নির্মাণসামগ্রীর দাম লাগামহীন সব ধরনের কাজ স্থবির, দিতে হচ্ছে পুনঃদরপত্রও

 

খরচ বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, সাধারণ মানুষের অনেকে বাড়িঘরের কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন * ডলার সংকটে এলসি খুলতে পারছেন না এ খাতের অনেক ব্যবসায়ী

দেশে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে নির্মাণসামগ্রীর দাম। বিশেষ করে রডের দাম আকাশছোঁয়া। প্রধান কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে-রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়া এবং রডের কাঁচামাল আমদানিতে ডলার সংকট।

ডলারের তীব্র সংকটের কারণে অনেকে এলসি খুলতে পারছেন না। সিমেন্টের কাঁচামাল এবং বিটুমিন আমদানির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। পাশাপাশি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ইট, বালু, সিমেন্টের দাম। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার সার্বিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকের মজুরিও এখন দ্বিগুণের কাছাকাছি। সামগ্রিকভাবে নির্মাণ খরচ বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এমনটিই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ কারণে সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প ছাড়াও ব্যক্তিপর্যায়েও নির্মাণকাজ একরকম থমকে গেছে। লোকসানের ঝুঁকি থাকায় সরকারি অনেক প্রকল্পে কাজ বন্ধ রেখেছেন ঠিকাদার। কাজ না করার ঘোষণা দেওয়ায় বাধ্য হয়ে সরকারের কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দ্বিতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

সব ধরনের কাজ স্থবির, দিতে হচ্ছে পুনঃদরপত্রও

 

এছাড়া বন্ধ না করলেও বেশির ভাগ কাজ আটকা পড়েছে ধীরগতির ফাঁদে। ঠিকাদাররা বসে আছেন রেট শিডিউল বাড়ানোর অপেক্ষায়। ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর, রেলওয়ে এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ বেশকিছু সরকারি সংস্থা রেট শিডিউল পুনর্নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এরপরও মূল্যবৃদ্ধির পাগলা ঘোড়ার সঙ্গে ঠিকাদাররা পেরে উঠছেন না। বাজার স্থির না হওয়ায় সাধারণ মানুষও নির্মাণকাজ শুরু করতে সাহস পাচ্ছেন না। টাকার সংকুলান না হওয়ায় কেউ কেউ কাজ বন্ধ রেখেছেন।

এদিকে ফ্ল্যাট প্রকল্প নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ডেভেলপাররা। বিশেষ করে যারা বাজারের এই অস্থিরতার আগে অন্যের জমি নিয়ে ফ্ল্যাট প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি করেছিলেন, তারা এখন লোকসানের মুখে। অনেকে কাজের গতি কমিয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থায় বাজার স্থিতিশীল হওয়ার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত অনেকে নতুন করে প্রকল্প নেওয়া স্থগিত রেখেছেন।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চলমান কাজের গতি অনেকাংশে কমেছে। ঠিকাদারদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়ার পরও তারা খুবই ধীরগতিতে কাজ করছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ করছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। ওই প্রকল্পের কিছু ঠিকাদার কাজ চালু অবস্থায় অবশিষ্ট কাজ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এজন্য ওই প্রকল্পে নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।’ তিনি জানান, এই প্রকল্পের প্রায় ৫ ভাগ কাজের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার নিয়োগ দিতে হচ্ছে।’

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) প্রেসিডেন্ট আলমগীর সামসুল আলামিন যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে নির্মাণ খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় আগের চুক্তিগুলো আমাদের বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। এগুলো করতে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন করে প্রকল্প নেওয়ার সাহস পাচ্ছি না আমরা। সামনের দিনগুলো কেমন যাবে, সেটা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।’

নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে কথা বলে জানা যায়, প্রায় এক বছর ধরে নির্মাণসামগ্রীর বাজার অস্থির। লাফিয়ে লাফিয়ে শুধু দাম বাড়ছেই। অস্থির বাজার, স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ নেই। এবারের দামবৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিবছরের স্বাভাবিক নিয়মের কোনো মিল নেই। একেবারে অভূতপূর্ব। ছয় মাস ধরে নির্মাণসামগ্রীর বাজার একেবারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটাও ধারণা করা যাচ্ছে না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় ইট, বালু, পাথর, রড, সিমেন্ট, রেডি মিক্স, বিটুমিন এবং লোহাজাতীয় সব জিনিসের দাম উপকরণভেদে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের তীব্র সংকট। শতভাগ মার্জিন দিয়েও (আমদানি ব্যয়ের পুরো টাকা পরিশোধ) অনেকে এলসি খুলতে পারছেন না। বড় অনেক ব্যাংকে প্রয়োজনীয় ডলার নেই। কোনো কোনো ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার সরবরাহ করার গ্যারান্টিও চায়। এই যখন অবস্থা, তখন মড়ার ঊপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। এ কারণে সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারদের সংকট আরও বেড়েছে।

এলসি খোলা নিয়ে ডলার সংকটের বিষয়ে মেসার্স মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, ‘ডলার সংকটের কারণে নির্মাণসামগ্রীর কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলাও সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যমান অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যে কাজ বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। সার্বিক বিষয়গুলো সরকারকে ভাবতে হবে। আর যৌক্তিকভাবে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে।’

এদিকে বিদ্যমান বাস্তবতায় দরপত্রের সময় নির্ধারিত দরেই ঠিকাদারদের কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তর/সংস্থা রেট শিডিউল সমন্বয় না করায় ঠিকাদারদের ক্ষোভ-অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। অনেকে বলেছেন, লাভ তো দূরের কথা, যদি বিদ্যমান রেট শিডিউলে কাজ শেষ করতে হয়, তাহলে জমি বিক্রি করতে হবে। মনে হচ্ছে, কাজ করতে এসে তারা বড় অপরাধ করে ফেলেছেন। তারা বলেন, এভাবে চলতে থাকলে এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের নির্দেশনা দেওয়া না হলে ঠিকাদারদের কাজ গুটিয়ে নিতে হবে। আর এ খাতে যেসব মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে, তারাও ঝুঁকিতে পড়বে। ২০০৭ সালে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির হার এখনকার চেয়ে অনেক কম হলেও তৎকালীন সরকার চলমান কাজের নির্মাণ উপকরণের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করেছিল। এখনকার দাম বাড়ার হার তো নজিরবিহীন। কিন্তু সরকারের অনেক দপ্তর নির্বিকার। কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসিন যুগান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের আওতায় ছোট ছোট প্যাকেজে কাজ করা হয়ে থাকে। এ কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পেলেও কোনো কাজ বন্ধ হয়নি। তবে কাজের গতি কমেছে। ঠিকাদাররা বুঝতে পেরেছেন কাজ করলে তাদের লাভ হবে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের দাম ছিল ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, যা এখন কিনতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। একইভাবে প্রতি টন রডের দাম ছিল ৬৪ হাজার টাকা, যা বেড়ে হয়েছে ৯২ হাজার ২০০ টাকা। প্রতি টন বিটুমিন ৪৮ হাজার থেকে বেড়ে ৮৫ হাজার টাকা। লিটারপ্রতি ৮০ টাকার ডিজেল কিনতে হচ্ছে ১০৯ টাকায়। ৮ হাজার টাকার ইটের গাড়ি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, ২ হাজার ২০০ টাকার বালুর গাড়ি ২ হাজার ৭০০ টাকা। এছাড়া এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রেডিমিক্স, পাথর এবং শ্রমিকের মজুরিও।

সরকার চলতি বছরের নির্মাণ উপকরণের যে রেট প্রকাশ করেছে, বাজারমূল্য এর চেয়েও বেশি। অথচ অনেকের কাজ নেওয়া রয়েছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী। আইনি জটিলতা থাকায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এসব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। এ বিষয়টি সমাধানে সরকার নির্বাহী ক্ষমতাবলে পরিপত্র জারি করতে পারে। নইলে উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন আরও বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে। এসব বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে সরকারি সংস্থাগুলো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে নির্মাণ উপকরণের বাজার স্থির না হওয়ায় সরকারি সংস্থাগুলো সেসব নিয়েও সংশয়ে রয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার যুগান্তরকে বলেন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে উন্নয়ন কাজের গতি অনেকাংশ কমেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনায় তারা কিছুটা ধীরগতিতেই কাজ করছে। আমাদের পক্ষ থেকে কঠোর তদারকি করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বাজারে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য অতিমাত্রায় বেড়েছে। যে কারণে আগে যারা কাজ নিয়েছিল, সেসব ঠিকাদারের কাজ শেষ করতে খুব বেগ পেতে হচ্ছে। সেসব প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের গতি হ্রাস পেয়েছে। তবে সেখানে আমাদের কিছু করার নেই। কেননা ওই বাজারমূল্যে কাজ করতে তারা আমাদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেছেন। কোনো কারণে দ্রব্যমূল্যে কমলে তারা তো সরকারের কাছ থেকে কম টাকা নিত না। ঠিকাদাররা আমাদের কাছে আসছেন এবং নানা অনুনয়-বিনয়ও করছেন। কিন্তু আমাদের তো কিছু করার নেই।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী বোরহান উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্মাণসামগ্রীর দামবৃদ্ধির প্রভাব অন্যান্য সংস্থার মতো ডিএসসিসিতেও পড়েছে। আগে যেসব দরপত্রের চুক্তি করা হয়েছিল, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো ওই কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। তাদের ওই দামেই কাজ করতে হবে। নতুন করে বাজারমূল্য বিবেচনায় রেট শিডিউল করা হয়েছে। এ কারণে নতুন করে যারা কাজ নিচ্ছেন, তাদের তেমন কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তবে নির্মাণসামগ্রীর বাজার স্থির না হওয়ায় নানা আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্মাণসামগ্রীর বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। কদিন পরপর নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ছে। এর প্রভাব উন্নয়ন কাজেও পড়ছে। ঠিকাদাররা কাজ নিতে এবং বাস্তবায়নে শঙ্কাবোধ করছেন। ডিএনসিসির ঠিকাদাররা নির্মাণসমাগ্রীর দাম পুনর্নির্ধারণ করার একটি আবেদন করেছে। বিষয়টি নিয়ে ডিএনসিসি বৈঠক করেছে।’ তিনি জানান, নির্মাণসামগ্রীর বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে রেট শিডিউল পুনর্নির্ধারণ করা হতে পারে।

সর্বশেষ