অর্থনীতির লাগাম টানছে অদক্ষতা

বয়স্ক মানুষ বাড়ছে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলোতে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ কর্মক্ষম দক্ষ মানুষ অন্যান্য দেশ থেকে ডেকে নিচ্ছে দেশগুলো। দিচ্ছে কাজ ও স্থায়ী আবাসনের সুযোগ। অথচ, তাক লাগানো কর্মক্ষম ও তরুণ জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞানের অভাবে সেখানে জায়গা হচ্ছে না বাংলাদেশিদের। যারা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে আছেন, তারাও অন্যান্য দেশের কর্মীর চেয়ে মজুরি পাচ্ছেন কম। ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মী জোগান দিলেও আয়ের দিক দিয়ে অষ্টম। দেশের মধ্যে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ভুগছে দক্ষ কর্মী সংকটে। উচ্চশিক্ষিত হয়েও দক্ষতার অভাবে হচ্ছে না কর্মসংস্থান। অদক্ষতাই টেনে রাখছে দেশের অর্থনীতির লাগাম।

সর্বশেষ আদমশুমারির তথ্যানুযায়ী, দেশের ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী (প্রায় ২৮ ভাগ) তরুণ ও যুব জনগোষ্ঠী আছে ৪ কোটি ৫৯ লাখ, যাদের বলা হয় একটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। কর্মক্ষম জনসংখ্যার এই হারকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। তবে তথাকথিত সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষার কারণে এই বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম ও তরুণ জনগোষ্ঠী দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হতে পারছে না। ¯œাতকোত্তর শেষ করেও এক পাতা ইংরেজি লিখতে পারছেন না অনেকে। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতাও তৈরি হচ্ছে না। ফলে প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে ৪৭ জনই বেকার। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক জরিপে দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৬৬ শতাংশ বেকার থাকছেন। ফলে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর ডজন ডজন চাকরির আবেদন, চায়ের দোকানে আড্ডা, হতাশা ও মাদককে সঙ্গী করে কাটছে বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণীর সময়।

অর্থনীতির লাগাম টানছে অদক্ষতা
 

দক্ষ কর্মী সংকটে দেশি-বিদেশি শিল্প : দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ভুগছে দক্ষ কর্মী সংকটে। এর মধ্যে অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। গত মাসে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) ভবনে এক নলেজ শেয়ারিং সেশনে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) এক সমীক্ষা তুলে ধরে সংস্থাটির ঢাকার প্রতিনিধি ইউজি আন্দো বলেন, বাংলাদেশে ৩৩৮টি জাপানি কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশ কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায়। তবে ৬৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই বলেছে দক্ষ কর্মীর অভাবে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালে ৪৮.৫ শতাংশ জাপানি কোম্পানি দক্ষ কর্মী সংকটের কথা জানিয়েছিল। 

ফ্রিল্যান্সিংয়ে কর্মী বেশি, আয় কম : অনলাইনে কাজ করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার যোগ করছেন ফ্রিল্যান্সাররা। ক্রমেই বাড়ছে এর বাজার। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দক্ষতা ও ইংরেজি ভাষায় দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা একই শ্রম দিয়ে মজুরি পাচ্ছেন কম। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী অনলাইন কর্মী সরবরাহে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। অথচ, আয়ের দিক দিয়ে অষ্টম। সম্প্রতি দি এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ প্রকাশিত ‘আইটি ফ্রিল্যান্সিং ইন বাংলাদেশ : অ্যাসেসমেন্ট অব প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার নিডস’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ খাতে বৈশ্বিক মানদন্ডে একজন পুরুষ ও নারীর ঘণ্টাপ্রতি গড় পারিশ্রমিক যথাক্রমে ৩৯ দশমিক ১ ও ৩০ মার্কিন ডলার। বিপরীতে এ খাতে বাংলাদেশি পুরুষ ও নারী গড়ে পান ১৪ ও ১০ ডলার। ডিজাইন খাতে একজন পুরুষ ও নারীর গড় পারিশ্রমিক যথাক্রমে ৩৮ দশমিক ১ ও ৬১ দশমিক ১ ডলার; বিপরীতে বাংলাদেশি পুরুষ ও নারী গড়ে পান ২০ ও ৭ ডলার। বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির (বিএফডিএস) সভাপতি তানজিবা রহমান বলেন, দেশের ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক মার্কেট প্লেসে কাজ করার আগ্রহ থাকলেও সেভাবে দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। গেম ডেভেলপিং, বায়োমেডিকেল কনটেন্ট রাইটিং, ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের মতো উচ্চ পারিশ্রমিকের কাজ এখানে খুব কম হয়। ইংরেজি দুর্বলতার কারণে ক্লায়েন্টের সঙ্গে ঠিকভাবে যোগাযোগ করতে পারছে না। ভারতের একজন ফ্রিল্যান্সার যে কাজের জন্য ১১ ডলার দাবি করেন, সেখানে আমরা কাজটা করছি ২ থেকে ৩ ডলারে। আমাদের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানো জরুরি।

প্রবাসী আয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকরা : বিশ্বব্যাংক ও নোম্যাডের প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের গড় মাসিক মজুরি মাত্র ২০৩ ডলার। পাকিস্তানি শ্রমিকদের গড় মজুরি ২৭৬ ডলার, ভারতীয়দের ৩৯৬ ডলার, চীনাদের ৫৩৩ ডলার আর ফিলিপিনোদের ৫৬৪ ডলার। একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রায় পৌনে তিনগুণ মজুরি পান ফিলিপিনো কর্মী। ভারতীয়রা পান প্রায় দ্বিগুণ। দক্ষতা ও ভাষাগত জ্ঞানের অভাবে বাংলাদেশি শ্রমিকরা পারিশ্রমিক কম পাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ লাখ ৭১ হাজার ৯৫১ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশ গেছেন। তাদের ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশই অদক্ষ কর্মী। ২২ শতাংশ দক্ষ কর্মী বিদেশ গেছেন। উচ্চ দক্ষ কর্মী গেছেন মাত্র ২৩৯ জন। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের মাত্র ২ শতাংশ দক্ষ। প্রবাসীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বড় বিমানবন্দরে প্রচুর নেপালি ও ফিলিপিনো ডিউটি ফ্রি দোকানে কাজ করেন। কিন্তু অধিকাংশ বাংলাদেশি সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করেন। ভাষা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে পিছিয়ে থাকাই এর কারণ। অনেক সময় দেখা যায়, বাংলাদেশে কর্মরত একজন বিদেশি কর্মী গড়ে যে বেতন পান, বিদেশে কর্মরত ১০০ বাংলাদেশি শ্রমিকের বেতনও তার সমান নয়।

অদক্ষতায় মিলছে না উন্নত দেশে যাওয়ার সুযোগ : বয়স্ক মানুষ বেড়ে যাওয়ায় বড় অর্থনীতির পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ দক্ষ জনশক্তি আমদানির ঘোষণা দিয়েছে। তবে শিক্ষা ও দক্ষতার অভাবে এইক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। আমাদের জনশক্তি রপ্তানি এখনো মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক রয়ে গেছে। ফলে প্রচুর মানুষ বিদেশে থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রা আসছে কম। চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতি বছর ৪ লাখ করে দক্ষ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জার্মানি। দেশটিতে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১২ ইউরো। সেখানে ইঞ্জিনিয়ার, আইটি, ডেটা সায়েন্স, বিজ্ঞান, বিজনেস অ্যানালিস্ট, ডাক্তার, নার্সসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল রিভিউ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানায়, অস্ট্রেলিয়ার চার বছরে আরও ১২ লাখ কর্মী প্রয়োজন, যার মধ্যে ৯৮ হাজার ৬০০টি পদে বেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞ, ২০ হাজার ৪০০ আইনজীবী এবং সাত হাজার ৭০০ অডিটরের প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া আইটি সহকারী ও টেস্ট ইঞ্জিনিয়ার, ডেটাবেস, সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও আইটি সহকারীর চাহিদা বাড়ছে ব্যাপক হারে। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে ১৪ লাখ ৫০ হাজার অভিবাসী নিতে চায় কানাডা। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ পদ খালি আছে। এসব পদ পূরণের জন্য কানাডা বিদেশিদের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষক, নার্স, প্যারামেডিক, আইনজীবী, অ্যাকাউনটেন্ট, প্রযুক্তিবিদ, কার্পেন্টারসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দক্ষ লোক নিতে চায়। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজের দক্ষতা, ইংরেজি ভাষা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা। শুধু দক্ষতার অভাবে দেশগুলোতে যাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশিরা।

দক্ষতা অর্জনের সুযোগের অভাব : বাংলাদেশে প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা নিয়ে লাখ লাখ তরুণ বের হলেও অদক্ষতার কারণে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ মিলছে না। উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছে না। ভাষাগত দক্ষতা ও বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী কাজের দক্ষতা তৈরি না হওয়ায় তরুণ জনশক্তি পরিণত হচ্ছে বোঝায়। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সরকার দক্ষ জনবল তৈরির উদ্দেশে সারা দেশে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করলেও যুগোপযোগী নয় সেগুলোর শিক্ষাক্রম। আবার কাগজে কলমে অনেক কোর্স থাকলেও বাস্তবে নেই। নেই হাতেকলমে শেখার মতো ল্যাব ও সরঞ্জাম।

সর্বশেষ