বিপাকে পড়েছেন হৃদরোগীরা ডলার সংকটে পেসমেকার আমদানিতে জটিলতা

ব্যবসায়ীরা জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে -ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরহার্ট ব্লকের জরুরি চিকিৎসায় ব্যবহৃত ‘পেসমেকার’ সরঞ্জামের সংকট কাটছে না। ডলারের অভাবে আমদানিকারকরা সময়মতো এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারছেন না। ফলে তারা হাসপাতালগুলোতে চাহিদা অনুপাতে পেসমেকার সরবরাহও করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়ছেন হৃদরোগীরা।

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চাঁদপুরের রহিমা বেগম (৬০) রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইসিভিডি) চিকিৎসাধীন। চিকিৎসক জানিয়েছে, পেসমেকার লাগাতে হবে। রহিমার স্বজনরা জানান, এক সপ্তাহ ধরে পেসমেকার কেনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এখনো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট চেম্বারের পেসমেকার না পাওয়া পর্যন্ত পরবর্তী ধাপের চিকিৎসায় যাওয়া যাচ্ছে না।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মেডট্রোনিক, অ্যাবোট, বোস্টন সায়েন্টিফিক এবং জার্মানির বায়োট্রোনিকসহ মোট ৪টি কোম্পানির পেসমেকার ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে এসব পেসমেকারের সর্বোচ্চ ও সর্বনিু দাম বেঁধে দেয় সরকার। সে সময়ে লাখ টাকার নিচে পেসমেকার মিললেও বর্তমানে মডেলভেদে পেসমেকারের দাম দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) কার্ডিওলজি বিভাগের ইউনিটপ্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার বলেন, একজন মানুষের প্রতি মিনিটে স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন থাকে ৬০ থেকে ১০০ বার পর্যন্ত। বয়স ৬০ বছরের বেশি হলে, হার্ট অ্যাটাক হলে রিদম রেট (স্পন্দনের মাত্রা) কমে ৩০-৪০ চলে আসে। অনিয়মিত হৃৎস্পন্দনে মাথা ঝিমঝিম করা, মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা, হঠাৎ চেতনা হারানো বা পড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ হতে পারে। ইসিজির মাধ্যমে এটি শনাক্ত করা যায়। কারণ নির্ণয়ে ইকোকার্ডিওগ্রাফি, এনজিওগ্রামসহ আরও পরীক্ষার দরকার হতে পারে। রোগ নির্ণয়ের পর কারও কারও কৃত্রিম পেসমেকারের প্রয়োজন হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথমে অস্থায়ী এবং পরে স্থায়ী পেসমেকার বসাতে হয়।

চিকিৎসকরা আরও বলেন, কারও হার্ট দুর্বল হয়ে পর্যাপ্ত স্পন্দন তৈরি করতে না পারলে পেসমেকার যন্ত্র বসাতে হয়। যাদের পেসমেকার লাগে তাদের কোনোভাবেই বাড়িতে বসে থাকার সুযোগ নেই। এনআইসিভিডিতে প্রতি মাসে গড়ে ১০০টার মতো পেসমেকার লাগে। কিছুদিন ধরে চাহিদা অনুপাতে সরবরাহ না থাকায় বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। আগে একজন রোগী ভর্তির এক সপ্তাহের মধ্যে পেসমেকার বসাতে পারতেন, এখন ১৫-২০ দিনের মতো সময় লাগছে।

দেশে প্রতি মাসে পেসমেকারের চাহিদা ২৫০ থেকে ২৬০টি। যার এক-তৃতীয়াংশেরই জোগান দেয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘অ্যাবোট’ কোম্পানির এ দেশীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘দ্য স্পন্দন লিমিটেড’। রোববার প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী (সিইও) অংশুমান মালাকার যুগান্তরকে বলেন, তারা দেশে মোট পেসমেকারের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ (১০০ থেকে ১১০টি) চাহিদা মেটাতে পারেন। বাকিগুলো অন্য কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী ১০০টা পেসমেকার দরকার হলে ২০০টির মতো মজুত থাকতে হয়। কিছুদিন আগেও তাদের কাছে ৫০টির মতো মজুত ছিল। সময়মতো এলসি খুলতে না পারায় সরঞ্জাম আনা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি। শিগগিরই আমাদের প্রডাক্ট চলে আসবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বোস্টন সায়েন্টিফিকের এক কর্মকর্তা বলেন, আগে এলসি খোলার জন্য দরখাস্ত করলে দু-একদিনের মধ্যেই হয়ে যেত। ডলার সংকটে এখন ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগছে। আগে এলসি মার্জিন ২০ শতাংশের ঘরে ছিল। এখন বেড়ে ৫০ শতাংশ থেকে এর বেশি হচ্ছে। ব্যাংকিং প্রসেসটা দ্রুত করলে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

পেসমেকার ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, দুই বছর ধরে ডলার সংকট চলছে। ৮৪ টাকার ডলার এখন সরকারিভাবেই ১১২ টাকা হয়েছে। এরপরও এলসি খোলা যাচ্ছে না। আমরা টিআই (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন) নিয়ে আসার পর ব্যাংকে দরখাস্ত করি, ব্যাংক সেটি রিসিভও করে। অর্থ বরাদ্দও হয়। কিন্তু ডলার লেনদেনে অনুমতি দেয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সবাই এটি জানলেও সমাধান মিলছে না।

ডলারের দামের দোহাই দিয়ে পেসমেকার ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান হৃদরোগ ইনস্টিটিউিটের পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার। তিনি বলেন, হৃদরোগের চিকিৎসায় যে প্রডাক্ট ছিল দেড় লাখ, সেটি হয়ে গেছে আড়াই লাখ। পেসমেকার নিয়ে মধ্যবিত্ত রোগীদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

জানতে চাইলে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) সদ্য সাবেক (৫ মার্চ পিআরএল গেছেন) মুখপাত্র মো. নুরুল আলম  বলেন, ‘ডলার সংকটের বিষয়টি পুরোনো কথা। সংকটের মধ্যেই আমরা কারোনাকাল মোকাবিলা করছি। ওই সময় আমদানিনির্ভর প্রায় সব চিকিৎসা সরঞ্জামের শুল্ক ফ্রি করে দিয়েছিলাম। এখন জীবনরক্ষাকারী হার্টের সরঞ্জাম (পেসমেকার) আমদানিতে ডলার সংকটের কথা বলা হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা আমাদের এখনো জানায়নি। লিখিতভাবে জানালে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সুরাহা করা সম্ভব হবে।

 

সর্বশেষ