বাঙালির গৌরব ও অহংকারের মাস শুরু

সূচনা হলো বাঙালি জাতির গৌরব ও অহংকারের মাসের। আজ ১ মার্চ। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাসের প্রথম দিন। ৫৩ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই মার্চেই ডাক এসেছিল বাঙালির স্বাধীনতা-সংগ্রামের। এ মাসেই জাতির চূড়ান্ত স্বাধীনতা-সংগ্রামের আনুষ্ঠানিক সূচনাও ঘটেছিল। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই সংগ্রামে। এর মধ্য দিয়েই জাতি জাগ্রত করে তার নতুন ঠিকানার স্বপ্ন; তৈরি করে পরাধীনতার গ্লানি থেকে নিজেকে মুক্ত করার সোপান।

গৌরবোজ্জ্বল মার্চকে বরণ করে নিতে দেশজুড়ে কর্মসূচি ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। গতকাল রাত ১২টা ১ মিনিটে ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ ও আলোকশিখা প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বিভিন্ন সংগঠনের মাসব্যাপী কর্মসূচি। স্বেচ্ছাসেবক লীগ রাত ১২টা ১ মিনিটে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ‘শিখা চিরন্তন’-এ মোমবাতি প্রজ্বালন ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। সারাদেশেও অসংখ্য দল ও সংগঠনের ব্যানারে ছিল অনুরূপ কর্মসূচি। আর এসব কর্মসূচিতে জাতি স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া সূর্যসন্তানদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে।

মূলত ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকেই বাঙালির ধারাবাহিক স্বাধীনতা-সংগ্রামের শেষ ধাপের প্রতিরোধের শুরু। এদিনই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দু’যুগের ধারাবাহিক শোষণের বলয় থেকে বের হয়ে মুক্তির স্বাদ নিতে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে পুরো দেশ ও জাতি।এদিন দুপুর ১টায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াহিয়া খান আকস্মিক এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেন। এর কারণ হিসেবে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত পাকিস্তান পিপলস পার্টিসহ কয়েকটি দলের জাতীয় অধিবেশনে যোগদানের অনিচ্ছার সাফাই গান তিনি।

ইয়াহিয়ার এই ঘোষণা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গের গোটা জনপদকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। এই স্বৈরশাসকের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সর্বস্তরের মানুষ। ছাত্র, শিক্ষক, আইনজীবী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কলকারখানার শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ নেমে আসেন রাস্তায়। বন্ধ হয়ে যায় সব দোকানপাট। বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন ঢাকার মতিঝিলের হোটেল পূর্বাণীর সামনে।

সেখানে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের বৈঠকে বসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এদিকে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ছুটে যান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। পরে সেখান থেকে তারা হোটেল পূর্বাণীর সামনে সমবেত হন। স্বাধীনতাকামী মানুষের মুখে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’– এ স্লোগান আগের চেয়ে আরও দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত হতে শুরু করে।

সেদিন থেকেই সারাদেশে শুরু হওয়া সর্বাত্মক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সূত্রপাত ঘটে অসহযোগ আন্দোলনের। এক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিমা সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণই অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রকৃত কর্তৃত্ব চলে যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে তাঁরই কণ্ঠে ঘোষিত হয়, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর এ ঘোষণা স্বাধীনতা-সংগ্রামের পথে আরও সুনির্দিষ্টভাবে এগিয়ে নিয়ে যায় জাতিকে। ইস্পাতকঠিন সুদৃঢ় ঐক্যে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করে গোটা জাতি।

আরেকদিকে তখন রচিত হচ্ছিল বাঙালি নিধন আর তাদের চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার নীলনকশা। নানা কূটকৌশলে সময়ক্ষেপণের পর পশ্চিম পাকিস্তানিরা নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২৫ মার্চ কালরাতে পৃথিবীর ইতিহাসের ঘৃণ্যতম ও বর্বরোচিত গণহত্যা চালায়। তবে অকুতোভয় বীর বাঙালিও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণহত্যার মধ্যরাতেই তথা ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর হাতে গ্রেপ্তারের আগমুহূর্তে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ডাকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্রের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়ায় বাঙালি। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নেয় নতুন একটি দেশ– বাংলাদেশ। তবে নতুন রাষ্ট্র গড়ায় বাঙালিকেও দিতে হয়েছে চরম মূল্য। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর বহু প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা।

 

সর্বশেষ