অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান সরকারের

 

দেশে-বিদেশে গত দুই মাস থেকে বাংলাদেশ নিয়ে কূটনীতিকদের তৎপরতা বেড়ে গেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর ঢাকার কূটনীতিকরা বৈঠকও করেছেন কয়েক দফা। প্রকাশ্যে বিবৃতি দিচ্ছেন পশ্চিমা অনেক কূটনীতিক। এর বাইরে ওয়াশিংটনে তৎপর মার্কিন প্রশাসন। হোয়াইট হাউস ও মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশ নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। তাদের এই বক্তব্য বিবৃতির প্রতিবাদও জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বেশ কয়েকবার বিস্ময় ব্যক্ত করে বলেছেন, এভাবে তারা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ নিয়ে বক্তব্য বিবৃতি রাখতে পারেন না। বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিকরাও একই কথা বলছেন। তবে অনেকে এর বিপরীতে সরকারের যে তৎপরতা দেখানো দরকার তা পর্যাপ্ত নয় বলেও বলছেন। কেউ কেউ বলছেন ঝগড়া বিবাদ না করে কূটনীতিকভাবে বাংলাদেশকে আরও বেশি কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো দরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন গতকাল বলেছেন, বিদেশি প্রভাব কিংবা অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র জাতীয় নির্বাচন অর্থাৎ সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। সরকার বিদেশি হস্তক্ষেপ ও দেশীয় ষড়যন্ত্রকে সরকার সফল হতে দেবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং তার সরকার শুধু জনগণের ওপর নির্ভরশীল। কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ  অথবা দেশীয় ষড়যন্ত্র আমাদের বিপথে নিতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মাথা ঘামানো কূটনীতিকদের নীতিমালা ভিয়েনা কনভেনশনের পরিপন্থী। কোনো অভিযোগ থাকলে কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ করতে পারে তারা। কেবল শিষ্টাচার নয় এমন আচরণ রাষ্ট্রাচারেরও পরিপন্থী বলে মনে করেন অনেকে। লাগাতার এমন কাজে পক্ষপাতী আচরণ প্রকাশ পায় কূটনীতিকদের। তারা বলছেন, নির্দিষ্ট বিদেশিরা যখন আমাদের দেশের রাজনীতি নিয়ে কথাবার্তা বলেন, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে তারা কি কোনো পক্ষপাতিত্ব করছেন কি না। কারণ শিষ্টাচারের যে ধরনের আচরণগুলো আশা করা হয় এটা তার বাইরে। সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান গতকাল বলেন, বিদেশিরা যা করছেন তা অকূটনৈতিক আচরণ। ভিয়েনা কনভেনশনে স্পষ্টভাবে লেখা আছে কোনো রাষ্ট্রদূত দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে কথা বলবেন, কাজ করবেন।

কূটনীতিকদের অতি তৎপরতায় বিস্ময়

কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তারা অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছেন। সেটা অগ্রহণযোগ্য। এখন বিভিন্নভাবে তাদের সতর্ক করা হচ্ছে, এতে কাজ না হলে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো বিকল্প থাকবে না। মনে রাখতে হবে, দাতা গোষ্ঠী কোনো কারণ ছাড়া সাহায্য সেই সাহায্যের পেছনে কোনো না কোনো উদ্দেশ্য থাকে। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে বিদেশি কূটনীতিকদের কথাবার্তা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। আগের বেশ কয়েকটি নির্বাচনেও এমনটি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের রাষ্ট্রদূত সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে কোনো মন্তব্য করেননি। যেসব বৈঠক বা আয়োজনে তারা এসব কথা বলেছেন, সেসব অনুষ্ঠানের আয়োজন যারা করছেন এবং রাষ্ট্রদূতদের মন্তব্য করার সুযোগ করে দিচ্ছেন, তাদের রাজনীতিটা আগে বোঝা দরকার। ড. ইমতিয়াজের মতে, নিঃসন্দেহে এখনো আমাদের গণতন্ত্রে কিছু ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণের জন্য বাইরের দেশের কেউ এসে মধ্যস্থতা করবে, এই মানসিকতা কেন তৈরি হলো, সেটি আমি বুঝতে পারছি না। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের রাজনীতির মধ্যে কোনো ধরনের বিভাজন থাকলে সেই বিভাজনের সুযোগ আন্তর্জাতিক মহল নিতে চাইবে। তারা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য দরকষাকষি করার সুযোগ খুঁজতে চাইবে। তারা তাদের স্বার্থ ব্যতীত আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। আবার এটিও মনে রাখতে হবে, তাদের মাধ্যমে কিন্তু দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় দেশের জনগণের লড়াইয়ের মাধ্যমে। অতীতেও আমরা তাই দেখেছি। জনগণ রাস্তায় নেমেই কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিরোধী পক্ষ পুলিশের ওপর নিষেধাজ্ঞার যে প্রচারণা চালাচ্ছে তা অযৌক্তিক। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞায় বাংলাদেশের নাম আসবে না বলে আশাবাদী সরকার। বরং দ্রুতই র‌্যাবের ওপর গত বছর আরোপিত যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। কারণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর আইনের পথও খোলা রাখা হয়েছে। তবে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এ বিষয়ে বিলম্ব হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এর আগে ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই ওয়াশিংটন থেকে উদ্বেগ প্রকাশের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের পেছনে একটা কারণ হচ্ছে আমাদের সাংবাদিক, উনি এটা উসকে দেন। তার হোয়াইটহাউস এবং ইউএন দুই জায়গাতেই ওনার এক্সেস আছে। বাংলাদেশে কিছু হলেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করেন। প্রশ্ন করার ফলে উনি উত্তর দেন। উত্তরটা উনি (সাংবাদিক) লিখেও দেন। অনেক সময় উনি আগেভাগে লিখেও দেন, টেক্সট করেন। আমি এইটা প্রশ্ন করব, আর এই দুর্ঘটনা হয়েছে। সেই কারণেই বোধহয় যুক্তরাষ্ট্রের এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া।

সর্বশেষ