জ্বালানির জ্বালাতনে জীবন নাভিশ্বাস

বাড়ল গ্যাসের দাম, প্রজ্ঞাপন জারি

 

ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়ার ফলে জনজীবন অতিষ্ঠ। গতকাল বুধবার আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়ার ফলে দৈনন্দিন ব্যয়ের পাশাপাশি জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

সরকার বলছে, ভর্তুকি সমন্বয় ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের ভুলনীতি ও কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে এ সংকট তৈরি হয়েছে। এর মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সরকার আন্তরিক হলে দাম না বাড়িয়ে বিকল্প কোনো পথেও যেতে পারত।

জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দাবি করছে, গত আগস্টে মূল্যস্ফীতি ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর তা ধীরে ধীরে কমছে। কিন্তু খোদ সরকারি আরেক প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশনের (টিসিবি) হিসেবেই দেখা যাচ্ছে, প্রতি মাসে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে।

বিবিএস সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম কমেছে দাবি করলেও বাজারের চিত্র পুরোটাই উল্টো। বরং টিসিবির এক মাসের হিসাবে প্রতিটি পণ্যের দামই বেড়েছে।

জ্বালানির জ্বালাতনে জীবন

বিবিএসের হিসেবেই গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ক্রমেই বাড়ছে। নভেম্বরে তা ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৯২ শতাংশ। গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি গ্রামে লাগামছাড়া। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৩১ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে গত বছর আগস্টে সরকার অস্বাভাবিকহারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। ওই সময় ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৮০ টাকা বাড়িয়ে একলাফে ১১৪, পেট্রোল ৮৬ থেকে ১৩০ এবং অকটেনের দাম ৮৯ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ব্যাপক সমালোচনার মুখে কয়েক দিনের মাথায় লিটারপ্রতি দাম ৫ টাকা কমিয়ে যথাক্রমে ১০৯, ১২৫ ও ১৩০ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। পরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফা কমলেও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেনি।

তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধকল সামলাতে না সামলাতেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দেয় বিতরণ কোম্পানি। তা নিয়ে গত ৮ জানুয়ারি গণশুনানিও শুরু হয়। কিন্তু কমিশনের মূল্যবৃদ্ধির এ প্রক্রিয়া শেষ হতে না হতেই ১২ জানুয়ারি নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ বিভাগ বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করেছে যা চলতি মাস থেকেই কার্যকর হয়েছে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। সপ্তাহ না ঘুরতেই গণশুনানি ছাড়াই গতকাল আবারও নির্বাহী আদেশে গ্যাসের দাম খাতভেদে ১৪ থেকে ১৭৮ শতাংশ বাড়ায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির এ মূল্যবৃদ্ধি একেবারেই অযৌক্তিক মনে করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘অনেক ভালো বিকল্প থাকলেও সরকার সে পথে যায়নি। এখন বলা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ঘাটতি মেটাতে দাম বাড়ানো হচ্ছে। অথচ জ্বালানি খাতের এ দূরবস্থার জন্য সরকার নিজেই দায়ী।’

‘বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনেক আগে থেকেই বিদেশ থেকে চড়া দামে এলএনজি আমদানির কথা বলে আসছেন। তিনি যতদিন ধরে এটা বলছেন, সেই সময়ের মধ্যে সরকার আন্তরিক হলে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন করে জ্বালানির চাহিদা মেটাতে পারত। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। কিন্তু সরকার তা না করে কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। এটা বড় অপরাধ। আর এ অপরাধের দায় বারবার পড়ছে জনগনের কাঁধে’ যোগ করেন তিনি।

আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে কিছু গোষ্ঠীকে যে পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে তা পদ্মা সেতুর ব্যয়ের দ্বিগুণ। অনেক কম খরচে দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান না করে চড়া দামে এলএনজি আমদানিতে আগ্রহ বেশি সরকারের। কিন্তু এলএনজির দাম দিন দিন বাড়তেই থাকবে। সবকিছু করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। জেনেশুনে কিছু মানুষকে লাভবান করতে গিয়ে দায় মানুষের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে।’

সূত্রমতে, ২০১৯ সালে দৈনিক ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানির কথা বলে গ্যাসের দাম ৩২ শতাংশের কিছু বেশি বাড়ানো হয়। যদিও পরে সরকার আমদানি ততটা করেনি। এ কারণে বাড়তি আদায় করা ৯ হাজার কোটি টাকা গ্রাহকদের ফেরত দিতে পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দেয় জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। পেট্রোবাংলা সেই টাকা ফেরত দেয়নি।

২০২২ সালে আবারও দিনে ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানির কথা বলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় পেট্রোবাংলা। বিইআরসি গত জুনে ওই প্রস্তাবের ভিত্তিতে গ্যাসের দাম প্রায় ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। তখন আমদানি ধরা হয়েছিল দিনে ৬৮ কোটি ঘনফুট। কিন্তু সরকার পরের মাস জুলাইয়ে খোলা বাজার থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ করে দেয়। এতে এলএনজি সরবরাহ কমে যায়। সেটা একসময় দৈনিক ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে যায়। এখন দিনে এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাবে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। পরোক্ষভাবে এর প্রভাব পড়বে ক্রেতার ওপর। এমনিতেই গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে কারখানায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নতুন করে এত দাম বাড়ার কারণে শিল্পমালিকরা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে গেলেন। এরপরও যদি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যেত তাতেও ক্ষতি কিছুটা কমানো যেত। কিন্তু সরকার এ ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা এখনো দিতে পারেনি। সামগ্রিকভাবে এ দাম বাড়ার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশ-বিদেশে সবখানে।’

“আমাদের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। দফায় দফায় দাম বাড়ার ফলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। দেশে এখন ‘ফরেন কারেন্সির’ ব্যাপক সংকট চলছে। এ সময়ে যদি রপ্তানি আয় কমে যায় তাহলে সংকট আরও বাড়বে। তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে” বলেন তিনি।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, “সরকার এখন গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করতে চাইছে। এ জন্য ৩০ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা দরকার। এ টাকা সমন্বয় করে গ্যাস-বিদ্যুতের যে দাম হবে তা সোনার চেয়েও দামি হবে। এ পরিস্থিতিতে চড়া দামে বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা অসম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো এখন মুনাফায় রয়েছে। এখন দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই। করোনায় এমনিতেই মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ। তারা এ মূল্যবৃদ্ধির চাপ নেওয়ার অবস্থায় নেই।’

সংকট থেকে বের হওয়ার উপায় জানতে চাইলে এ জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘প্রথমত বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিকীকরণ মুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত নিজস্ব জ¦ালানি সম্পদের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সাশ্রয়ী হতে হবে। সর্বশেষ উপায় হলো, অযৌক্তিক ও লুণ্ঠনমূলক সব ব্যয় বন্ধ করতে হবে। তবেই সংকট কমবে। না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।’

কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করে অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ববাজারে পণ্যের বাড়ানোর কারণে সরকারের ভর্তুকি বেড়েছে। এখন সেই ভর্তুকি ব্যয় কমবে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কিছু বাড়বে। সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে। সরকারকেও এ ব্যাপারে সহায়তা করতে হবে। ভর্তুকি কমিয়ে সরকারের যে অর্থ সাশ্রয় হবে তা দিয়ে নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হবে। আরও বেশি উন্নয়ন করতে হবে, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’

‘আমরা যেহেতু আত্মনির্ভরশীল হতে চাই, তাই ভর্তুকি থেকে আস্তে আস্তে বের হতে হবে। কারণ কভিড-পরবর্তী চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। আমাদের ট্যাক্স জিডিপি রেশিও কম। ভর্তুকি কমিয়ে দেশের উন্নয়ন হলে সেটা অবশ্যই ভালো। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে সরকারকে’ বলেন তিনি।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর গতকাল রাতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ গণমাধ্যমে পাঠানো ব্যাখ্যায় বলেছে, ভর্তুকি সমন্বয় ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগের দাবি, বর্তমান বৈশ্বিক বিশেষ জ্বালানি পরিস্থিতিতে ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী সব ধরনের জ্বালানির মূল্যে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। জ্বালানিসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয়, যেমন বীমা খরচ, ঝুঁকি ব্যয়, ব্যাংক সুদ, ডলারের বিপরীতে টাকা দুর্বল হওয়ায় সামগ্রিকভাবে জ্বালানি খাতে ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় এলএনজির আমদানি মূল্যও অস্বাভাবিক পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায় এ খাতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছিল।

চলমান কৃষি সেচ মৌসুম, আসন্ন রমজান ও গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বর্ধিত চাহিদা মেটানো, শিল্প খাতে উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং রপ্তানিমুখী বিভিন্ন কলকারখানার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে করণীয় সম্পর্কে সব অংশীজনের মতামত গ্রহণ করা হয়। যেহেতু স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানিপূর্বক ওই বর্ধিত চাহিদা পূরণ করতে হবে, সে কারণে সরকার বিদ্যুৎ, শিল্প, ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সর্বশেষ