বিএনপির দশ দফা জনমত গড়তে তৃণমূলে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতারা

যুগপৎ আন্দোলনের দ্বিতীয় কর্মসূচি হিসেবে আগামী বুধবার দেশের ১০টি সাংগঠনিক বিভাগে গণঅবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এতে ব্যাপক লোকসমাগমের লক্ষ্যে বিএনপিসহ সমমনা দল ও জোটের নেতারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে টিম গঠন করেছে বিএনপি। কোন নেতা কোন বিভাগে থাকবেন; তাদের তালিকা প্রকাশ করেছে দলটি। অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্ত করা, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনসহ ১০ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করছে বিরোধী দলগুলো। যুগপৎ আন্দোলনের প্রথম কর্মসূচি হিসেবে গত ৩০ ডিসেম্বর ঢাকা ও রংপুর বিভাগে এবং ২৪ ডিসেম্বর সারা দেশে শান্তিপূর্ণ প্রথম গণমিছিল করেছে বিএনপি। সারা দেশে অব্যাহত হামলা-মামলা ও গ্রেপ্তার উপেক্ষা করে এসব কর্মসূচির পর উজ্জীবিত বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নেতাকর্মীরা।

চাল, ডাল, তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ, নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি ও কর্মসূচিতে গুলি চালিয়ে হত্যার প্রতিবাদে গত ১২ অক্টোবর থেকে ১০ সাংগঠনিক বিভাগে গণসমাবেশ করে বিএনপি। সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে ১০ দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। দ্বিতীয় ধাপের কর্মসূচি হিসেবে ১১ জানুয়ারি ১০টি বিভাগীয় শহরে চার ঘণ্টার গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি। তবে এই মাঝের সময়টা কাজে লাগাতে জেলা পর্যায়ে সফর করছেন দলের সিনিয়র নেতারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল কালবেলাকে বলেন, ক্ষমতাসীন অবৈধ সরকারের পদত্যাগের দাবিসহ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে জনগণের পক্ষে ১০ দফা ঘোষণা করেছি। যুগপৎ আন্দোলনের প্রথম কর্মসূচি গণমিছিলে অনেক সমমনা দল ও জোট সমর্থন জানিয়ে পৃথক কর্মসূচি পালন করেছে। কেননা, ক্ষমতাসীন সরকারের সীমাহীন ব্যর্থতা, লুটপাট, নির্যাতনসহ বহুবিধ অন্যায় দেশের মানুষ কখনো ভালোভাবে নেয়নি। এখন তারা জেগে উঠেছে। তিনি বলেন, আমাদের গণঅবস্থান কর্মসূচিও হবে শান্তিপূর্ণ। লিয়াজোঁ কমিটির নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বিভাগের দলনেতা মোহাম্মদ শাহজাহান কালবেলাকে বলেন, গণঅবস্থান সফল করতে বিভাগের নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রস্তুতি সভা করেছি। আশা করছি, গণঅবস্থান কর্মসূচি সর্বাত্মকভাবে সফল করতে পারব। সাধারণ মানুষও আন্দোলনে সম্পৃক্ত হবেন। কিন্তু এই সরকারের আমলে তো কোনো কিছুর নিশ্চয়তা মেলে না। তবুও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। লালদীঘির ময়দান বা কাজীর দেউড়ির সামনে চট্টগ্রামের গণঅবস্থান কর্মসূচির জন্য স্থান চাওয়া হয়েছে।

বিএনপি নেতাদের দাবি, ১০ দফা আদায়ে ২৪ ও ৩০ ডিসেম্বর গণমিছিল কর্মসূচিতে রাজপথে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে বিএনপি ও সমমনা দল এবং জোটগুলো। ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি ছাড়াও সাত দলীয় গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, ১১ দলীয় জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট এবং এলডিপি ও জামায়াতে ইসলামী গণমিছিল করেছে। রাজধানীর সাত স্পটে পৃথকভাবে এ কর্মসূচি পালিত হয়। বিএনপির গণমিছিল নিয়ে শুধু দলের নেতাকর্মী নয়, অন্যান্য দলের কর্মীরাও উচ্ছ্বসিত। স্মরণকালে এত বড় মিছিল তারা নিজেরাও দেখেননি বলে জানান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, স্মরণকালে সবচেয়ে বড় ও শান্তিপূর্ণ গণমিছিল হয়েছে। এটা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

বিএনপির কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহসম্পাদক প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল কালবেলাকে বলেন, আমাদের তো হারানোর কিছু নেই। কর্মসূচিতে থাকি বা না থাকি মামলা থেকে রেহাই নেই। তবুও যে কোনো উপায়ে আন্দোলনে সফল হতে হবে।

নেত্রকোনা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী বলেন, মিছিল করলেও মামলা হবে, ঘরে বসে থাকলেও মামলা হবে। সুতরাং মামলা ও জেল এটা আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি। জেলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।

মৎস্যজীবী দলের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব মো. আব্দুর রহিম বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অন্তরীণ, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের বাইরে, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতারা কারাবন্দি। এরপরও কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়ছে। নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে তারা পিছপা হচ্ছে না।

১১ জানুয়ারি গণঅবস্থান কর্মসূচি : ১১ জানুয়ারি ১০ সাংগঠনিক বিভাগে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা গণঅবস্থান করবে বিএনপি। ওই দিন নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর বিএনপির উদ্যোগে কর্মসূচি পালিত হবে। একই সময়ে পুরানা পল্টন মোড়ে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালনের কথা জানান ১২ দলের জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের সমন্বয়ক ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। অন্য ১২ দলীয় জোটের উদ্যোগে বিজয়নগর পানির ট্যাঙ্কের সামনে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত গণঅবস্থান কর্মসূচি হবে বলে জানিয়েছেন জোটের নেতা ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। এ ছাড়া ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলায় বন্দি খালেদা জিয়া, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, প্রীতম দাসসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে আগামী ১১ জানুয়ারি ১০ বিভাগে প্রতিবাদী গণঅবস্থান করবে গণতন্ত্র মঞ্চ। ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ১১ জানুয়ারি সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত গণঅবস্থান কর্মসূচি হবে জানিয়েছেন ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু। তিনি বলেন, এ নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি আছে। মঙ্গলবার সভায় আরও বিস্তারিত সিদ্ধান্ত হবে।

অংশ নেবে গণফোরামও : এবার বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনে শরিক থাকবে গণফোরাম। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও লিয়াজোঁ কমিটির নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আশা করছি জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে এই সরকারের পতন করে দেশের মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেব। এই সরকারের উচ্ছিষ্টভোগী দলগুলো ছাড়া সব দল এই সরকারের পরিবর্তন চায়। সে ব্যাপারে আমরা ঐকমত্য হয়েছি। গণঅবস্থান কর্মসূচি গণফোরাম পৃথকভাবে পালন করবে। গণফোরাম সভাপতি মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, আমরা চলমান আন্দোলনের শরিক হয়েছি। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সমগ্র জাতিকে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছি।

১০ বিভাগে থাকবেন বিএনপির যেসব নেতা : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স জানান, বুধবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিভাগীয় গণঅবস্থান কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে কর্মসূচি পালনে সমন্বয় করবেন সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। সদস্য হিসেবে থাকবেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের অধিবাসী জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতারা, সাবেক এমপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি/আহ্বায়ক, সাধারণ সম্পাদক/সদস্য সচিব, জেলা/মহানগর বিএনপির সভাপতি/আহ্বায়ক, সাধারণ সম্পাদক/সদস্য সচিব/প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক।

কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে কুমিল্লা বিভাগের দলনেতা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, চট্টগ্রাম বিভাগের দলনেতা মো. শাহজাহান, ময়মনসিংহ বিভাগের দলনেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু, ঢাকা বিভাগের দলনেতা ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, খুলনা বিভাগের দলনেতা শামসুজ্জামান দুদু, রাজশাহী বিভাগের দলনেতা বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু, ফরিদপুর বিভাগের দলনেতা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মজিবুর রহমান সরোয়ার, সিলেট বিভাগের দলনেতা যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বরিশাল বিভাগের দলনেতা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল এবং রংপুর বিভাগের দলনেতা দলের যুগ্ম মহাসচিব হারুন-অর-রশিদ।

 

সর্বশেষ