রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্য দিয়ে শুরু হলো নতুন বছর। নির্বাচনের এক বছর বাকি থাকতেই শুরু হয়ে গেছে রাজপথ দখলের মহড়া। ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে নির্বাচনী বছর হিসেবে নতুন বছরে রাজপথ বেশ উত্তপ্ত থাকবে বলেই মনে করেন সবাই। যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে চূড়ান্ত আন্দোলনের মাধ্যমে মরিয়া থাকবে বিএনপিসহ সমমনা জোট ও দলগুলো। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এরই মধ্যে শুরু হওয়া রাজপথ দখলের লড়াইয়ের ‘চূড়ান্ত ফয়সালা’ হবে এ বছরটিতে। অন্যদিকে, সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্পন্ন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নতুন বছরে দল গুছিয়ে বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবিলা করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করবে দলটি। এখনও দু’পক্ষের যে অনড় অবস্থান, তা বহাল থাকলে রাজপথে রক্তারক্তি অনিবার্য বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। তাঁদের মতে, দেশ, গণতন্ত্র ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে সংলাপের মাধ্যমে সৃষ্ট সংকটের সমাধান করা উচিত। তবে দেশের অতীত ইতিহাসের আলোকে বলা যায়, সংলাপের সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সমকালকে বলেন, সংঘাত-সহিংসতাময় বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রধানতম উপায় হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর একে অপরের প্রতি গণতান্ত্রিক আচার-আচরণ দেখানো এবং পরমতসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করা। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধের প্রতিও প্রত্যেককে শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দায়িত্বই অনেক বেশি। তাদেরই সবার আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের মাধ্যমে জাতিকে একটি অবাধ ও সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন উপহার দিতে হবে।

রাজপথেই ফয়সালার আশা বিএনপির: আগামী নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বিরোধী দলটি। রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনের পাশাপাশি নিজেদের দাবির পক্ষে জনমত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে আরও জোর তৎপরতা চালাবে বিএনপি। ২০২২ সালটিতে তারা সরকারবিরোধী দলগুলো নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এরই মধ্যে ওই পরিকল্পনা সফল হয়েছে বলে মনে করে দলটি।

বিএনপি নেতাদের দাবি, তাঁরা সরকারবিরোধী ৩২টি রাজনৈতিক দলকে যুগপৎ আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছেন। এমনকি বছর শেষ হওয়ার এক দিন আগেই রাজধানীতে যুগপৎ গণমিছিলের মাধ্যমে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সূচনা করেছেন। নতুন বছরে সরকারবিরোধী আরও দলকে যুগপৎ আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে দলটির। একই সঙ্গে ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পদে টানা দুই মেয়াদের বেশি নয়সহ রাষ্ট্র মেরামতের ২৭ দফা রূপরেখার বিষয়ে জনমত তৈরিতে কর্মসূচি গ্রহণ করবে বিএনপি। তৃণমূল থেকে দলকে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগও চালিয়ে যাবে বিএনপি। পাশাপাশি তৃণমূলের উজ্জীবিত নেতাকর্মীর মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করবেন হাইকমান্ড।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, দেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবিতে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী ৩৩ রাজনৈতিক দল যুগপৎ আন্দোলন শুরু করেছে। নতুন বছরে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটিয়ে নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য করবেন। তাঁরা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পন্থায় দাবি আদায়ে আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাবেন। তাঁরা আশা করেন, সরকার জনগণের ভাষা বুঝে মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেবেন। অন্যথায় দেশপ্রেমিক জনগণই তাদের মৌলিক ভোটাধিকার আদায়ে যা যা করা প্রয়োজন, তা করবেন।

দলের নীতিনির্ধারক নেতারা জানান, বিএনপি জনগণের মনের জগতে প্রবেশ করতে পেরেছে। তাঁরা ডাক দিলেই রাজপথের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছেন। তাঁরা নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করবেন। তাঁদের সঙ্গে দেশের জনগণ আছে, আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ ও দাতা সংস্থার সমর্থন রয়েছে। তার পরও যদি সরকার জনগণের দাবি না মানে, তাহলে বিএনপির তো আর কিছু করার নেই। অন্যদিকে, সরকার শুধু রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের শক্তি ব্যবহার করেই গত দু’বার ক্ষমতায় এসেছে। তবে আগামীতে আর সে ক্ষমতা দিয়ে ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয় বলে বুঝে গেছে। সেজন্য সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে চায় তারা। কিন্তু নিজেরা ক্ষমতায় থেকে করতে চায়- এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

দলীয় সূত্র জানায়, নানা বাধাবিঘ্ন ও পাল্টা কর্মসূচি দিক আওয়ামী লীগ- তার পরও তারা শান্তিপূর্ণ ও সফলভাবে বিভাগীয় গণসমাবেশ-গণমিছিল করেছে। আগামী ১১ জানুয়ারি বিভাগীয় শহরে গণঅবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে- তাও সফল হবে। পর্যায়ক্রমে আন্দোলনের কর্মসূচি কঠোর দেওয়া হবে। দলটির আর পেছনে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের জন্য যা যা করার, সবই তাঁরা করবেন। শেষ পর্যন্ত যদি সরকার দাবি না মানে, তাহলে পরিস্থিতি বলে দেবে বিএনপিকে কী করতে হবে। তবে বিগত দুই নির্বাচনের মতো আওয়ামী লীগকে বিনা চ্যালেঞ্জে প্রশাসনের সহযোগিতায় ভোট তুলে নেওয়ার সুযোগ দেবে না। বিএনপির হাজারো নেতাকর্মী কারাবন্দি রয়েছেন, অনেকে মারা গেছেন। আরও হাজার হাজার নেতাকর্মী জীবন দিতে প্রস্তুত। তবুও তাঁরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে ছাড়বেন।

আন্দোলন মোকাবিলার প্রস্তুতি আওয়ামী লীগের: বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবিলার প্রস্তুতি অনেক আগেই শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। বিদায়ী বছরে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে সক্রিয় ছিল ক্ষমতাসীন দলটি। নতুন বছরে এমন তৎপরতা আরও বাড়বে। বিরোধী দলকে রাজপথে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতা-নৈরাজ্য সৃষ্টির কোনো সুযোগ দেবে না তারা।

পাশাপাশি ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে দলকে শক্তিশালী করার নানা উদ্যোগ নেবে ক্ষমতাসীন দলটি। করোনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলোর আন্দোলনে সৃষ্ট সংঘাত-সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই এমন নানামুখী সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে ব্যস্ত ছিল দলটি। নির্বাচনের বছর তথা নতুন বছরে এই প্রস্তুতিকে সর্বাত্মক রূপ দিয়ে দলকে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আনার সর্বমুখী উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারক নেতারা।

তবে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতেও সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে বলেছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে তাঁরা বলেছেন, সরকারি ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে দেশের রাজনীতিতে বর্তমানে যে সহিংসময় পরিস্থিতি চলছে, তা নিরসনে ক্ষমতাসীন দলকে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে হলেও সমঝোতার পথে হাঁটতে হবে। আগামী বছরের জানুয়ারির প্রথম ভাগে যে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন হবে, তাতে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশ্বাসযোগ্য অর্জন করতে হবে। সর্বোপরি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে আওয়ামী লীগকেই।

এর আগে বছরের শেষভাগে গত ২৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রমে তৃণমূলে সম্মেলনের মাধ্যমে প্রায় সর্বত্র নতুন ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে আওয়ামী লীগ। নতুন বছরে বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবিলার নানা কৌশলের পাশাপাশি সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করবে।

দলের নেতারা বলছেন, সর্বশেষ দলের নবনির্বাচিত সভাপতিমণ্ডলীর বৈঠকেও বিরোধী দলের নাশকতা ও নৈরাজ্য মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে যে কোনো ধরনের সংঘাত-সহিংসতা মোকাবিলায় মাঠে তৎপর থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, দেশে বিরোধী দলের কোনো রকম নাশকতা ও নৈরাজ্য বরদাশত করা হবে না। আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থেকে রাজপথে থাকবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি তারাও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকবে।