‘সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি’
দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে সরকারি উদ্যোগে বিআরটিএর অধীনে প্রাথমিক উৎস থেকে পূর্ণাঙ্গ ডাটা ব্যাংক চালু করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতা সংস্কার করা জরুরি বলেও মনে করে সংস্থাটি। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে সড়কে সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে অভিমত দেন বক্তারা

রবিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত ‘এসডিজি’র লক্ষ্য অর্জনে সরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ডাটা ব্যাংক চাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

সভায় যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সড়কের দুর্ঘটনা, প্রাণহানির চিত্র দেখলে মনে হয় দেশের সড়কে একটি ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে।আমাদের সীমিত সামর্থ্যরে কারণে প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার ডাটাবেজ সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। তাই সংবাদপত্র তথা সেকেন্ডারি উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন তৈরি করছি। ফলে সংগঠিত সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃতচিত্র আমাদের প্রতিবেদনে উঠে আসে না। আমরা মনে করি, দেশের গণমাধ্যমে সংগঠিত সড়ক দুর্ঘটনার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত স্থান পায়।সব সংবাদপত্র আমরা মনিটরিং করতে পারি না, তাই ২০ থেকে ২৫ শতাংশের চিত্র তুলে ধরতে পারি। বিআরটিএ এই সেকেন্ডারি সোর্সের তথ্যকে অতিরঞ্জিত বলে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রাথমিক উৎসগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত অবস্থা কী বা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে সত্যতা কি তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করছে না। ফলে সরকারের কাছে সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক চিত্র পৌঁছায় না।

অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সড়ক নিরাপত্তা জোট শ্রোতার সভাপতি, অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, ‘দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে সড়কে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনা পুর্ণাঙ্গ ডাটা ব্যাংক তৈরির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা তহবিলের সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। একই সাথে মানুষের সচেতনতা, সাধারণ মানুষকে দুর্ঘটনা আক্রান্তদের উদ্বার তৎপরতা সমৃক্ত করা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত কিন্তু একক দায়িত্ব প্রাপ্ত নন, তাই সরকারি বেসরকারি সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করা গেলে এর কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যেত। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের সড়কের অবকাঠামোগত বিস্তার ঘটছে, গাড়ি বাড়ছে, কিন্তু সড়ক নিরাপত্তা ইস্যুটি বরাবরই উপেক্ষিত থাকছে।’

আলোচনা সভায় ইসরাইল-হামাস ভয়াবহ যুদ্ধের সাথে তুলনা করে বলা হয়, ফিলিস্তিনের গাজায় এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ২৮ হাজার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে প্রাণহানি ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। এইযুদ্ধে এ পর্যন্ত আহত হয়েছে ৫৮ হাজার। দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হচ্ছে আড়াই থেকে তিন লাখ মানুষ। এহেন ভয়াবহ মহামারি সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে এসডিজি’র লক্ষ্য অর্জনে সরকারি উদ্যোগে বিআরটিএ’র অধীন প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ডাটা ব্যাংক চালু করার দাবি জানায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।’

সভায় বক্তারা বলেন, ২০২৩ সাল থেকে প্রথমবারের মত বিআরটিএ সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, বিআরটিএ প্রতিবেদনের সাথে পুলিশের প্রতিবেদন ও যাত্রী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবেদনের অমিল রয়েছে। বিআরটিএ’র সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৩ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২৪ জন নিহত, ৭ হাজার ৪৯৫ জন আহত হয়েছে। পুলিশের প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৪৭৫ জন নিহত হয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে ৬ হাজর ২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯০২ জন নিহত, ১০ হাজার ৩৭২ জন আহতের তথ্য মিলেছে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল রোড সেইফটি রিপোর্ট ২০২৩ এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২১ সালে ৩১ হাজর ৫৭৮ জন নিহত হয়েছে। বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার কোনো প্রকার খতিয়ে দেখা ছাড়াই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টকে অবাস্তব, যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেছে।
অন্যদিকে, বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা নিহত এবং আহতের সংখ্যা কাছাকাছি হওয়ায় বিআরটিএ’র সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতিসহ সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করে, যে কোনো ঘটনায় একজন নিহতের পেছনে ৩ থেকে ১০ জন পর্যন্ত আহত হয়ে থাকে। যা বিআরটিএ’র রিপোর্টে আসেনি।

এদিকে, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন তথা সেকেন্ডারি সোর্সের সমপরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের তথ্য বিআরটিএ’র বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনে তুলে আনতে না পারায় এই রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ না করায়, বিআরটিএ’র মাঠ পর্যায়ে তাদের রিপোর্টের উৎস ও রিপোর্ট তৈরির মেকানিজম সর্ম্পকে সম্যক ধারণা না থাকায়, রিপোর্টে এমন দুর্বলতা ফুটে উঠেছে বলে পরিবহন সংশ্লিষ্ট ও বুয়েটের দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞরা মনে করে।

সূত্র: কালেরকন্ঠ

সর্বশেষ