বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ১ লাখ ১১ হাজার ১০০, আসামি ৩৯ লাখ ৮০ হাজার, সচল হচ্ছে পুরনো মামলা

দুদকের মামলা তারেক-জোবায়দার সম্পদ ক্রোকের আদেশ

 

সাজা আতঙ্কে শীর্ষ নেতারা বিএনপিতে আবারও মামলা ও সাজা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। নতুন করে মামলা দায়েরের পাশাপাশি পুরনো মামলাগুলোর কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ঢাকাসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কয়েক শ মামলা এখন রায় ঘোষণার অপেক্ষায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় নেতাদেরসহ সারা দেশে দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের নামে কারণে-অকারণে নতুন করে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে গায়েবি মামলা। সারা দেশে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি। এতে আসামি করা হয়েছে ৫০ লাখের কাছাকাছি নেতা-কর্মীকে। দলের একাধিক নির্ভরযোগ্য নেতা ও দফতর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু এ পরিসংখ্যানের কথা জানিয়ে বলেন, বিএনপির আন্দোলন, বিশেষ করে যুগপৎ কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকে সরকার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আন্দোলন দমনে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পাইকারি হারে মামলা দেওয়া শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এসব নতুন-পুরনো মামলায় আসামির সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।ইতোমধ্যেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমানের সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। দলের নীতিনির্ধারক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন  আদালতের এই ক্রোকের আদেশকে ‘ফরমায়েশি’ বলে মন্তব্য করেছেন। এ বিষয়ে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার চলমান গণআন্দোলনে ভীত হয়ে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গণহারে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এসব করে কোনো লাভ হবে না। মিথ্যা মামলা দিয়ে, গ্রেফতার করে, আদেশ বা রায় দিয়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ভোটাধিকার ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় চলমান আন্দোলনকে বিভ্রান্ত বা নস্যাৎ করতে পারবে না। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো বাকি এক বছর। কিন্তু তার আগেই সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠাসহ ১০ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, এবারের আন্দোলন হবে ভিন্ন। অবস্থা বুঝে পদক্ষেপ নেবেন তারা। এরই মধ্যে দাবি আদায়ে সমমনা রাজনৈতিক দল ও জোটকে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেছে দলটি। এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই মামলা-হামলা ও গ্রেফতারের পরিমাণ বেড়ে গেছে। জানা যায়, গত কয়েক মাসে দেশের ৪০টি জেলা-উপজেলায় দায়ের করা দুই শতাধিক মামলায় জ্ঞাত ও অজ্ঞাত আসামির সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ২ লাখেরও বেশি। বেশির ভাগ মামলাই হয়েছে ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ, মন্দির ও মূর্তি ভাঙচুর, নাশকতা, সরকারি কাজে বাধাদান, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকান্ডের অভিযোগে। এসব মামলার কার্যক্রম সম্প্রতি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যে কোনো ইস্যুতেই বিএনপি নেতা-কর্মীদের নামে সরকার মামলা করছে, হামলা চালাচ্ছে। সভা-সমাবেশ বানচাল করার চেষ্টা করছে। এটাই প্রমাণ করছে সরকারের অবস্থান গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে। বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য তথা নির্মূল করতেই সরকারের এ উদ্যোগ। এসব মূলত সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা এবং স্বৈরতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু এ প্রসঙ্গে বলেন, পুলিশকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের চাপে রাখতে নতুন নতুন গায়েবি মামলা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কারারুদ্ধ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৩৭টি। এর মধ্যে দুটি মামলায় তাঁর সাজা হয়েছে। উচ্চ আদালতে ১৬টি মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে মূলত মামলা হয়েছে দুর্নীতি, মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহসহ হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার অভিযোগে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে মামলা হয়েছে ৬৭টি। তিনি বর্তমানে লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। বিএনপি মহাসচিব কারাবন্দি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৯১টি। এর মধ্যে ৩৫টি মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে উচ্চ আদালত। বাকিগুলো চলমান রয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ১৮টি। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে চারটি, অসুস্থ ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার বিরুদ্ধে ছয়টি, কারাবন্দি মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৫৯টি, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ৬৯টি, নজরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে পাঁচটি, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৭টি, বেগম সেলিমা রহমানের বিরুদ্ধে ৬টি, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বিরুদ্ধে ১৯টি, ভারতের শিলংয়ে অবস্থানরত সালাউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব কারাবন্দি রুহুল কবির রিজভী আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১৪১টি। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে দলটির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের বিরুদ্ধে ২৫৭টি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলুর বিরুদ্ধে ৪৭টি, শওকত মাহমুদের বিরুদ্ধে ৬০টি, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে নয়টি, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের বিরুদ্ধে ছয়টি, আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে আটটি, আবদুল্লাহ আল নোমানের বিরুদ্ধে পাঁচটি, আবদুল আউয়াল মিন্টুর নামে নয়টি এবং মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে ২৯টি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে ২৪টি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানের বিরুদ্ধে ১৩৪টি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক কারাবন্দি আবদুস সালামের বিরুদ্ধে ৩৭টি, মিজানুর রহমান মিনুর বিরুদ্ধে ৩৭টি, জয়নাল আবদিন ফারুকের বিরুদ্ধে ২৮টি, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের বিরুদ্ধে ১৬টি, মজিবর রহমান সরোয়ারের বিরুদ্ধে ৫৭টি, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের বিরুদ্ধে ১৩৯টি ও কারাবন্দি খায়রুল কবির খোকনের বিরুদ্ধে ৬১টি মামলা রয়েছে। সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর বিরুদ্ধে ১১১টি, আসাদুল হাবিব দুলুর বিরুদ্ধে ৫৭টি, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফের বিরুদ্ধে ৪৭টি, যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নিরবের বিরুদ্ধে ৯৬টি, বর্তমান সভাপতি কারাবন্দি সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর বিরুদ্ধে ১৬৩টি, স্বেচ্ছাসেবক দলের আবদুল কাদির ভুঁইয়া জুয়েলের বিরুদ্ধে ৫৬টি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব সাবেক ফুটবলার আমিনুল হকের বিরুদ্ধে ২৩টি মামলা রয়েছে।

সর্বশেষ