রংপুরে কেন এমন হলো

রংপুর সিটির প্রথম নির্বাচন হয় ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর। ওই নির্বাচনে প্রয়াত সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর কাছে ২৮ হাজার ৫৫৪ ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। আবার ২০১৭ সালের ২১ ডিসেম্বর সিটির দ্বিতীয় নির্বাচনে ৯৮ হাজার ৮৯ ভোটের ব্যবধানে নৌকার প্রার্থী সেই ঝন্টুকে পরাজিত করে নগরপিতার চেয়ারে বসেন মোস্তফা। এবারেও তিনি সেই জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন; কমেছে ভোটের অঙ্ক। কিন্তু দ্বিতীয় নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ৬২ হাজার ৪০০ ভোট পড়লেও এবারের নৌকার প্রার্থী ভোট পেয়েছে মাত্র ২২ হাজার ৩০৬ ভোট।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, নৌকার ৪০ হাজার ভোট গেল কই? কেন নৌকার এই বিপর্যয়? দ্বিতীয় নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীক ২৪ হাজার ৬ ভোট পেলেও এবারে তারা পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৮৯২ ভোট। রংপুর নির্বাচনে হাতপাখা প্রতীকের উত্থানও অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। রংপুরের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চার কারণে এবারে নৌকার বিপর্যয় হয়েছেন। (এক) নৌকার প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল হয়েছে। (দুই) আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সাংগঠনিক দুর্বলতা, নৌকার মনোনয়নপ্রত্যাশীরা নির্বাচনী মাঠে নৌকা প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করা। (তিন) আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় নৌকার বিপর্যয় হয়েছে। (চার) রংপুরে লাঙ্গলের জনপ্রিয়তা ও বিএনপি-জামায়াতের সমর্থনও নৌকা হারার পেছনে মূল কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে রংপুর সিটিতে ২০১৭ সালের তুলনায় এবারে ৩২ হাজারের বেশি ভোটার বাড়ালেও ভোটার উপস্থিতির হার কমেছে। বিগত ব্যালটের নির্বাচনে ৭৪.৩০ শতাংশ ভোট কাস্ট হলেও এবারে ইভিএমে ভোট কাস্ট হয়েছে ৬৫.৮৮ শতাংশ। ব্যালটের চেয়ে ইভিএমের ভোট কেন কম সে বিষয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। অনেকেই বলছেন, ব্যালটে একজনের ভোট আরেকজনে দেওয়ার সুযোগ নেই তাই ভোটের হার কমেছে। আবার কেউ বলছেন, এবারের নির্বাচনে ইভিএমে ভোটে বিড়ম্বনার কারণে অনেকেই ভোট না দিয়েই চলে গেছেন।

নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ নির্বাচনে জাপা প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ভোট পেয়েছেন ৫২.৪৩ শতাংশ, আওয়ামী লীগ প্রার্থী হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া পেয়েছেন ৭.৯৬ শতাংশ, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী লতিফুর রহমান হাতি প্রতীকে পেয়েছেন ১২.১০ শতাংশ ভোট। আর আওয়ামী লীগেই দুই প্রার্থী মিলে মোট ভোট পেয়েছেন ২০.০৬ শতাংশ ভোট। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আমিরুজ্জামান হাতপাখা প্রতীকে ১৭.৮২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।
কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২২ ভোট কেন্দ্রে ৫০টিরও কম ভোট পেয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থী হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া। তিনি নৌকা প্রতীকে প্রায় ১৫০ কেন্দ্রে ১০০টির কম করে ভোট পেয়েছেন। এ নির্বাচনে ডালিয়ার সর্বনিম্ন ১৩টি ভোটও পেয়েছেন। সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন ২৫৪টি। হিসাবে দেখা গেছে, প্রায় ৬২ শতাংশ ভোট কেন্দ্রে নৌকা প্রার্থীর ভোট এক শর ঘরে পৌঁছেনি। প্রদত্ত ভোটের ৮ ভাগের ১ ভাগের কম পাওয়ায় তার জামানত বাজেয়াপ্ত হতে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিজয়ী মেয়র জাতীয় পার্টির মো. মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা এ নির্বাচনে সর্বনিম্ন ১২০ ভোট পেয়েছেন এক কেন্দ্রে। সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন ১২০৬টি। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ২২৯টি কেন্দ্রের ফলাফল বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

 

গত ২৭ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২২৯টি ভোট কেন্দ্রের ফলাফল বিশ্লেষণে এমন চিত্র মিলেছে।

সিটির দ্বিতীয় নির্বাচনের ফলাফলের চিত্র : রংপুর সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচনে মোট ১৯৩টি কেন্দ্রের ফলাফলে লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা পেয়েছিলেন ১ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৯, নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু পেয়েছিলেন ৬২ হাজার ৪০০, ধানের শীষে বিএনপির কাওসার জামান বাবলা পান ৩৫ হাজার ১৩৬, হাতি প্রতীকে জাপার বিদ্রোহী আসিফ শাহরিয়ার ২ হাজার ৩১৯, হাতপাখা মার্কায় ইসলামী আন্দোলনের গোলাম মোস্তফা বাবু পান ২৪ হাজার ৬ ভোট, মই মার্কায় বাসদের আবদুল কুদ্দুছ ১ হাজার ২৬০ এবং আম মার্কায় এনপিপির সেলিম আক্তার পেয়েছিলেন ৮১১ ভোট। ওই নির্বাচনে ৯৮ হাজার ৮৯ ভোটের ব্যবধানে নৌকা সমর্থক ঝন্টুকে হারিয়ে মেয়র হয়েছিলেন মোস্তফা। ওই নির্বাচনে মোট ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ ভোটারের মধ্যে ২ লাখ ৯২ হাজার ৭২৩ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন; যা শতকরা হিসেবে ৭৪.৩০ শতাংশ ছিল।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

সর্বশেষ