নানামুখী কান্ডে বিব্রত প্রশাসন

সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দেওয়া দন্ড মওকুফ, শীর্ষ দুই পদসহ ২৩ জেলায় ডিসি পদে বড় পরিবর্তন, তিন স্তরে পদোন্নতি ৬০০-এর বেশি কর্মকর্তার

 নানামুখী কান্ডে বিব্রত প্রশাসন

আর মাত্র ৯ দিন। শেষ হতে চলেছে আরও একটি বছর। প্রশাসনের শীর্ষপদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ কেন্দ্রীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন যেমন হয়েছে, তেমনি মাঠপ্রশাসনেও আনা হয়েছে বড় ধরনের রদবদল। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ, রংপুর, ফরিদপুরসহ দেশের ২৩ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিদায়ী বছরে তিন স্তরের প্রায় সাড়ে ৬০০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। ‘জনস্বার্থে’ একজন সচিবসহ কয়েকজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। চলতি বছর চাকরি হারানোর আতঙ্কে ছিলেন অনেক কর্মকর্তা। প্রকাশ্যে ট্রফি ভাঙা, ‘ম্যাডাম’ না বলায় অশোভন আচরণসহ মাঠপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের অনেকের অপেশাদার ও বিতর্কিত আচরণে বিব্রত হয়েছে প্রশাসন। স্বাধীনতা পুরস্কারকেও বিতর্কিত করেছেন কেউ কেউ। অপরাধের কারণে কয়েক কর্মকর্তার শাস্তিও হয়েছে। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় শাস্তি পাওয়া কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনের দন্ড মওকুফ করে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। লাইব্রেরির জন্য বই কিনতে সরকারি তালিকায় অতিরিক্ত সচিবের ২৯টি বই থাকার ঘটনা বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে প্রশাসনে। এ বছরই দেওয়া হয়েছে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সে ৩৯ মাস ছাড়। অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় বিলাসী পণ্য ক্রয় এবং বিদেশ ভ্রমণে লাগাম টানা হয়েছে। সব কিছু মিলিয়ে বিদায়ী বছরটি ছিল চাকরি হারানোর আতঙ্ক ও কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকান্ডে প্রশাসনের বিব্রত হওয়ার বছর।

পুরস্কারের ট্রফি ভাঙেন ইউএনও : গত সেপ্টেম্বরে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার চৈক্ষ্যং আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে ফুটবলের ফাইনাল খেলার প্রধান অতিথি ছিলেন ইউএনও মেহরুবা ইসলাম। হার-জিত নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটিতে বিরক্ত হয়ে প্রকাশ্যে পুরস্কারের ট্রফি ভেঙে ফেলেন ইউএনও। এ ঘটনা ভাইরাল হয়। বিষয়টি পরিণত হয় ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে।

নৈশপ্রহরীকে লাঠিপেটা : বান্দরবানের ঘটনার কয়েক দিন আগে বগুড়া সদরের ইউএনও সমর পালের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের নৈশপ্রহরী আলমগীর হোসেনকে লাঠি দিয়ে মারধর করার অভিযোগ ওঠে। আলমগীর জানান, ‘ইউএনও তাকে ডেকে নিয়ে তার কক্ষে লাঠি দিয়ে পিটিয়েছেন। এ সময় তাকে দুই আনসার সদস্য ধরে রেখেছিলেন। তার বাম হাত ভেঙে গেছে।’সাংবাদিককে গালিগালাজ : গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে উপহারের ঘর নির্মাণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে স্থানীয় সাংবাদিক সাইদুল ফরহাদকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কায়সার খসরু। ঘটনার তিন দিন পর ওই ইউএনওকে ওএসডি করা হয়। সাংবাদিকের সঙ্গে ইউএনওর ভাষা ব্যবহারকে ‘মাস্তানদের চেয়েও খারাপ ভাষা’ বলে মন্তব্য করেছেন হাই কোর্ট।

লাইব্রেরির জন্য অতিরিক্ত সচিবের ২৯ বই : সরকারি কর্মকর্তাদের ‘জ্ঞানচর্চা ও পাঠাভ্যাস’ বাড়ানোর জন্য বই কিনতে ৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ জন্য ১ হাজার ৪৭৭টি বইয়ের তালিকা দেওয়া হয়। এতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নবীরুল ইসলামের ২৯টি বই রয়েছে- এমন খবরে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রশ্ন ওঠে বই বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়েও। সমালোচনার মুখে গত ২৯ আগস্ট বইয়ের তালিকাটি বাতিল হয়।

অপরাধের শাস্তি : বিদায়ী বছরে নানা অনিয়ম বা অপরাধের কারণে বিভাগীয় মামলায় শাস্তি পেয়েছেন বেশ কয়েক কর্মকর্তা। এর মধ্যে গত ২১ নভেম্বর মামলা তুলে নিতে হুমকি ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে উপসচিব এ কে এম রেজাউল করিমকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। অন্যদিকে এক নারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক এবং ওই নারীর নামে ব্যাংকে হিসাব খুলে লেনদেনের দায়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সাবেক ইউএনও আসিফ ইমতিয়াজকে বেতন গ্রেড কমানোর দন্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি এ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে আছেন। যৌন হয়রানির দায়ে গত ১৩ অক্টোবর কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরের ইউএনও অমিত চক্রবর্ত্তী শাস্তি পেয়েছেন। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের ইউএনও থাকার সময় অমিত চক্রবর্ত্তীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে শাস্তি হিসেবে ‘তিরস্কার’ করা হয়।

বাধ্যতামূলক অবসরের আতঙ্ক : ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর অবসরে যাওয়ার কথা ছিল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মকবুল হোসেনের। কিন্তু তার এক বছর আগে গত ১৬ অক্টোবর তাকে অবসরে পাঠায় সরকার।

সরকারি চাকরি আইনের ৪৫ নম্বর ধারায় বলা আছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর যে কোনো সময় সরকার জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে ওই কর্মচারীকে চাকরি থেকে অবসর দিতে পারবে। একই ধারায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলাদা প্রজ্ঞাপনে তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অবসরে পাঠানো হয়। তারা হলেন- পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মীর্জা আবদুল্লাহেল বাকী, মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা এবং পুলিশ সদর দফতরের এসপি (টিআর) মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চৌধুরী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক তিনটি প্রজ্ঞাপনের ভাষা ছিল এক। এই দুই ঘটনায় প্রশাসনজুড়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। ঠিক কোন ‘জনস্বার্থে’ চার কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, সেটি খুঁজতে থাকেন অনেকে।

শীর্ষপদে রদবদল ও কর্মকর্তাদের পদোন্নতি : বিদায়ী বছর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বেশ কয়েকটি বড় পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রশাসনে উপসচিব পদে ১ অক্টোবর পদোন্নতি পান ২৫৯ কর্মকর্তা। গত ২ নভেম্বর যুগ্মসচিব পদে ১৭৫ উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয় সরকার। এর আগে গত ২৯ জুন যুগ্মসচিব পদে ৮২ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ৬ এপ্রিল অতিরিক্ত সচিব পদে ৯৪ যুগ্মসচিবকে পদোন্নতি দেয় সরকার। বিদায়ী বছর মাঠ প্রশাসনেও বড় ধরনের রদবদল হয়। গত ২৩ নভেম্বর রাতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ জেলাসহ দেশের ২৩টি জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে পরিবর্তন আনে সরকার। এর মধ্যে কয়েকটি জেলায় বদলির মাধ্যমে এবং বাকি জেলায় নতুন কর্মকর্তাদের ডিসি করা হয়। বছরের শেষ দিকে এসে প্রশাসনের শীর্ষ পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার। আগের সচিবের চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ শেষ হওয়ায় এ নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আহমদ কায়কাউসের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ওই পদে নিয়োগ পান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পান স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরী।

সময় কমিয়ে নতুন নিয়মে অফিস : বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে গত ২৪ আগস্ট থেকে সময় কমিয়ে নতুন নিয়মে অফিস করেন সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা-কর্মচারীরা। নতুন নিয়মানুযায়ী সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সরকারি অফিস চলে। এতে কর্মঘণ্টা ১ ঘণ্টা কমে। শীত আসায় গত ১৫ নভেম্বর থেকে এ সময়সূচি ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করে সরকার। এতেও কর্মঘণ্টা ১ ঘণ্টা কম। অর্থনৈতিক মন্দা সামাল দিতে গত ১২ জুন সরকারি টাকায় বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। বছরের শেষ দিকে তা বাড়িয়ে বিলাসী পণ্য আমদানিতেও করাকড়ি আরোপ করা হয়।

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত চাকরিপ্রার্থীদের বয়সে ছাড় : করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সে ৩৯ মাস ছাড় দেয় সরকার। গত ২২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর আগে করোনাভাইরাসের কারণে সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য দুই দফায় বয়স ছাড় করে আদেশ জারি করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সে সময় ২১ মাস বয়সের ছাড় দেওয়া হয়। তবে বয়সের এই ছাড় বিসিএসের জন্য প্রযোজ্য হয়নি।

সর্বশেষ