সচিব সভায় প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি মোকাবেলায় একগুচ্ছ নির্দেশনা

 

দেশে খাদ্যের মজুদ ১৫ লাখ টনের বেশি রাখা, ওএমএসসহ খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং টিসিবির মতো কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, বিদেশি অর্থায়নে চলমান প্রকল্পগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকা, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিলাসবহুল পণ্য ব্যবহার ও আমদানি কমানোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গতকাল রবিবার নিজ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সচিব সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দেন। পরে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সভার সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। সভায় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় একগুচ্ছ নির্দেশনা

নিজ কার্যালয়ে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : পিআইডি

kalerkanthoএর মধ্যে ১৫ জনের বেশি সচিব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও চলমান বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কথা বলেন।

মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি দেখারও নির্দেশনা দেন।

খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, বৈঠকে খাদ্য নিরাপত্তায় কী কী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন ১৬ লাখ টনের বেশি খাদ্য মজুদ আছে। এটি সন্তোষজনক। তবে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ ও বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি নিশ্চিত করতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। কোনোমতেই যেন খাদ্য মজুদ ১৫ লাখ টনের নিচে না নামে সেই নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।

মন্ত্রিপরিষদসচিব জানান, বৈঠকে নতুন করে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিদেশি অর্থায়নে চলমান প্রকল্পগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। কিছুদিন ধরে এই প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি কিছুটা ধীর। এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে দৃষ্টি দিতে বলা হয়েছে।

সভা সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি প্রস্তাব বাস্তবায়নেরও পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়া, অগ্রাধিকারভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা, প্রতি ইঞ্চি পতিত জমি চাষের অধীনে নিয়ে আসার জন্য জনগণকে সচেতন করা এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া।

মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. মাহবুব হোসেন জ্বালানির বর্তমান অবস্থা উপস্থাপন করেন এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণ নিয়ে কথা বলেন।

ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি জানানোর নির্দেশ

দেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানোর নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার আলোচনার প্রেক্ষাপটে তিনি এই নির্দেশ দেন।

মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, বৈঠকে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঋণ কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ নিয়ে ব্যাংকিং বিভাগকে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘সব মিলে আরো কয়েকটা ব্যাংকের কথা শোনার পর আমি ইন্টারনেটে গিয়ে দেখলাম কয়েকটা ব্যাংকের ব্যাপারে ইউটিউবে বিভিন্ন রকম আলোচনা চলছে। কেউ কেউ বাইরে থেকে বক্তৃতা দিচ্ছেন। তবুও এটাকে অবহেলা করা হয়নি। বিষয়টি আমলে নিয়ে বলা হয়েছে, এগুলো দেখে বাস্তব অবস্থাটা জানানো। ’

মন্ত্রিপরিষদসচিব জানান, আন্তর্জাতিকভাবে বলা হয়েছে ২০২৩ সাল কঠিন সময় হবে। চীন ও রাশিয়ায় উৎপাদন কমেছে। তিনি জানান, খাদ্য, সার ও জ্বালানিতে গুরুত্ব দিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। রেমিট্যান্স বাড়ানোর ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে।

জঙ্গি বিষয়ে সতর্কতা

মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেছেন, ‘জঙ্গি বিষয়ে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। জঙ্গিরা যেন কোনোভাবেই কারো কোনো আশ্রয় বা সহায়তা কিংবা কোনো আর্থিক সুবিধা নিতে না পারে, সেদিকে দৃষ্টি রাখার জন্য সচিবদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে আপনারা দেখেছেন পুলিশ কিছু জঙ্গিকে (আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) চিহ্নিত করেছে এবং বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। ’

জঙ্গি ছিনতাইয়ের বিষয়ে এক প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সভায় গত বুধবার আলোচনা করে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জঙ্গিরা এখন ধরা না পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত বুধবার আমরা সব সংস্থাসহ বসেছিলাম। খোলামেলা সব বলা যাবে না। ’

বিলাসবহুল পণ্য ব্যবহার ও আমদানি কমানোর নির্দেশ

বিলাসবহুল পণ্য ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি সেসব আমদানি কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন, ‘প্রতিটা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের তথ্য তাদের ওয়েবসাইটে থাকতে হবে। যাতে যে কেউ যেকোনো তথ্য সেখান থেকে জানতে পারে, নিতে পারে। সেখানে আমাদের সাফল্যগুলো তুলে ধরতে হবে। প্রতিটা মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে যদি এই সাফল্যগুলো প্রতিনিয়ত আপডেট করে, তাহলে মানুষ কিন্তু জানতে পারবে যে কী কী কাজ আপনারা করলেন। ’

সভায় উপস্থিত একাধিক সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে  বলেন, ‘বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন চলমান বৈশ্বিক সংকটে একটি বা দুটি দেশ সুবিধা পাচ্ছে। অনেক উন্নত দেশসহ বাকি দেশগুলো কষ্টে রয়েছে। উন্নত দেশগুলোও গুরুতর সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, যার জন্য তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রিজার্ভ হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বহুগুণ বেড়েছে। এটি আমাদের দেশেও আঘাত করেছে। আমাদের যারা রেমিট্যান্স পাঠায় তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ ও প্রণোদনা আমরা দিয়েছি। আমাদের তিন মাসের খাদ্য কেনার মতো রিজার্ভ থাকলেই যথেষ্ট। সেখানে আমাদের পাঁচ-ছয় মাসের রিজার্ভ আছে। তার পরও আমাদের একটু সাশ্রয়ী হতে হবে, আরেকটু সচেতন হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা এখনই যে বিপদে পড়েছি তা কিন্তু না। কিন্তু আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে যেন ভবিষ্যতে দেশ কোনো বিপদে না পড়ে বা দেশের মানুষ কষ্ট না পায়। ’

সচিবদের নিয়ে প্রতিবছর একটি বিশেষ সভা করেন সরকারপ্রধান। সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে সর্বশেষ সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালের ২ জুলাই। লকডাউন তুলে দেওয়ার পর গত বছরের ১৮ আগস্ট সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন ভার্চুয়ালি। তবে কোনো কোনো বছর সরকারপ্রধান উপস্থিত না থাকলেও সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদসচিব।

সর্বশেষ