বিদ্যুতের দাম বাড়লো

 

সরকারের নির্বাহী আদেশে দেশে এবার গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর ফলে জানুয়ারি মাসের বিদ্যুতের বিল থেকেই নতুন দাম কার্যকর করা হবে। এর আগে গত কয়েক বছর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) শুনানি শেষে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু এবার বিইআরসি অধ্যাদেশ সংশোধনের কারণে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণকারী দায়িত্বপ্রাপ্ত এই সংস্থার শুনানিকে পাশ কাটিয়েই গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়েছিল। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশের নতুন গেজেট গতকাল সন্ধ্যায় প্রকাশ করা হয়। তবে নির্বাহী আদেশে এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘটনা নজিরবিহীন। বিশেষ করে বিইআরসির বিবেচনাধীন থাকা অবস্থায় বিদ্যুতের দাম নির্বাহী আদেশে বাড়ানোয় সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা অবাক হয়েছেন। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দীর্ঘ ১২ থেকে ১৪ বছর আমরা জ্বালানি খাতে স্বচ্ছ ও শক্তিশালী রেগুলেটরি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছি। সে ব্যাপারে আমরা আন্দোলনেও আছি। দেশে সে ব্যবস্থা উত্তরোত্তরভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। রেগুলেটরি ব্যবস্থায় কোন দেশ সমৃদ্ধ হওয়ার অর্থ হচ্ছে এটি সভ্যতার প্রতীক। আমরা সে ব্যবস্থায় সমৃদ্ধ হচ্ছিলাম। সেখানে একটা জবাবদিহিতার ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছিল। সরকার নিজে ব্যবসায়ী, সরকারি কোম্পানিগুলো এখানে ব্যবসা করছে। তবে নিজে ব্যবসায়ী হয়ে নিজেই মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা কখনো নেওয়া যায় না। এটি আইনের দর্শনের পরিপন্থী। আবার নিজে মূল্য নির্ধারণ করলেও তা আইনি প্রক্রিয়ায় হতে হবে, যা খুশি তা করা যাবে না। ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিয়ে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে চলে গেলাম’ এই মূল্য নির্ধারণের আদেশে সরকার তা প্রতিষ্ঠিত করল। এই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সরকার যখন খুশি যত খুশি জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ক্ষমতা পেয়ে গেল। চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এর ফলে সরকারকে কারও কাছে আর জবাবদিহি করতে হবে না। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভর্তুকি সমন্বয় করতে বিদ্যুতের মূল শতকরা ৫ ভাগ বাড়ানো হয়েছে। এতে লাইফলাইন গ্রাহকদের ইউনিট প্রতি ১৯ পয়সা বাড়বে।

নতুন প্রকাশিত গেজেট উল্লেখ করা হয়, আবাসিকের লাইফলাইন গ্রাহকের (৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী) ইউনিট প্রতি ১৩ পয়সা বাড়িয়ে ৩ টাকা ৯৪ পয়সা, প্রথমধাপে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী ২১ পয়সা বাড়িয়ে ৪ টাকা ৪০ পয়সা, দ্বিতীয় ধাপে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ২৯ পয়সা হারে বাড়িয়ে ৬ টাকা ০১ পয়সা, ২০১-৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৬ টাকা ৩০ পয়সা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিল ৩২ পয়সা বাড়িয়ে ৬ টাকা ৬৬ পয়সা, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ৫০ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৪৪ পয়সা এবং সর্বশেষ ধাপ ৬০০ ইউনিটের ওপরে ১১ টাকা ৪৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২ টাকা ০৩ পয়সা করা হয়েছে। এর আগে বিদ্যুতের বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাম বৃদ্ধির আবেদনের ওপর ৮ জানুয়ারি শুনানি গ্রহণ করে বিইআরসি। বিইআরসির গণশুনানিতে কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি ভোক্তা পর্যায়ের খুচরা বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করে। সুপারিশে বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানির প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টার গড় মূল্য ৭ টাকা ১৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ২৩ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শুনানিতে বিইআরসি অংশীজনদের তাদের যুক্তির পক্ষে নথিপত্র জমা দেওয়ার জন্য ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এ জন্য ১৫ জানুয়ারির আগে বিইআরসির বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু বিইআরসি অধ্যাদেশ সংশোধনের কারণে শুনানির চারদিনের মাথায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত কয়েক বছর ধরেই বিইআরসি বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের কাজ করে আসছিল। সম্প্রতি বিইআরসি আইনের সংশোধনী এনে বিইআরসির পাশাপাশি নির্বাহী আদেশে দাম বাড়ানোর ধারা যুক্ত করা হয়। এর আগে বিইআরসি গত ২১ নভেম্বর বিদ্যুতের পাইকারি দাম ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৫ দশমিক ১৭ টাকা বাড়িয়ে ৬ দশমিক ২০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এরপরই বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন জমা দেয়।

সর্বশেষ