খাকদোন নদের ১৯ কিলোমিটারে ২১ অপরিকল্পিত সেতু

বিষখালী ও পায়রা—এই দুই নদীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে বরগুনার খাকদোন নদ। ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদটি চার দশক আগে প্রায় দেড় কিলোমিটার প্রশস্ত ছিল। নানা কারণে এখন সেটি যেন খালে পরিণত হয়েছে। সেই নদের আবার ১৯ কিলোমিটারে নির্মাণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে ২১টি অপরিকল্পিত সেতু। সেতুগুলোর নকশা থেকে জানা যায়, কোথাও কোথাও নদ থেকে সেতুর উচ্চতা ১০ থেকে ৩০ ফুট। আবার একটি সেতু থেকে আরেকটির দূরত্ব কোথাও আধাকিলোমিটার থেকে এক কিলোমিটার।

এসব সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) অনাপত্তি নেওয়ার শর্ত রয়েছে। তবে তা নেয়নি সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

নদের দুই পাশের জমির পুরনো নকশা থেকে জানা যায়, একসময় খাকদোন নদটি প্রায় দেড় কিলোমিটার চওড়া ছিল। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, গত তিন থেকে চার দশকে নানাভাবে দুই তীর দখল হয়েছে। তা ছাড়া নদটির নাব্যতা বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে ২৫ কিলোমিটারের নদটির ১৫ কিলোমিটার মরা খালে পরিণত হয়েছে। বাকি ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ছয় কিলোমিটার বরাবর একটি নিচু সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে নাব্যতা থাকা ১০ কিলোমিটারের চার কিলোমিটার পথে নৌযান চলাচল করতে পারে না। সে হিসাবে কেবল ছয় কিলোমিটারে এখন নৌযান চলাচল করে। শুষ্ক মৌসুমে এই ছয় কিলোমিটারেও নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। অথচ এই নদেই বিআইডাব্লিউটিএর নৌবন্দর অবস্থিত।

বরগুনা সদরের কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের হলদিয়া গ্রামের বাসিন্দা আশরাফ আলী (৭০) বলেন, ‘বাবা-দাদার কাছে শুনেছি এই নদ দিয়ে একসময় স্টিমার, লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযান চলাচল করত। এখন এসবই স্মৃতি। খাকদোন শেষ পর্যন্ত মরেই যাবে। ’

কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব মৃধা বলেন, ‘এই নদ দিয়ে আমরা লঞ্চে পটুয়াখালী গিয়েছি। আশির দশকের শেষ দিকে এই নদে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ’

সম্প্রতি নদটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা গেছে, বিষখালী নদী থেকে শুরু হয়ে নদটির একাংশ বরগুনা শহরের পাশ দিয়ে পূর্ব দিকে কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের শিংড়াবুনিয়া, রোডপাড়া, ঘটবাড়িয়া বাজার পর্যন্ত এসেছে। এর পর উত্তর দিকে চান্দখালী বাজারের পাশ দিয়ে পূর্ব দিকে বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে পায়রা নদীর সঙ্গে মিলেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিষখালী-খাকদোন সংযোগস্থলে ৫৪২ ফুট, পলিটেকনিক কলেজের সামনে ৩৩৪ ফুট, সদর উপজেলার সামনে ৩০৩ ফুট, কাঠপট্টি এলাকায় ২৮১ ফুট, নদীবন্দর এলাকায় ৪২৯ ফুট, মাছ বাজার ব্রিজ এলাকায় ২৫০ ফুট, টাউনহল ব্রিজ এলাকায় ১২৭ ফুট, ভূতমারা এলাকায় ১১৮ ফুট এবং সুজার খোয়ঘাট এলাকায় ৮৫ ফুট চওড়া নদটি। এ ছাড়া শিংবাড়ি থেকে চান্দখালি পর্যন্ত ৪০-৫০ ফুট, পায়রা-খাকদোন সংযোগস্থলে ৩২২ ফুট, আয়লা বাজার ব্রিজ এলাকায় ১৬৯ ফুট এবং কাটাখালি নুরানি মসজিদ এলাকায় ৯১ ফুট চওড়া আছে নদটি।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সংকুচিত হয়ে আসা নদটিতে দুই দশকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ২১টি সেতু নির্মাণ করেছে এবং করছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা শহরের মাছ বাজারের এলাকা, টাউন হলের পাশে এবং ভূতমারা সুজার খেয়াঘাট এলাকায় দুই থেকে তিন দশক আগে তিনটি গার্ডার সেতু নির্মাণ করে এলজিইডি। এরপর ধূপতি, মনষাতলী-উত্তর শিংড়াবুনিয়া প্রভাষক আবদুস সালামের বাড়ির সামনে, রোডপাড়া-আমড়াঝুড়ি বাজার, গুদিঘাটা মাদরাসার সামনে, ঘটবাড়িয়া রোডপাড়া রাস্তার জাকিরতবক গ্রামের মামুন খানের বাড়ির সামনে পাঁচটি লোহার সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।

ঘটবাড়িয়া বাজারে সম্প্রতি এলজিইডির অর্থায়নে আরেকটি গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া ঘটবাড়িয়া বাজারের উত্তর পাশে, কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনে, হলদিবাড়িয়া-সাহেবের হাওলা এলাকা, কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের মৃধা বাড়ির সামনে, বাদামতলী-সাহেবের হাওলা মাদরাসার সামনে, পূর্বগুদিঘাটা নূরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে, সাহেবের হাওলা সানু হাওলাদার বাড়ির পাশে, আঙ্গারপাড়া-চান্দখালি বাজারের স্কুলের কাছে, আঙ্গারপাড়া এতিমখানার পাশে, আঙ্গারপাড়া হুজুরের বাড়ির সামনে এবং আয়লাবাজারে নদের ওপর আরো আটটি লোহার সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।

সর্বশেষ নির্মাণকাজ চলা সেতু প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা এলজিইডি ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে বরগুনা সদরের গৌরিচন্না ইউনিয়নের রোডপাড়া বাজার-সুজাউদ্দীন খেয়াঘাটে খাকদোন নদের ওপর ৭২ মিটারের একটি গার্ডার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এই সেতুর কাজ এখনো চলছে।

এ ছাড়া বছর দেড়েক আগে পূর্বদিকে কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের ঘটবাড়িয়া বাজারে খাকদোন নদের ওপর ৩৩ মিটারের আরেকটি গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হয়। এই সেতু দুটি ৩০ ফুটের  মতো উঁচু হওয়ায় নিচ থেকে কোনো বড় নৌযান চলাচল করতে পারবে না।

বিআইডাব্লিউটিএ সূত্র জানায়, বরগুনা নদীবন্দর সচল রাখতে প্রায় প্রতিবছর খাকদোন নদের ছয় কিলোমিটার খনন করা হয়। কিন্তু অব্যাহত দখলের কারণে এই অংশের নাব্যতা ধরে রাখা যাচ্ছে না। তা ছাড়া নদের সঙ্গে শাখা খালগুলোর প্রবেশদ্বারে স্লুইস গেট নির্মাণ করায় জোয়ারের প্রবাহ কমে গিয়ে এসব খালও ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের শিংড়াবুনিয়া গ্রামের মোখলেছুর রহমান (৬৫) বলেন, ‘খাকদোন নদে এখন নৌকা-ট্রলার কিছুই চলতে পারে না। ঘন ঘন ব্রিজ দিয়া নদটি মেরে ফেলেছে। ’

ট্রলারচালক মো. ভাসানী বলেন, ‘আমরা পায়রা নদী দিয়ে ট্রলার নিয়ে খাকদোনের চান্দখালি এলাকায় ধান নিতে আসি। এত ব্রিজ করা হয়েছে যে এখন চলতে কষ্ট হচ্ছে। সেতুর নিচ দিয়ে জোয়ারের সময় ট্রলার নিয়ে যাওয়া কষ্ট। আবার ভাটির সময় পানি না থাকায় যাওয়া যায় না। ’

পাউবোর বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘নদটি রক্ষার জন্য পাউবো থেকে একটি প্রস্তাব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এ প্রকল্পের আওতায় কেওড়াবুনিয়া থেকে ১০০ ফুট প্রশস্ত করে ১০ কিলোমিটার খনন করে পায়রা নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত নদটি পুনঃখনন করা হবে। ’

বিআইডাব্লিউটিএর বরিশাল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুনুর রশিদ বলেন, ‘খাকদোন নদের ওপর সেতু নির্মাণের জন্য কেউ আমাদের কাছে কোনো ধরনের অনাপত্তির আবেদন করেনি। আমরা সেতু নির্মাণের জন্য কোনো ধরনের অনাপত্তি দিইনি। ’

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সুজয় মুখার্জি বলেন, সম্প্রতি যে দুটি গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো ঢাকা থেকে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আন্ত মন্ত্রণালয়ের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সর্বশেষ