বিএনপিতে ফের মামলা আতঙ্ক

 

আব্বাস দম্পতির বিরুদ্ধে চার্জশিট

 সারা দেশে বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে গ্রেফতার ও মামলা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সরকারবিরোধী সাম্প্রতিক আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশ বিভিন্ন তৎপরতা শুরু করেছে বলে দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। বিরোধী নেতা-কর্মীরা কখন কোন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসন্ধান করে পুলিশ তাড়া করছে বলে জানা গেছে। গ্রেফতার এড়াতে কেন্দ্রীয় এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বেশির ভাগ শীর্ষ নেতা রয়েছেন আত্মগোপনে। এদিকে প্রায় ২১ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস ও তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের বিরুদ্ধে গতকাল মামলার চার্জশিট দিয়েছে দুদক। এর আগের দিন প্লট জালিয়াতি ও নকশা বহির্ভূতভাবে হোটেল সারিনা নির্মাণের অভিযোগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও তার স্ত্রীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এ ছাড়াও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতাদের গ্রেফতারের পর কেউ স্বস্তিতে নেই। বিএনপির অভিযোগ, বিগত আন্দোলনের সময়ে দায়ের করা প্রায় লক্ষাধিক মামলায় দলটির অন্তত ৩৬ লাখ নেতা-কর্মী আসামি হয়েছে। মামলা এড়াতে অনেকে ফেসবুক থেকে সরিয়ে নিচ্ছে আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ছবি। বিএনপির অভিযোগ, সংসদ নির্বাচনের আগে তাদের আন্দোলন দমন করতে সরকার পরিকল্পিতভাবে এসব মিথ্যা মামলা সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে। জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি নিজেও শতাধিক মামলার আসামি। বিএনপির গণসমাবেশ ও পরবর্তী কর্মসূচি দেখে সরকারের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলেন, বিএনপির যেসব নেতা সক্রিয় তাদের তালিকা করে মামলা দেওয়া হচ্ছে কিংবা আটক করে পুরাতন মামলায় তাদের জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আগামী দিনে বিএনপির আন্দোলন দমানোর জন্যই সরকার এই কৌশল নিয়েছে। হামলা-মামলা করে বিএনপির আন্দোলন দমানো যাবে না।

বিএনপির দায়িত্বশীলরা বলছেন, ৩০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো রাজধানীতে যুগপৎ আন্দোলনে নামছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। যুগপৎ আন্দোলন সামনে রেখে নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার আরও বাড়ার আশঙ্কায় নীতিনির্ধারকরা। ৮ ডিসেম্বরের পর থেকে এখন পর্যন্ত রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে দেড় হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিএনপির অভিযোগ, সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় মধ্যম সারির নেতা ও কর্মীদের সংগঠিত করতে পারেন এমন নেতাদের বেছে বেছে গ্রেফতারের টার্গেট করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে সারা দেশে গণগ্রেফতার চালানো হয়। ঢাকার সমাবেশের পর নেতা-কর্মীদের আটক কিছুটা কমেছিল; কিন্তু কমেনি আতঙ্ক। গণমিছিলকে কেন্দ্র করে সেটা ফের বাড়ছে।এদিকে দলের মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতাদের গ্রেফতারের পর সবার মধ্যেই এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। যে কাউকে আটক করা হতে পারে-এমন শঙ্কা থেকে সবাই সতর্ক চলাফেরা করছেন। নয়াপল্টনে পুলিশি-বিএনপি সংঘর্ষের চার দিন পর ১১ ডিসেম্বর খোলা হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। কিন্তু কার্যালয় খোলার পর আগের মতো নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয়, মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতাই গ্রেফতার আতঙ্কে কার্যালয়ে আসছেন না। দলীয় কর্মসূচি থাকলেও অনেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তাতে অংশ নিয়ে দ্রুতই সেখান থেকে সরে পড়ছেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি সদস্য সচিব আমিনুল হক বলেন, মিথ্যা মামলায় দলের নেতা-কর্মীকে আটক নতুন কিছু না। ১০ দফা দাবি আদায়ে ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর গণমিছিলে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিয়ে কর্মসূচি সফল করব।

জানা যায়, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলমকে সোমবার রাত ১১টায় নিউমার্কেট থানা পুলিশ বাসা থেকে আটক করে। এ ছাড়াও সম্প্রতি ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন ১৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মো. হান্নান ভুইয়া, উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ৫০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. শাহজালাল ও তার ছেলে ছাত্রদল নেতা শেখ রাসেলকে আটক করে পুলিশ। শাহআলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি জয়নাল মহসিন, যুগ্ম সম্পাদক আতাউর, ডা. ফয়েজ, কোষাধ্যক্ষ সাইফুল মালিক, ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক আবদুল আজিজ, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মাবেল ভুইয়া ও সদস্য মো. ইসলাম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বংশাল থানাধীন ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রহমানকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করে। শুধু রাজধানী নয় একইভাবে সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের আটক করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরনো মামলাগুলোয় আসামির তালিকায় থাকা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মির্জা আব্বাস, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সাবেক উপমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি আমান উল্লাহ আমান এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক।

সামগ্রিক প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বর্তমান সরকার বিএনপির ৬ শতাধিক নেতা-কর্মীকে গুম করেছে। সহস্রাধিক নেতা-কর্মীকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে। আমাদের কণ্ঠরোধ করার জন্য এক লাখের ওপরে মামলা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩৬ লাখ নেতা-কর্মীকে এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে।

আব্বাস দম্পতির বিরুদ্ধে চার্জশিট : প্রায় ২১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এবং তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের নামে চার্জশিট অনুমোদনের পর তা আদালতে দাখিল করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তকারী কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মোহা. নুরুল হুদা গতকাল আদালতে ওই চার্জশিট দাখিল করেন।

গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদক প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সংস্থার সচিব মাহবুব হোসেন। এখানে রাজনৈতিক যোগসূত্র আছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখানে পলিটিক্যাল কোনো যোগসূত্র নেই। দুদক তার নিজস্ব আইন-বিধি মেনে তদন্তকাজ পরিচালনা করে থাকে।

তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, আফরোজা আব্বাসের নামে ২০ কোটি ৭৪ লাখ ৪৭ হাজার ৮২৮ টাকার সম্পদ প্রকৃত পক্ষে তার স্বামী মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের সহায়তায় অর্জন করেছেন। কেননা আফরোজা আব্বাস একজন গৃহিণী, সে হিসেবে ওই সম্পদ অবৈধ উৎসের আয় থেকে অর্জিত বলে প্রমাণ মিলেছে। মির্জা আব্বাস ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ছিলেন। তিনি সংসদ সদস্য, মেয়র ও মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে ২০০৭ সালের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত আফরোজা আব্বাসের নামে ওই টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। দুদক আফরোজা আব্বাসকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি বলেছেন, ব্যবসায়ী এমএনএইচ বুলুর কাছ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ ও বাবা-মা এবং বোনের কাছ থেকে ১ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দান হিসেবে নিয়েছেন। তবে ওই টাকাসহ মোট সম্পদের হিসাবের স্বপক্ষে কোনো রেকর্ড দেখাতে পারেননি। অন্যদিকে আফরোজা আব্বাস একজন গৃহিণী। কিন্তু তার স্বামী মির্জা আব্বাস বিভিন্ন খাতের টাকা স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করেছেন। আফরোজা আব্বাস নিজেকে একজন হস্তশিল্প ব্যবসায়ী হিসেবে আয়কর নথিতে উল্লেখ করলেও তার নিজের আয়ের কোনো বৈধ উৎস নেই।

দুদকের তদন্তে অবৈধ ওই সম্পদ হস্তান্তর, রূপান্তর ও অবস্থান গোপনকরণে কৌশল অবলম্বন করার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তা আফরোজা আব্বাস ও তার স্বামী মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দিয়েছেন। এর আগে ২০১৯ সালের ৭ জুলাই রাজধানীর শাহজাহানপুর (ডিএমপি) থানায় দুদকের সাবেক সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মো. সালাহউদ্দিন মামলাটি করেন।

সর্বশেষ