ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রভাব টাকার অবমূল্যায়নের পেটে ঋণের প্রবৃদ্ধি

ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রভাব টাকার অবমূল্যায়নের পেটে ঋণের প্রবৃদ্ধি

 

ডলারের বিপরীতে বড় ধরনের অবমূল্যায়নের কারণে টাকার মান কমেছে, বেড়েছে ডলারের দাম। এতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ব্যাংকগুলোর দেওয়া ঋণ টাকার হিসাবে বেড়েছে। কিন্তু ডলারের হিসাবে কমেছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য যেহেতু ডলারে সম্পন্ন হচ্ছে, সেহেতু নিট হিসাবে দুই খাতেই ঋণের প্রবাহ কমেছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে ঋণের প্রবৃদ্ধির হার নেতিবাচক পর্যায়ে চলে গেছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করায় এ খাতে ঋণ প্রবাহ কমেছে, কিন্তু রপ্তানিতে ঋণ উৎসাহিত করা হলেও বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। দুই খাতেই ঋণের প্রবাহ কমার কারণে সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিয়েছে। একই অবস্থা বেসরকারি খাতসহ অন্যান্য খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিতেও। এছাড়া টাকায় হিসাব করা হয় এমন সব খাতেই ডলারের হিসাবে প্রবৃদ্ধির হারও কম হবে।

বাণিজ্যে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। টাকার হিসাবে দুই খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশ। গত এপ্রিল থেকে ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের কারণে টাকার হিসাবে ঋণ বেড়েছে বেশি মাত্রায়। কিন্তু ডলারের হিসাবে ঋণ বাড়েনি। বরং কমেছে।

এ হিসাব শুধু আমদানি-রপ্তানিতেই নয়। অর্থনীতির সব উপকরণেই এর প্রভাব পড়েছে। ঋণ প্রবাহ, মানুষের আয় বাড়ার যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে সেগুলো সবই টাকায়। ডলারের হিসাব করলে এগুলোর প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি কমে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হারের মধ্যকার ব্যবধান বেশি মাত্রায় বেড়ে গেলে সব হিসাবেই টাকা ও ডলারের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য দেখা দেয়। যে হারে টাকার মান কমেছে, তার চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারলে তা ইতিবাচক হবে। টাকার অবমূল্যায়নের চেয়ে কম বাড়লে তা নেতিবাচক হবে। এখন সরকারি খাতসহ বিভিন্ন খাতে ঋণের যে প্রবৃদ্ধি দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তার প্রবৃদ্ধি ততটা নয়, অনেক কম। কারণ টাকার অবমূল্যায়ন তা খেয়ে ফেলছে। টাকার সঙ্গে ডলারে হিসাব করলে ব্যবধানটা অনেক বেশি হবে। তখন বোঝা যাবে দেশের অর্থনীতি সার্বিকভাবে ওপরে ওঠার চেয়ে কতটা নেমে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরেই ডলারের বিপরীতে টাকার মান স্থিতিশীল রয়েছে। গত মার্চ থেকে ডলারের দাম বাড়তে থাকে। যে কারণে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের হিসাবের প্রবৃদ্ধি ডলার ও টাকায় পাশাপাশি অবস্থান করছিল। মার্চ থেকে ডলারের দাম বাড়ায় বিভিন্ন খাতে ডলার ও টাকার হিসাবে ব্যবধান বেড়েই চলেছে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে টাকার হিসাবে বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থায়ন বেড়েছিল ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। ডলারের হিসাবে বেড়েছিল সাড়ে ৭ শতাংশ। ২০২০ সালের মার্চে টাকার হিসাবে ৮ দশমিক ২ শতাংশ, ডলারের হিসাবে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে টাকার হিসাবে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, টাকার হিসাবে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২১ সালের মার্চে টাকার হিসাবে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ডলারের হিসাবে ৯ দশমিক ১ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে টাকার হিসাবে সাড়ে ৭ শতাংশ, ডলারের হিসাবে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ডলারের দাম ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। ওই দুই বছরে ডলারের দাম বেড়েছিল মাত্র ৩০ পয়সা। যে কারণে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ডলার ও টাকার হিসাবে প্রবৃদ্ধির ওঠানামা কাছাকাছি অবস্থানে ছিল।

গত মার্চে ডলারের দাম বেশি মাত্রায় বাড়তে থাকে। গত ফেব্রুয়ারিতে ডলার ছিল ৮৬ টাকা। মার্চে তা বেড়ে ৮৬ টাকা ২০ পয়সা হয়। মে মাসে হয় ৮৯ টাকা। গত ডিসেম্বরে ছিল ১০৭ টাকা। এ হিসাবে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ২৫ শতাংশ। ফলে মার্চ থেকেই অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে ডলার ও টাকার হিসাবে ব্যবধান বাড়তে থাকে। মার্চে টাকার হিসাবে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়েছিল ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ, ডলারের হিসাবে ১৬ শতাংশ। ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ৩ শতাংশ। আগে ছিল ১ থেকে ২ শতাংশ। জুনে ওই দুই খাতে টাকার হিসাবে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, ডলারে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ১১ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বরে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ঋণের প্রবৃদ্ধি টাকায় হয়েছিল ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। ডলারের হিসাবে নেতিবাচক ০.১ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৯ শতাংশ। নভেম্বরে এই ব্যবধান আরও বাড়ে। ওই মাসে টাকায় প্রবৃদ্ধি হয় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ডলারে হয় নেতিবাচক ০.৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান প্রায় সাড়ে ১৯ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ডলারের দাম ধীরে ধীরে বাড়ানো উচিত ছিল। তাহলে হঠাৎ করে ডলারের ওপর চাপ পড়ত না। ধীরে ধীরে বাড়লে সবকিছু সহনীয় হয়ে যেত। কিন্তু আগে ডলারের দাম ধরে রেখে এখন সামান্য ধাক্কা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। ডলারের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। এতে অর্থনীতির সব সূচকে ডলার ও টাকার হিসাব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ব্যবধান খুব বেশি বেড়ে যাচ্ছে। এখন দেশ কতটুকু এগোলো বা পেছাল তা আন্তর্জাতিকভাবে ডলারের হিসাব দিয়ে বোঝাতে হবে। টাকার হিসাবে হবে না। ডলারে হিসাব করলে দেখা যাবে অনেক খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সমস্যা মোকাবিলা করতে হলে ডলারের বিপরীতে টাকার মানকে স্থিতিশীল করতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ গত মার্চ পর্যন্ত ডলার ও টাকার হিসাবে একই ধারায় এগোচ্ছিল। গত মার্চে টাকার হিসাবে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ডলারের হিসাবে ১০ দশমিক ১ শতাংশ। এরপর থেকে ডলারের দাম বেড়ে গেলে প্রবৃদ্ধির ব্যবধানও বেড়ে যায়। গত জুনে ডলারের হিসাবে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং টাকার হিসাবে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় পৌনে ২ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে ডলারের হিসাবে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং টাকার হিসাবে ১৪ শতাংশ। ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় তিন শতাংশ। অক্টোবরে ডলারের হিসাবে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং টাকার হিসাবে ১৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়।

বেসরকারি খাতের ঋণ টাকায় দেওয়া হলেও এর মধ্যে বড় একটি অংশ আমদানি খাতে ব্যয় হয়। এ খাতে ঋণের টাকা ডলারে রূপান্তর করে আমদানি করা হয়। ফলে ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে এ খাতেও ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে।

ডলারের দাম বাড়ায় সরকারের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু ব্যয় বাড়ার তুলনায় আয় বাড়েনি। ফলে সরকারের ঋণ বাড়ছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই ঋণ নিয়েছে ৪৯ কোটি টাকা। যার প্রায় পুরোটাই ছাপানো টাকা। টাকার মান কমায় বেতন ভাতাসহ অন্যান্য যেসব খরচ টাকায় মেটানো হয়, ওইসব খাতে ডলারের হিসাবে বেতন যেমন কমেছে, তেমনি অন্যান্য খরচও কমেছে।

সর্বশেষ