“কার্ল মার্কস বিশ্বের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ”

কার্ল মার্কসের চিন্তাশক্তি ও উপস্থাপিত তত্ত্ব ‘মার্কসবাদ’ নামে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে মার্কসবাদ সকল দেশের চালিকাশক্তি না হলেও নয়াবিশ্ব সৃষ্টি করতে সহায়তা করছে। বাংলাদেশ, ভারত সহ বৃহৎ ভারতে মাকর্সবাদের অনুসারি হালআমলে জন অনুপাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। তবে দীর্ঘ বছর ধরে সমাজতন্ত্র রাষ্ট্র কাঠামোয় পরিপূরক চালিকাশক্তি হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ উত্তর প্রণীত সংবিধানে চারটি মূলনীতির অন্যতম একটি হলো সমাজতন্ত্র । স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সংবিধানে সমাজতন্ত্র যুক্ত করে শ্রেণি বৈষম্যহীন দেশের পরিকল্পনা করেছেন। আর এই সমাজতন্ত্রের মতবাদের জনক হলেন কার্ল মার্কস।

বিশ্বে প্রযুক্তির সম্ভাবনায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পর্যায়কাল অতিক্রম করছে, ঠিক ততই নিত্য নতুন সংকটের আবর্তে জনমানুষের জীবন বাহিত হচ্ছে। এমনকি বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের জনগণ উপলব্ধি করছে অতি সংকটকে। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণে পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের রূপটি মার্কসবাদের রূপরেখায় হতে পারে। পঞ্চম শিল্প বিপ্লবের পরিবর্তে তা হবে মার্কসবাদের তত্ত্বে পঞ্চম শ্রম -শিল্প বিপ্লব।

কার্ল মার্কসের মহাপ্রয়াণের অন্ত্যেষ্টি অনুষ্ঠানে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস তাঁর প্রদত্ত ভাষণে বলেন, ‘গত ১৪ মার্চ (১৮৮৩) বিকেলবেলা ঠিক পৌনে তিনটের সময় বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত চিন্তাবিদের সকল চিন্ত-ভাবনার অবসান ঘটে গেল।…’ এই মানুষটির প্রয়াণে ইউরোপ ও আমেরিকার সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত এবং ইতিহাস বিজ্ঞান উভয়রই অপরিমেয় ক্ষতি হল।’
যুগান্তকারী এবং বৈপ্লবিক চিন্তাশক্তির মহান দার্শনিক কার্ল মার্কস সমকালেও বিশ্বে অপরিহার্য। কারণ ‘ প্রতিভাদীপ্ত স্বচ্ছতা ও উজ্জ্বলতায় এই রচনাটিতে ( কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত) রূপায়িত হয়েছে নতুন বিশ্ববীক্ষা, সমাজ জীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য সুসঙ্গত বস্তুবাদ, বিকাশের সব থেকে সর্বাঙ্গীণ ও সুগভীর মতবাদ – দ্বান্দ্বিকতা, শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব এবং নতুন, কমিউনিস্ট সমাজের স্রষ্টা প্রলেতারিয়েতের বিশ্ব-ঐতিহাসিক বিপ্লবী ভূমিকার তত্ত্ব। ( ভ.ই. লেনিন, মার্কস-এঙ্গলস স্মৃতি, প্রগতি প্রকাশন ১৯৭৬, মস্কো, পৃ. ১২)

কার্ল মার্কসের দার্শনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মতবাদ এবং আন্তর্জাতিক কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা বিশ্বের ইতিহাসকে যুগান্তকারী একটা অধ্যায় সৃষ্টি করে। সেই অধ্যায় হলো সমাজতন্ত্র। জীবনের নির্মম প্রতিকূলতা, নির্বাসন, কুৎসাকে উপেক্ষা করে তিনিই নতুন যুগের প্রবর্তক হয়েছেন। কার্ল মার্কসের সাথে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত হয়েছেন বিশ্বের আরেক দার্শনিক ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। ১৮৪৪ সালে মার্কসের সাথে প্যারিসে পরিচয়, তারপর ১৮৭০ সাল পর্যন্ত চিঠিপত্রে ভাবের আদান প্রদান, চিন্তার বিনিময় এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় একসাথে করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ১৮৭০ সালে এঙ্গেলস লন্ডনে বসবাসরত হলে মার্কসের কার্যক্রমে ব্যাপক প্রসার লাভ করে। ‘ ‘১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যু পর্যন্ত চলে তাঁদের কর্মচঞ্চল মিলিত মানসিক জীবন। এর ফল হল– মার্কসের দিক থেকে– ‘পুঁজি, আমাদের যুগের মহত্তম রাজনীতি-সংক্রান্ত অর্থশাস্ত্রীয় রচনা, আর এঙ্গেলসের ছোটোবড়ো একসারি বই। ‘ ( প্রাগুক্ত, পৃ ২২)

মার্কসকে নিয়ে আলোচনার আয়োজন সমকালে কেন অপরিহার্য, তা অনুধাবন করতে হলে কিছু বিষয়ে আলোকপাত প্রয়োজন। সেইসব বিষয় তুলে আনতে চাই, অসম বৈপরীত্যের বিশ্বকে সম বিশ্বে উত্তরণের পথ অনুসন্ধান। মানব সমাজের অর্থনেতিক ও রাজনৈতিক বিকাশের পথে কার্ল মার্কসের ভাবনাগুলোকে পুনরায় চর্চিত ও প্রয়োগ হতে পারে। ‘ মার্কস বলতেন, ‘বিজ্ঞানচর্চাকে স্বার্থপর আনন্দ-উপভোগে পরিণত করা ঠিক নয়। বিজ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করার মতো সৌভাগ্য অর্জন করেছে যারা, অর্জিত জ্ঞানকে মানুষের সেবায় তাদেরই সর্বপ্রথম কাজে লাগানো উচিত। তাঁর একটি বুলিই ছিল, ‘ মানুষের জন্য কাজ কর।’ ( পোল লাফার্গ, মার্কস-স্মরণে, প্রাগুক্ত, পৃ.২৬)

কার্ল মার্কসের বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি সমকালেও বিদ্যমান। ” আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে তাদের সকলের ইতিহাস শ্রেণী-সংগ্রামের ইতিহাস।’

ভিলহেলম লিবক্নখট (১৮২৬-১৯০০) নামক জার্মান সেশ্যাল ডেমোক্রিটিক পার্টির নেতা কার্ল মার্কস সম্পর্কে ১৮৯৬ সালে তাঁর স্মৃতিকথায় বলেন, ” মানুষ হিসেবে মার্কসের মূল্য এতখানি ছিল যে মাত্র অল্প কয়েকজন যুগন্ধর বিরাট মানুষই সেক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে তুলিত হতে পারেন।
কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ সৃষ্টিকর্মের বিনিময়ে বুর্জোয়া সমাজ কী দিয়েছিল মার্কসকে?
‘পুঁজি’ বইটি লিখতে মার্কসকে চল্লিশ বছর পরিশ্রম করতে হয়েছিল, আর সে এমনই পরিশ্রম যা ছিল একমাত্র মার্কসেরই সাধ্য। ”
” আমরা সোশ্যাল ডেমোক্রাটরা সাধুসন্ত চিনি না, তীর্থস্থান বলে মানি না তাঁদের কবরকে। কিন্তু উত্তর লন্ডনের ওই সমাধিক্ষেত্রে যিনি চির নিদ্রায় শায়িত, লক্ষ-লক্ষ মানুষ সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতায় তাঁকে স্মরঙ করে থাকে। আর শ্রমিক শ্রেণির স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে অবদমিত করে রাখতে চেষ্টিত যে বর্বরতা ও সংকীর্ণচিত্ততা, হাজার-হাজার বছর পরে তা যখন একদিন অতীতের অবিশ্বাস্য রূপকথায় পরিণত হবে তখন মুক্ত ও কৃতজ্ঞচিত্ত মানুষ টুপি খুলে ওই সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের সন্তানদের আকর্ষণ করে বলবেন: ”কার্ল মার্কস এখানেই নিদ্রাগত।’

মহান দার্শনিক কার্ল মার্কসের সমাধিতে দু’টি বাক্য লেখা,
১. Workers of all land unite ( দুনিয়ার মজদুর এক হও);
২. The philosophers have only interpreted the World in various ways– The point however to change it. ( এতদিনে দার্শনিকেরা কেবল বিশ্বকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে গেছেন, কিন্তু আসল কাজ হলো তা পরিবর্তন করা।)

এই মহান দার্শনিকের জন্ম ১৮১৮ সালের ৫মে প্রুশিয়ার সাম্রাজ্য প্রদেশের ট্রিয়ার নামক স্থানে । বাড়িতে ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত পড়াশোনা, ১৭ বছরে স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৮৪১সালে পিএইচড ডিগ্রী অর্জন করেন । জীবনের প্রথম পর্বে সাহিত্য , কবিতা চর্চা করতেন এবং সারাজীবন সাহিত্যানুরাগী ছিলেন।

১৮৪৩ এ প্যারিসে যান । ১৮৪৮ সালে সারা ইউরোপ জুড়ে বিপ্লব হলে মার্কসকেকে বন্দী করা হয়, বেলজিয়াম থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। ১৮৪৯ এ জার্মানিতে প্রত্যাবর্তন করেন। এসময় Newe Rheinische Zeiturs নামক পত্রিকা প্রকাশ করেন । পত্রিকায় দু’টি লেখা ও অন্যান্য কারণে তাঁকে বহিষ্কার ও পত্রিকা নিষিদ্ধ করা হয় । তাঁকে শরনার্থী হিসেবে প্যারিস নিতে অস্বীকৃতি জানায় । এই অবস্থায় লন্ডন ইউরোপ থেকে একজন শরনার্থী হিসেবে মার্কসকে গ্রহণ করে । এই লন্ডনেই তাঁর বন্ধু এঙ্গেলসের সাথে বিশ্বব্যাপী মানবতার দর্শন প্রতিষ্ঠায় তৎপর হোন । ১৮৬৭ সালে ঐতিহাসিক গ্রন্থ A Critique of Political Economy , ডাস ক্যাপিটাল তিনখন্ড প্রকাশিত হয় । ১৮৬৪ সালে তাঁরই প্রচেষ্টায় প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠিত হয় ।
তাঁর দর্শন , দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি , মালিক বা বুর্জোয়া শ্রেণীর শোষণ নির্যাতন থেকে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির মতবাদ, যাকে সমাজতন্ত্র বলা হয় । তিনি তাঁর পূর্বসূরি হেগেল, ইংরেজ অর্থনীতিবিদ আ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডোর তত্ত্ব দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আধুনিক এই মতবাদ প্রণয়ন করেন ।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে চারটি মূলনীতির মধ্যে সমাজতন্ত্র অন্যতম, সংবিধানে যা আছে তা হলো,’ মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র এবং পর্যায়ক্রমে সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার ভাবনায় ভাবিত ছিলেন।

কার্ল মার্কস ভারত বিষয়ক বহু প্রবন্ধ লিখেছেন, এবং মূল সামাজিক কাঠামো, পরিবর্তন ইত্যাদির ব্যাখ্যা দিয়েছেন ।
১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ বিশ্বের সেরা চিন্তাবিদ কার্ল মার্কস লন্ডনে ইন্তেকাল করেন ।
মহান দার্শনিকের মহাপ্রয়াণ নতুন বিশ্ব বিনির্মাণে শক্তি সৃষ্টি করবে।

© কামরুল ইসলাম

সর্বশেষ