সাত পণ্যের নিশ্চয়তা চাইবে ঢাকা  নিত্যপণ্যের প্রস্তাব নিয়ে দিল্লি যাচ্ছেন বাণিজ্যমন্ত্রী

 

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে যখন খাদ্যপণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে, তখন পাশের দেশ ভারতের কাছে সাত পণ্যের কোটা নির্ধারণ করে সেই কোটা অনুযায়ী পণ্য আমদানির নিশ্চয়তা চাইছে বাংলাদেশ। পণ্যগুলো হচ্ছে চাল, গম, চিনি, পিঁয়াজ, আদা, রসুন ও মসুর ডাল। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে দিল্লির উদ্দেশে আজ সকালে ঢাকা ছাড়ছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

সূত্র জানান, বাংলাদেশের প্রস্তাবে প্রতিটি পণ্যের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কোটা উল্লেখ করা আছে। দুই পক্ষের আলোচনায় তা কমবেশি হতে পারে। তবে পরিমাণ যেটিই চূড়ান্ত হোক, বাংলাদেশ চাইবে কোটামাফিক পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানি নিশ্চিত করবে ভারত।

সাত পণ্যের নিশ্চয়তা চাইবে ঢাকা

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বার্ষিক কোটা অনুযায়ী ৯ লাখ মেট্রিক টন চাল, ৪৫ লাখ মেট্রিক টন গম, ১৫ লাখ মেট্রিক টন চিনি, ৭ লাখ মেট্রিক টন পিঁয়াজ, ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন আদা, ৩০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল এবং ১০ হাজার মেট্রিক টন রসুন আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন সময় খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ভারত। এতে সমস্যায় পড়ে বাংলাদেশ।এ কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে বাংলাদেশ সরকারকে আগাম তথ্য দিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে গত সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে পণ্য আমদানিতে কোটা নির্ধারণের বিষয়ে দুই দেশ সিদ্ধান্ত নেয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে দুই দেশের যে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, সেখানে উল্লিখিত বিষয়গুলোর অগ্রগতি নিয়ে আলোচনার জন্য বাণিজ্যমন্ত্রীর এই সফর হলেও পরিস্থিতির কারণে এ সফরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে নিত্যপণ্য আমদানির কোটা নির্ধারণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে খাদ্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। ডলার সংকটের কারণে পণ্য আমদানির এলসি খোলা নিয়েও বিপাকে আছেন ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে এগিয়ে আসছে রোজা। এ অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য ভারতের ওপরই ভরসা রাখতে যাচ্ছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ভারত তার অন্য দুই প্রতিবেশী মালদ্বীপ ও ভুটানে বার্ষিক নির্ধারিত কোটা পদ্ধতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রপ্তানি করে। এ পদ্ধতিতে প্রতি অর্থবছর এসব দেশে কী পরিমাণ খাদ্যপণ্য রপ্তানি করবে তার একটি গেজেট প্রকাশ করে দেশটি। এর ফলে স্থানীয় বাজারে কোনো পণ্যের সংকট দেখা দিলে, ভারত যদি তা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞাও দেয় তার পরও অর্থবছর জুড়ে দেশ দুটি ওই পরিমাণ পণ্য আমদানি করতে পারে। এর মাধ্যমে নিজেদের স্থানীয় বাজার স্থিতিশীল রাখতে পারে মালদ্বীপ ও ভুটান। এখন বাংলাদেশও সেই সুবিধা চাইছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপনকান্তি ঘোষ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দুই দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে খাদ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ভারত। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, এ নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শিথিল রেখে, প্রতি বছর আলোচ্য পণ্যগুলো কোটামাফিক বাংলাদেশে রপ্তানি করবে ভারত।

সেপা চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু : ঢাকা-দিল্লির যৌথ ঘোষণায় চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই দ্বিপক্ষীয় কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্টের (সেপা) বিষয়ে আলোচনা শুরুর কথা উল্লেখ ছিল। বাণিজ্যমন্ত্রীর এ সফরে সেপার নেগোসিয়েশন শুরুর বিষয়ে আলোচনা হবে। সেপা হলে আগামী ৭-১০ বছরের মধ্যে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৩-৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে এবং বাংলাদেশে ভারতীয় রপ্তানি ৪-১০ বিলিয়ন ডলার বাড়বে বলে দুই দেশের যৌথ সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সিইও ফোরাম গঠন : দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সরকারকে পরামর্শ দিতে শীর্ষ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের নিয়ে সিইও ফোরাম গঠন করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে এ ফোরাম গঠনের বিষয়টি ছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা বা কোম্পানির সিইও (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) এবং সিনিয়র ব্যবসায়ী নেতাদের নিয়ে এ ফোরাম গঠন করা হবে। উভয় দেশের সরকার এ প্রতিনিধি মনোনীত করবে। প্রয়োজনে এ ফোরাম বিশেষ কোনো খাতের প্রতিনিধিকে সহযোগী সদস্য হিসেবে অথবা অতিথি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। গঠন হওয়ার পর এ ফোরাম বছরে একবার বা প্রয়োজনে একাধিকবার পালাক্রমে (দিল্লি-ঢাকা) বৈঠকে মিলিত হবে। এসব বৈঠকে গৃহীত সুপারিশ উভয় দেশের সরকারকে দেওয়া হবে যাতে একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা যায়।

পাটপণ্যের অ্যান্টি ডাম্পিং প্রত্যাহার : ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে পাটের সুতা, চট ও বস্তা আমদানির ওপর টনপ্রতি ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে ভারত। পাঁচ বছরের জন্য আরোপিত এ অ্যান্টি ডাম্পিংয়ের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আসছে জানুয়ারিতে। ভারত এ অ্যান্টি ডাম্পিংয়ের মেয়াদ আবারও বাড়াতে চাইছে। বাংলাদেশ চাইছে পাটপণ্যে অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার করে নেবে ভারত। এবারের সফরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

সর্বশেষ