গ্লেন ম্যাকগ্রা দ্যা পিজিয়ন

আকাশ দাশ সৈকত

এমন অনেক ক্রিকেটার আছেন যারা অনেক দুর্ভেদ্য বাঁধা জয় করে সফলতার শিখরে পৌঁছতে পেরেছেন। তাঁদের গল্পটা এতটাই হৃদয়গ্রাহী ও সংগ্রামী যে, তা দিব্যি সিনেমার গল্পকেও হার মানাতে পারে। সে সিনেমার একটি নাম আপনি দিতে পারে গ্লেন ম্যাকগ্রা কিংবা চিত্রনাট্যের প্রধান চরিত্রে রাখতে পারেন অজি কিংবদন্তিকে।

আপনি যখন একটা গল্প লিখবেন কিংবা একটা ব্লকবাস্টার সিনেমা তৈরি করতে যাবেন তখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই চরিত্রের জন্য একটা আদর্শ কাহিনী কি হতে পারে? একটি সুন্দর উপস্থাপন নিয়ে তৈরি গল্প কিংবা চমকপ্রদ একটা চিত্রনাট্য নিয়ে তৈরি করতে পারেন যা দর্শক মহলের হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং প্রতিটি অবিস্মরণীয় যাত্রার কাহিনী সিনেমাটিকে অভূতপূর্ব করে তোলে! যেমন দরুণ প্রতিটি ব্যবসা সফল সিনেমা তৈরির জন্য একজন প্রয়োজক তার চলচ্চিত্রকার আর অন্যান্য অভিনয় শিল্পীরা এমন নিখুঁত গল্প অন্বেষণ করে থাকেন। প্রতিটি সফল চরিত্রের পিছনে যেমন একটি বাস্তব কাহিনী তুলে ধরার চেষ্টা করেন পরিচালক যেখানে একটা উজ্জ্বল কাহিনী আছে তা ক্রিকেটারদের অনেক জীবনীর মধ্যেও বিদ্যমান।

কেউ যদি বলে শচীন টেন্ডুলকার ভালো ব্যাট করতে পারে না, তাহলে তা চরমভাবে বিদ্রূপাত্মক হবে? মানুষ উচ্চস্বরে হাসবে এবং একে একটি হাস্যকর কৌতুক হিসাবে গ্রহন করবে। কিংবা যখন প্রতিক্রিয়া একই হবে যদি কেউ বলে যে কিংবদন্তি গ্লেন ম্যাকগ্রাথ ভালো বল করতে পারে না! আপনি তখন একটা বিস্ময়সূচক বাক্য নিজের জন্য তুলে রাখবেন, আর বলবেন কি! তবে এমন আশ্চর্যের কিছুই নেই এমন সময় ছিল যখন মানুষ এই বাক্য অনুভব করতো এবং বলতো যে কিংবদন্তি ম্যাকগ্রা কখনো খুব ভালো বোলার হতে পারবে না!

ম্যাকগ্রা দেখতে ছিলেন খুব ফ্যাকাশে এবং খুবই লিকলিকে গড়নের। তার বোলিং ছিল একেবারেই অগোছালো এবং ডেনিস লিলির মত ক্রিকেট বোদ্ধাও তাকে একটি ট্রেইনিং ক্যাম্পে দেখে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়। ১৬ বছরের কিশোর গ্লেন ম্যাকগ্রা অস্ট্রেলিয়ার ‘ব্যাগী গ্রিন ক্যাপ’ পাওয়ার জন্য ছিলো উদগ্রীব কিন্তু সে জানে যে তার স্বপ্ন ছোঁয়ার জন্য তাকে আরো যোজন যোজন পথ পাড়ি দিতে হবে, সে নিরবে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করতে থাকে এবং ম্যাকগ্রা তার লাইন-লেন্থ ঠিক করার জন্য একটি ৪৪ গ্যালন ড্রামের বিপক্ষে টানা বোলিং করে যেত। একবছর কঠিন পরিশ্রমের পর ম্যাকগ্রা ডগ ওয়াল্টারের নজরে পড়ে, ফলে ক্রিকেট অধ্যায়ের এক নতুন ইতিহাস রচিত হয়। আকাশ চোপড়া একটি ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যখন ভারত সফরের সময় ম্যাকগ্রাথর একটি লেগ-সাইডের বলে আউট হয়েছিলো, যা তাকে বিস্মিত করেছিল।

ম্যাকগ্রা ব্যাক্তিজীবনে জেন ম্যাকগ্রার প্রেমে পড়েন এবং সারাজীবন তার সাথে কাটানোর ইচ্ছা পোষন করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং তাদের ঘর আলো করে আসে দুটি সন্তান। ২০০৮ সালে তার প্রিয় স্ত্রী স্তন ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায়। তার প্রিয় স্ত্রী জেনের মত কেউ যেন বিদায় না নেয় তাই ম্যাকগ্রা পরিবার গঠন করে ‘ম্যাকগ্রা ফাউন্ডেশন’,যা তার স্ত্রী ও সে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করে। ‘ম্যাকগ্রা ফাউন্ডেশন’ স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করে থাকে।

ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ম্যাকগ্রাকে নিয়ে হয়তো লিখার মতো আর কিছু নেই – এক কথায় অসাধারণ! ১২ নভেম্বর ১৯৯৩ সালে অভিষেক হওয়া এই ক্রিকেটার ক্রিকেটের অন্যন্য এক সৌন্দর্যের প্রতীক! ক্যারিয়ারটাই বা বলে দেয় আপনার অজানা কথাগুলো..!

★ ১২৪ টেস্ট ম্যাচে উইকেট সংখ্যা ৫৬৩!
যা আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে পেসারদের মাঝে ২য় সর্বোচ্চ উইকেট!

★ ২৫০ ওয়ানডে ম্যাচে উইকেট সংখ্যা ৩৮১! যা অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট। ইকোনমি মাত্র ৩.৮৮! যা তাকে আলাদা করে চেনায়। ওয়ানডে ক্রিকেটে ৩০০ উইকেট নেয়া বোলারদের মাঝে তার ইকোনমি ২য় সর্বনিম্ন!

★ ক্যারিয়ারে খেলেছেন মাত্র ২ টা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ, তাতে উইকেট সংখ্যা ৫।

★ ক্যারিয়ারে খেলা ৪ বিশ্বকাপ আসরের (১৯৯৬,১৯৯৯,২০০৩,২০০৭) প্রতিবারই খেলেছেন ফাইনালে। আর চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন ৩ বার!

★ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ৪ বার অংশ নিয়ে ম্যাকগ্রার শিকার ৭১ উইকেট! যা বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী করে রেখেছে তাকে।

★ এছাড়া বিশ্বের প্রথম বোলার হিসেবে নিজের শেষ টেস্ট এবং ওয়ানডেতে উইকেট নিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি।

ব্যাট হাতে একবা অর্ধশতকের দেখা পেলেও ব্যক্তি জীবনে এখনো নট আউট হয়ে চলছে তার জীবন। সেইদিনের লম্বা আর খুব ফ্যাকাশে সাথে লিকলিকে গড়নের কিশোর ছেলেটার আজ ৫৪তম জন্মদিন

শুভ জন্মদিন❤

সর্বশেষ