সংকটের মুখে পোশাক শিল্প অর্থনীতির স্বার্থেই এ খাতের সুরক্ষা প্রয়োজন

করোনা মহামারির ধকল কাটিয়ে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখনই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে দেশের বৃহত্তম রপ্তানি খাতটি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বের অর্থনীতিই সংকুচিত হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ সারা বিশ্বেই দেখা দিয়েছে মূল্যস্ফীতি। উন্নত বা ধনী দেশগুলোও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় কৃচ্ছ্রসাধন করছে। সেসব দেশের সাধারণ মানুষও কমিয়ে দিয়েছে কেনাকাটা। তাই পোশাকের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা এখন পোশাকের দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে।

অন্যদিকে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে তৈরি পোশাক শিল্পে। প্রতিষ্ঠানগুলো এ সংকটের কারণে অর্ডার নিতে পারছে না; আবার বিদেশি ক্রেতারাও অর্ডার দিতে দ্বিধান্বিত হচ্ছে। ইতঃপূর্বে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে বেড়েছে খরচ, যা এ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। সব মিলে তৈরি পোশাক শিল্প গভীর সংকটের সম্মুখীন। সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা অনিশ্চিত।

linkedin sharing button
সংকটের মুখে পোশাক শিল্প

 

বস্তুত এ পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই উদ্বেগজনক। কারণ তৈরি পোশাক শিল্প আমাদের সবচেয়ে বড় রফতানি খাত; অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। তাই এ শিল্পের সংকট কাটাতে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে দ্রুত। সরকার, অর্থনীতিবিদ, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং এ শিল্পের ব্যবসায়ীদের আলোচনার মাধ্যমে সংকট উত্তরণে একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

এটি সত্য, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান আমাদের হাতে নেই। তবে করোনাকালের মতো ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সহায়তার মাধ্যমে সরকার এ শিল্পের পাশে দাঁড়াতে পারে। দেশে শিল্প খাতে বিদ্যমান গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কমিয়ে আনা যেতে পারে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অবৈধ লাইনগুলো বন্ধ করে দিলে এবং অপচয় কমিয়ে আনা হলে উপকৃত হতে পারে শিল্প খাত।

করোনাকালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করায় শিল্প খাত ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছিল। শিল্পের জন্য এ ধরনের ব্যাংকিং সহায়তা অব্যাহত রাখা দরকার। দুর্ভাগ্যবশত দেশের ব্যাংক খাত সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি, খেলাপি ঋণের মাত্রাতিরিক্ত ঊর্ধ্বগতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ইত্যাদি কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। করোনা ও বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব এ দুর্বলতাকে আরও গভীর করেছে।

দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যাংকগুলো খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণের টাকা আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে। জানা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই দীর্ঘ সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংক শীর্ষ ১৫ ঋণখেলাপির কাছ থেকে ১ টাকাও আদায় করতে পারেনি। এই যদি হয় ব্যাংক খাতের অবস্থা, তাহলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য কীভাবে চলবে?

বিশেষত এই সংকটকালে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এদিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া। অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো শিল্প খাত। এক্ষেত্রে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান সবচেয়ে বেশি। এ খাত শুধু দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকেই সমৃদ্ধ করেনি, একইসঙ্গে নিশ্চিত করেছে অগণিত মানুষের কর্মসংস্থান। কাজেই তৈরি পোশাক শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার বিকল্প নেই।

সর্বশেষ