয় ‘গৌর পূর্ণিমা’। কৃষ্ণ মন্দিরে কড় কাঠ জ্বালিয়ে বহ্নিউৎসব করা হয়। পরের দিন মন্দিরে পূজা ও আবির দিয়ে একে অপরে উৎসবে মেতে উঠতো।

বিশেষ করে শীতের পর ঝলমলে রোদের বসন্তে এই উৎসব জনপ্রিয়। উত্তর ভারতে ‘হোলি’, বিহারে ‘ফাগুয়া’, বাংলায় ‘দোলযাত্রা, গ্রামবাংলায় ন্যাড়াপোড়া, চাঁচর ইত্যাদি বলা হয়। পাঞ্জাবের মূলতান প্রদেশের প্রহ্লাদপুরী মন্দিরে এই উৎসব দুইদিন ব্যাপী হয়। তবে শিখদের মানাগুরু ‘গুরু গোবিন্দ সিংহ’ এটাকে তিনদিনের হোলা মহল্লা উৎসবে পরিণত করেন।

বসন্তের এই ঋষি উৎসব নিয়ে নানা তথ্য যেমন আছে, তবে বিস্তার আদি ভারত থেকে। জানা যায়, ভূতত্ত্ববিদদের মতে, আরাবাল্লার পশ্চিমপ্রান্তে ভূখণ্ড গন্ডোয়িনা, পূর্বে ছিল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আর্কিপোলাগ, পশ্চিমে মরিশাস। এখানে হিমালয় ও উত্তর ভারত সমুদ্রতলে ছিল, কোটি কোটি বছর আগে ভূবিন্যাসে হিমালয় সৃষ্টি হয়। টেথাস সমুদ্রের একটি অংশ আরবসাগর, অন্যটি বঙ্গোপসাগর। ভূপ্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্যে হিমালয় বিধৌত ভারত মানুষের বসবাস উপযোগী হয়ে ওঠে। এই বিস্তৃত ভূভাগের মূল ঋষিভাবনার উন্মেষ হয়, যার মূল কথা বিশ্ব এক, অবিভাজ্য। যার সাথে প্রকৃতিজগত, ধর্ম ও নীতিভাবনার জগতকে এক করেছে। এটাই সৃষ্টির মহারহস্য। এই রহস্যের পুরীতে প্রকৃতি ধর্ম, নীতি মিলে সৃষ্টি হয় সংস্কৃতি। আর সংস্কৃতিই পারে মহাঐক্য সৃষ্টি করতে।

আদিকালের সংস্কৃতির ব্যাপক প্রভাব ঋষি মুণিদের। সেই হোলি বা বসন্ত উৎসব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানাভাবে পালন করা হয়। চীনে ‘চুন ইয়ুন’, ইরানে ‘নওরোজ ‘, জাপানে ‘ হানামি বা সাকুরা/ চেরি ফুল’, স্পেনে ‘লাস ফালেস,’ বসনিয়ানে ‘চিয়াম্বুরিজাদা,’ মেক্সিকোয় ‘সান মার্কোস’ নামে পালিত হয়। এসব উৎসবের মূল পরম্পরা আদি ভারতের। বিশ্বে ‘ত্রিনিদাদ ও টোবাগো,’ গায়ানায়’ ভারতীয় বংশদ্ভূতরা হোলি উৎসব পালন করে।

৪. শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসবটির সাথে পুরো বিশ্বের যোগসাধন হয়েছে কবিগুরুর গান, নৃত্যের মাধুর্যে, কারণ, কবিগুরু বলেন.
‘নিখিলে তব কী মহোৎসব। বন্দন করে বিশ্ব
শ্রীসম্পদভূমাষ্পদ নির্ভয় শরণে।’

কবিগুরু আরো বলেন, যে মহাপুরুষগণ তোমার নিত্যোৎসবের নিমন্ত্রণে আহূত, যাঁহারা প্রতিদিনই নিখিললোকের সহিত তোমার আনন্দভোজে আসনগ্রহণ করিয়া থাকেন, তাহাকে বিনম্রনতশিরে তাঁহাদের পদধূলি মাথায় তুলিয়া লইতে দাও।… কিন্তু যেখানে অহংকার, যেখানে তর্ক, যেখানে বিরোধ, যেখানে খ্যাতিপ্রতিপত্তির জন্য প্রতিযোগিতা, যেখানে মঙ্গলকর্মও লোকে লুব্ধভাবে গর্বিতভাবে করে, যেখানে পুণ্যকর্ম অভ্যস্ত আচারমাত্রে পর্যবসিত–সেখানে সমস্ত আচ্ছন্ন, সমস্ত রুদ্ধ, সেখানে ক্ষুদ্র বৃহৎরূপে প্রতিভাত হয়, বৃহৎ ক্ষুদ্র হইয়া পড়ে, সেখানে তোমার বিশ্বযজ্ঞোৎসবের আহবান উপহসিত হইয়া ফিরিয়া আসে।’ সত্যিই তাই।

উৎসবের দিন মূলতঃ মানবিক বোধের মিলনের দিন। মনুষ্যশক্তি জাগ্রত করে বিশ্বজগতকে ভালোবাসতে পারলে অপার কৃপা লাভ করা যায় পরমপ্রভুর। পরমপ্রভুর কৃপা থাকলেই জ্ঞানশক্তি জাগ্রত হয়, যা ‘ ‘ আনন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান ন বিভেতি কুতশ্চন’। ব্রহ্মের আনন্দ যিনি জানিয়াছেন, তিনি কিছু হইতেই ভয় পান না’।

আমাদের উৎসব হয়ে উঠুক সর্বমানবের ঐক্য। আর এজন্য প্রয়োজন কঠোর সাধন প্রয়াস। উৎসব যেন বাহ্য আড়ম্বর, ‘ শুনি কেবল লৌকিকতার কলকলা এবং সাম্প্রদায়িকতার বাগবিন্যাস– তবে সমস্তই ব্যর্থ হইয়া গেল। ‘

প্রার্থনা করি, বাংলার বসন্ত বা হোলি উৎসব বৃহৎ মহান ভাবনায় সমকাল অতিক্রম করে ভাবীকালের জনউৎসবে পরিণত হবে। যেখানে ‘বৃহৎ মনুষ্যত্ব’ জাগ্রত হবে। যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সর্বমানবের জয়গানে বিশ্ব মানবিক স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

‘ অনন্তের বাণী তুমি, বসন্তের মাধুরী-উৎসবে
আনন্দের মধুপাত্র পরিপূর্ণ করি দিবে কবে।
বঞ্জুলনিকুঞ্জতলে সঞ্চরিবে লীলাচ্ছলে,
চঞ্চল অঞ্চলগন্ধে বনচ্ছায়া রোমাঞ্চিত হবে।
মন্থর মঞ্জুল ছন্দে মঞ্জীরের গুঞ্জনকল্লোল
আন্দালিবে ক্ষণে ক্ষণে অরণ্যের হৃদয়হিন্দোল।
নয়নপল্লবে হাসি হিল্লোলি উঠিবে ভাসি,
মিলনমল্লিকামাল্য পরাইবে পরানবল্লভে।
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

© কামরুল ইসলাম

সর্বশেষ