হামলায় দিশাহারা মিয়ানমার সেনা

 

তরুণ-তরুণীদের আর্মিতে যোগ দেওয়ার নিয়ম জারি, তুমব্রু সীমান্তে থেমে থেমে গুলি, বালুখালী সীমান্তে তিন লাশ

বিদ্রোহী যোদ্ধাদের তীব্র হামলায় দিশাহারা অবস্থায় পড়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সামরিক অভ্যুত্থানের পর এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ হাজার সেনা হতাহত ও আটক হয়েছেন বলে একটি সংস্থা জানিয়েছে। বিদ্রোহীরা প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকা বা সামরিক স্থাপনা দখল করে নিচ্ছে। সেনা স্বল্পতায় দেশটির তরুণ-তরুণীদের সেনাবাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে লড়াই ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম-তমব্রু সংলগ্ন সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অংশে শনিবার গভীর রাত থেকে গতকাল সকাল ৭টা পর্যন্ত আবারও গুলির শব্দ পান এপারের সীমান্তবাসীরা। একই সঙ্গে গত শুক্রবার ও শনিবার পাওয়া দুটি আরপিজি (রকেট লাঞ্চার) সেনাবাহিনীর ‘বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট’ নিষ্ক্রিয় করেছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বালুখালী খালে আরও তিনটি লাশ ভেসে এসেছে। এর মধ্যে উখিয়া থানা পুলিশ গতকাল একটি লাশ উদ্ধার করেছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদে এসব তথ্য জানা গেছে।

হামলায় দিশাহারা মিয়ানমার সেনা

মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন শহরে প্রহরায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা -এএফপি

আমাদের বান্দরবান প্রতিনিধি ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজের উদ্বৃতি দিয়ে জানান, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম-তমব্রু সংলগ্ন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অংশে শনিবার গভীর রাত থেকে গতকাল সকাল ৭টা পর্যন্ত আবারও গুলির শব্দ শুনতে পান এপারের সীমান্তবাসীরা। সীমান্তের ওপার থেকে বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার গুলির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়নি। তবে শনিবার গভীর রাত থেকে রবিবার সকাল ৭টা পর্যন্ত থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেলেও রবিবার দিনভর আর কোনো গুলির শব্দ শোনা যায়নি।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র জানান, ঘুমধুমের তমব্রু এলাকায় শুক্রবার ও শনিবার পতিত অবস্থায় পাওয়া দুটি আরপিজি (রকেট লাঞ্চার) রবিবার বিকালে সেনাবাহিনীর ‘বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট’ নিষ্ক্রিয় করেছে। সীমান্তে বিজিবি সদস্যদের এখনো সার্বক্ষণিক টহল দিতে দেখা গেছে। সীমান্তের ওপারের সংঘাতে নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ করে দেওয়া ঘুমধুম ইউনিয়নের পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখনো খুলে দেওয়া হয়নি।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল মান্নান জানান, পরিস্থিতির উন্নতি হলে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শ করে গত সোমবার থেকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা বাইশফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাজাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিমকুল তমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ ঘুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে খুলে দেওয়া হতে পারে।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী বালুখালী খালে আরও তিনটি লাশ ভেসে এসেছে। এর মধ্যে উখিয়া থানা পুলিশ গতকাল দুপুর ২টার দিকে একটি লাশ উদ্ধার করে। উদ্ধার এই লাশের মাথায় হেলমেট ও হাতে গ্লাভস পরা ছিল। এ ছাড়া বালুখালী খালের একেবারে ওপরের দিকে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এলাকায় আরও দুটি লাশ দেখতে পান স্থায়ীরা। লাশ দুটি খালের ঝোপের মধ্যে ময়লা-আবর্জনায় পড়ে রয়েছে। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে লাশ দুটি দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, লাশগুলো মিয়ানমারের বিদ্রোহী কোনো গোষ্ঠীর সদস্যের হতে পারে।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম হোসেন বলেন, নাফ নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকা বালুখালী খালে জোয়ারের পানিতে লাশ ভেসে আসতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ একটি লাশ উদ্ধার করে। লাশের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে অন্য দুটি লাশের ব্যপারে তিনি কিছুই জানাননি।

পুলিশ জানায়, উদ্ধার লাশের মাথায় হেলমেট, হাতে গ্লাভস রয়েছে। লাশটি ফুলে গেছে। পুলিশ ধারণা করছে, কয়েক দিন আগে নিহত হয়েছে। এর আগে শনিবার উখিয়ার সীমান্ত এলাকার রহমতের বিল থেকে অজ্ঞাতপরিচয় একটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি।

এদিকে, উখিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ শামীম হোসাইন বলেন, ভেসে আসা লাশটি খাঁকি রঙের হেলমেট পরিহিত ছিল। কোমরে ব্যান্ড ছিল, শরীরের সঙ্গে বাঁধা একটি ব্যাগ থেকে ৯৯টি বুলেট, দুটি ম্যাগজিন পাওয়া যায়।

অন্যদিকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের ৩৩০ জন সদস্যকে নিতে আসা মিয়ানমারের নৌবাহিনীর জাহাজ এখনো বাংলাদেশের জলসীমায় আসেনি বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, কয়েক দিন ধরে নাইক্ষ্যংছড়ি ও উখিয়া সীমান্তের ওপারে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির সংঘর্ষ চলছে। ইতোমধ্যে বিজিপিকে হটিয়ে তুমব্রু রাইট ক্যাম্প ও ঢেঁকিবনিয়া সীমান্তচৌকিসহ মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর কয়েকটি ঘাঁটি আরাকান আর্মি দখলে নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এসব সংঘর্ষে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরাও জড়িয়ে পড়ার খবর শোনা গেছে।

তরুণ-তরুণীদের সেনাবাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক : মিয়ানমারের চলমান সহিংসতার মধ্যেই দেশটির তরুণ-তরুণীদের জন্য নতুন নিয়ম জারি করেছে জান্তা সরকার। দেশটির সব তরুণ ও তরুণীদের সেনাবাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেছে জান্তা। গতকাল রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, মিয়ানমারে ১৮-৩৫ বছর বয়সী সব পুরুষ এবং ১৮-২৭ বছর বয়সী নারীদের বাধ্যতামূলক দুই বছর পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে কাজ করতে হবে। এ ছাড়া ৪৫ বছর বয়সী চিকিৎসকদের বাধ্যতামূলক তিন বছর সেনাবাহিনীতে সেবা প্রদান করতে হবে। বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন অংশে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সশস্ত্র বিদ্রোহী বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে দেশটির সামরিক বাহিনী। এরই মধ্যে এ ঘোষণা দিল জান্তা।

জেলখানা থেকে সু চির চিঠিতে দুর্দশার বর্ণনা : জেলখানা থেকে ছেলে কিম অরিসের কাছে চিঠি লিখেছেন মিয়ানমারের বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চি। এতে তিনি কারাগারে যে দুর্দশার শিকারে পরিণত হচ্ছেন তার বর্ণনা করেছেন। সু চি জানিয়েছেন, তিনি পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছেন না। দাঁতের এবং শারীরিক বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন। এ অবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কিম অরিস।

সর্বশেষ