খাঁড়ার ঘা এ মাসেই বাড়ছে গ্যাসের দাম

 

মাত্র চার দিন আগে সরকারের নির্বাহী আদেশে খুচরা পর্যায়ে বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। এবার বাড়ানো হচ্ছে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম। চলতি মাসেই দাম বাড়ানো হবে। গণশুনানির মাধ্যমে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম বাড়ানোর কাজটি করে এলেও এবার তা হচ্ছে না। খুচরা বিদ্যুতের মতো গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দামও বাড়ানো হবে সরকারের নির্বাহী আদেশে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমাতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নানা রকম সংকটের মধ্যে বিদ্যুতের পর গ্যাসের দাম বৃদ্ধি হবে মরার উপর খাঁড়ার ঘা। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর গ্যাসের দাম বাড়ালে ভোক্তাদের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যাবে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ক্রমেই বাড়ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে আসছে। এ অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়লে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি এ ধরনের প্রক্রিয়ার কারণে বিইআরসি কার্যকারিতা হারাবে।

চলতি মাসের শুরুতেই পেট্রোবাংলার মাধ্যমে বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান। এদিকে, গ্রাহক পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির জন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সম্পর্কে কিছুই জানে না বিইআরসি।

বিইআরসির চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জলিল বলেন, আমরা শুনেছি বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্যাসের দাম বাড়াতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছে। নির্বাহী আদেশে দাম বাড়াতে সরকার আইন পরিবর্তন করেছে। এখানে আমাদের বলার কিছু নেই। সরকার চাইলেই দাম কমাতে বা বাড়াতে পারবে।

তবে এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ও পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তাই আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিতরণ কোম্পানিগুলো বাসাবাড়ির গ্রাহকদের ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এক চুলা ব্যবহারে প্রতি মাসে খরচ ৯৯০ থেকে ১৬৮ টাকা বেড়ে হবে ১ হাজার ১৫৮ টাকা। আর দুই চুলা ব্যবহারের বর্তমান খরচ ১ হাজার ৮০ থেকে ১৮৩ টাকা বেড়ে ১ হাজার ২৬৩ টাকা হবে।

প্রস্তাবনায় শিল্প গ্রাহকদের জন্য সর্বোচ্চ ২৪ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠন শিল্পের উৎপাদনের স্বার্থে বেশি দামে হলেও গ্যাস সরবরাহ করার কথা বলেন। বেশি দাম পরিশোধ করবে বলেও জানায়। সরকার ভর্তুকি সমন্বয় করতে এই খাতে সবচেয়ে বেশি দাম বাড়াতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। বর্তমানে প্রতি ঘনমিটারে বৃহৎ শিল্পকে ১১ টাকা ৯৮ পয়সা, মাঝারি শিল্পকে ১১ টাকা ৭৮ পয়সা এবং ক্ষুদ্র শিল্পকে ১০ টাকা ৭৮ পয়সা করে দিতে হয়। জানা গেছে, এ ছাড়া শিল্পে ব্যবহৃত ক্যাপটিভ পাওয়ারের ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১৬ থেকে বেড়ে ২৪ টাকা হতে পারে।

এই দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম। তিনি কালবেলাকে বলেন, আমরা এই দাম বৃদ্ধির কোনো কারণ দেখছি না। দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের কাছে নির্বাহী ক্ষমতা আছে, সেটাই তারা ব্যবহার করছে। এ ধরনের কার্যক্রম জ্বালানি খাতকে পঙ্গু করে দেবে। কোনো স্বচ্ছতা থাকবে না।

সর্বশেষ গণশুনানির মাধ্যমে গেল বছরের ৫ জুন গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। ওই সময় সিএনজি ছাড়া সব শ্রেণির গ্রাহকের গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। পাইপলাইনে সরবরাহ করা ঘনমিটার প্রতি গ্যাসের দাম ৯ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়িয়ে ১১ টাকা ৯১ পয়সা করা হয়। রান্নার গ্যাসের জন্য দুই চুলার (ডাবল বার্নার) মাসিক বিল ৯৭৫ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮০ এবং এক চুলার মাসিক বিল ৯২৫ থেকে বাড়িয়ে ৯৯০ টাকা করা হয়। আর প্রিপেইড মিটারে প্রতি ইউনিটের খরচ ১২ টাকা ৬০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৮ টাকা করা হয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ০২ পয়সা, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৬ টাকা, আর সার কারখানার জন্য ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা করা হয়।

শিল্প কারখানায় প্রতি ঘনমিটার ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে বৃহৎ শিল্পকে ১১ টাকা ৯৮ পয়সা, মাঝারি শিল্পকে ১১ টাকা ৭৮ পয়সা এবং ক্ষুদ্র শিল্পকে ১০ টাকা ৭৮ পয়সা করা হয়। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের (হোটেল, রেস্তোরাঁ) ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম ২৩ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ২৬ টাকা ৬৪ পয়সা।

উল্লেখ্য, বিইআরসি গণশুনানি করলেও গত ১২ জানুয়ারি সরকারের নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়।

সর্বশেষ