গ্যাস সংকটে ধুঁকছে শিল্প

গ্যাস সংকটে ধুঁকছে শিল্প কারখানা। রমজানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা বাড়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প সংশ্লিষ্টরা।

তারা জানান, শিল্প অধ্যুষিত নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর ও আশুলিয়াসহ দেশের শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় দেখা দিয়েছে গ্যাসের তীব্র সংকট। পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য তৈরিতে সরবরাহ করতে না পারায় বিপাকে পড়ছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

জানুয়ারির পর শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হলেও এ খাতে আবারো সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কারখানা চালানোয় খরচ বেড়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের অধিকাংশ এলাকা এবং মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, মুন্সীগঞ্জসহ অন্যান্য গ্যাস প্রধান শিল্প এলাকায় গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
গ্যাস সংকটের কারণে গাজীপুর জেলা ও মহানগরের হাজারো শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমেছে। এলপিজি, ডিজেল ও সিএনজি গ্যাসে চালু রাখতে হয়েছে এসব কারখানা। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে বহুগুণ। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিল্পকারখানা মালিকরা। গাজীপুরে প্রতিদিন ৬শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে।

অথচ সরবরাহ হচ্ছে অর্ধেকের কম। এ ছাড়া সিএনজি পাম্পগুলোতে চাপ কম থাকায় বিপাকে পড়েছেন তারা। ফলে পাম্পগুলোতে নেই গাড়ির চাপ। এতে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

গত ৬ই মার্চ পেট্রোবাংলার গণশুনানিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস চাইলেন শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্তারা। গ্যাস সরবরাহ না বাড়লে ঈদে কর্মীদের বেতন-বোনাস প্রদান নিয়ে শঙ্কার কথা জানান। গাজী গ্রুপের জিএম আলমগীর আকন্দ বলেন, গ্যাসের সরবরাহ না বাড়ালে খুবই সংকটে পড়বো, উৎপাদন করতে না পারলে আগামী ঈদে বেতন-বোনাস দিতে পারবো না।

আকবর কটন মিলস লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) বলেন, ভালুকা জোনে দেড় মাস ধরে গ্যাসের অভাবে দিনের বেলা বসে থাকতে হয়; রাতে কারখানায় কাজ চলে। এখন শ্রমিকদের ছুটিও দিতে পারছি না। এভাবে চললে ঈদে বেতন- বোনাস দেয়া কঠিন হবে।
জানা গেছে, দেশে চাহিদার তুলনায় ৪০-৫০ শতাংশ গ্যাসের সংকট রয়েছে। তাই রেশনিং করে সরবরাহ করা হচ্ছে। আর সরবরাহকৃত গ্যাসের বড় অংশই ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তবু এখাতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না জ্বালানি বিভাগ। দেখা গেছে চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের সরবরাহ বাড়েনি। বর্তমানে এখাতে গ্যাসের ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যদিকে আগের মতোই সরবরাহ ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে শিল্পে।

শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে প্রাধান্য দেয়া সত্ত্বেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ গাজীপুর ও সাভার অঞ্চলের কারখানাগুলো। দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন নিম্নমুখী। আমদানির মাধ্যমে এই ঘাটতি মেটানো হলেও এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। মূলত আমদানিকৃত গ্যাস পরিবহন ও মজুতের বিদ্যমান অবকাঠামোগত সক্ষমতার চেয়ে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এ অবস্থায় একমাত্র নিজস্ব গ্যাসের উত্তোলন বৃদ্ধি ছাড়া গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বলেন, অগ্রাধিকার দেয়ার পরেও ৪০-৪৫ শতাংশ গ্যাসের সরবরাহ মিলছে। বাকিটা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। অনেকেই মাত্র এক শিফট ফ্যাক্টরি চালাচ্ছে। উৎপাদন নেই। এভাবে চলতে থাকলে রপ্তানিখাত দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর্থিক লোকসানের পাশাপাশি রপ্তানি বাজার হারানোর শঙ্কাও রয়েছে।

দেশের শিল্প খাতে ব্যবহৃত বেশির ভাগ গ্যাস ব্যবহার করা হয় টেক্সটাইল মিলের স্পিনিং, ডায়িং এবং ফিনিশিং ইউনিটে। এ ছাড়া সিরামিক, ইস্পাত এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানাসহ বেশ কয়েকটি শিল্প রয়েছে দেশে, যা মূলত গ্যাস-প্রধান।

এমবি নিট ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দিনের বেলায় কারখানায় সর্বোচ্চ ২ পিএসআই থাকে গ্যাসের চাপ, যা দিয়ে স্পিনিং সম্ভব হয় না। রাতে চাপ বাড়লে তিনি কারখানা চালাতে পারেন। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে, একই হারে শ্রমিকের সংখ্যাও কমেছে।

পেট্রোবাংলার (১৩ থেকে ১৪ই মার্চ) দৈনিক গ্যাস সরবরাহ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২৬৮১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এরমধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর গ্যাস ফিল্ড থেকে ৮১৮ মিলিয়ন ঘনফুট, দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর ফিল্ড থেকে ১২৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করে সরবরাহ করা হয়েছে ৬২৩ মিলিয়ন ঘনফুট। আর চাহিদার নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান ঘোষণা না করা হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার মিলিয়ন বলে বলা হয়।

গ্যাস সরবরাহ নিয়ে গত ১৩ই মার্চ বিদ্যুৎ ভবনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, পেট্রোংবাংলা এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। অনুষ্ঠান শেষে তিনি বলেন, আমরা ২০ শতাংশ গ্যাস আমদানি করতাম। একটি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট) নিয়মিত সার্ভিসিংয়ে থাকায় গ্যাস সরবরাহ ১০ শতাংশ কমে গেছে। সার্ভিসিংয়ে থাকা এফএসআরইউ ৩০শে মার্চের আগে আসবে না। এতে কিছুটা সংকট রয়ে গেছে।

গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিলে লোডশেডিং শুরু হয়। এতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ উভয় সংকটের মুখে পড়েছে। ফলে বিকল্প না পেয়ে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ৬ ঘণ্টা বন্ধকেই বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে সরকার। কিন্তু তাতেও খুব একটা পরিস্থিতি উন্নতি হবে বলে মনে করছে না সংশ্লিষ্টরা।

রোজায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাসের সরবরাহও বাড়ানো হয়। আর গ্যাসের পর্যাপ্ত যোগান না থাকায় অন্য খাতে সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়। ফলে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক ও শিল্পে চলমান গ্যাস সংকটে পড়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিগগিরই গ্যাস সংকট দূর হবে না। কারণ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানিতেই সরকারের ঝোঁক বেশি। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস অনুসন্ধানে চরম অবহেলা করা হয়েছে। এদিকে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করতে যে বিপুল পরিমাণ ডলার প্রয়োজন, তাও সরকারের হাতে নেই। ফলে সংকট আরও বাড়বে।

এদিকে রাজধানী ঢাকার অনেক এলাকাতেই গ্যাস সংকট বিরাজ করছে। বিশেষ করে বিকাল বেলা যখন ইফতারের জন্য রান্না করা হবে তখন লাইনে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক এলাকায় চুলা জ্বলছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সর্বত্র ক্ষোভ বাড়ছে। এতে করে অনেকেই তাদের ক্ষোভ ঝাড়ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।

ভুক্তভোগীরা জানান, দিনের বেশির ভাগ সময়ই ওই এলাকায় গ্যাস থাকে না। আমরা তিতাস পাইপলাইনে কেবল মধ্যরাতে প্রাকৃতিক গ্যাস পাই এবং এটি রাত ১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টা থাকে।

সর্বশেষ