অনিশ্চয়তার মুখে পোশাক শিল্প

 

জ্বালানি সংকটে উৎপাদন এবং ইউরোপে মূল্যস্ফীতির কারণে অর্ডার কমে যাওয়ায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প। ফলে চলতি বছর পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা না-ও পূরণ হতে পারে। সংকট উত্তরণে বেশি দামে গ্যাস বা বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এ বিষয়ে পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের উৎপাদন ৪০-৫০ শতাংশ কমে গেছে। জেনারেটর দিয়ে কারখানা চালানোয় জ্বালানি খরচ বেড়েছে ১৬৬ শতাংশ। আমরা সরকারকে গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ করার অনুরোধ করেছি। কয়লা দিয়ে সেটা পূরণ করার চেষ্টা করতে পারে সরকার।

অনিশ্চয়তার মুখে পোশাক শিল্প

 

তিনি আরও বলেন, পুরো টেক্সটাইল খাতে ১৭ শতাংশ গ্যাস দরকার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে সাড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশ গ্যাস লাগে। বাকি সব গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে ব্যবহার হয়। শুধু রপ্তানি বড় বিষয় নয়, ৪-৫ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে টেক্সটাইল শিল্পের (তৈরি পোশাক, স্পিনিং, বায়িং হাউস) ওপর নির্ভরশীল। সরকার যদি এ খাতের জন্য ১৭ শতাংশ গ্যাস দেয় তাহলে সব কারখানা চালু রাখা সম্ভব হবে। রপ্তানি করতে না পারলে অর্ডার এলেও কোনো লাভ হবে না।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম অনেক বেড়ে গেছে। আগে যে দামে গ্যাস কিনেছেন তার চেয়ে বেশি দামেও গ্যাস পাচ্ছেন না শিল্প মালিকরা। সস্তায় জ্বালানি পাওয়ার কারণে বাংলাদেশে নিটিং এবং ডাইং কারখানা স্থাপন করা হলেও চলতি বছরের মার্চ থেকে আর সেই অবস্থা নেই। বাংলাদেশের একটা সুযোগ ছিল স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার। কিন্তু দাম এত বেশি বেড়েছে যে, তাতে আর সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টান পড়ার কারণে স্পট মার্কেট থেকে কেনা যাচ্ছে না। যে কারণে শিল্প কারখানাগুলোতে ইতোমধ্যে উৎপাদন কমে গেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। পোশাক রপ্তানির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল আগামীতে কমে যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিটওয়্যার খাতের ৯০ শতাংশ কাঁচামাল সরবরাহ করা হয় স্থানীয় ভাবে। ওভেনের ৪০ শতাংশ। জ্বালানি সংকটের কারণে নিটওয়্যার খাতের উৎপাদন ৫০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে পোশাক রপ্তানিকারকরা সরবরাহটা ঠিক রাখতে পারছেন না। যার প্রভাব পড়েছে সরাসরি তৈরি পোশাক রপ্তানিতে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৭ শতাংশের বেশি। অক্টোবরে কমতে পারে ২০ শতাংশের মতো।

পোশাক কারখানার মালিকরা জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে চলে গেছে। আমাদের শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট তৈরি হয়েছে। তৈরি পোশাক উৎপাদনও কমে যেতে শুরু করেছে। যেসব আন্তর্জাতিক পোশাক কোম্পানি আমাদের পোশাক কিনতেন তারা অর্ডার দিতে দেরি করছেন। তারা বলছেন, তোমাদের দেশে যেহেতু জ্বালানি সংকট চলছে একটু অপেক্ষা করে দেখি কী হয়। সঙ্গে যোগ হয়েছে ইউরোপে মূল্যস্ফীতি। দুটো মিলে আগামীতে পোশাক রপ্তানি কিছুটা আক্রান্ত হতে পারে। চলতি অর্থবছরে আমাদের পোশাক রপ্তানির যে লক্ষ্য ৪৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, সেটা অর্জন নাও হতে পারে।

ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন, সংকট উত্তরণের জন্য এখনই স্পট মার্কেট থেকে অতিমূল্যে এলএনজি আমদানি করা। কারণ কোনো কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকলে ক্রেতা হারাবে। প্রতি ইউনিট গ্যাস ১৬ টাকার পরিবর্তে ২২ টাকা দিতে রাজি ব্যবসায়ীরা। এখন যে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে প্রেশার এত কম যে উৎপাদন চালু রাখতে পারছে না। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সরকার যদি ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করে গ্যাস আমদানি করে তাহলে তারা ৭-৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি করে আয় করতে পারবে। আরেকটা উপায় দেখছেন ব্যবসায়ীরা, সেটা হলো ভ্যাট, ট্যাক্স ও অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হলেও আরও কম দামে গ্যাস আমদানি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা।

এ বিষয়ে বিকেএমইএর উপদেষ্টা এ এইচ আসলাম সানি বলেন, সরকার ৫ টাকা খরচ করে ৩০ টাকা আয় করতে চায় না। যে কারণে আমাদের জ্বালানি আমদানি বন্ধ রয়েছে। আমাদের জ্বালানি সংকটের খবর পেয়ে ক্রেতারা প্রতিবেশী দেশে অর্ডার দিচ্ছে। ফলে আমাদের ৫ লাখ শ্রমিক বেকার হওয়ার পথে। এসব দক্ষ শ্রমিক একবার গ্রামে চলে গেলে আর ফিরে আসবে না। আমাদের সম্ভাবনা থাকার পরও রপ্তানি কমে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ফেব্রিকস ৩০-৪০ শতাংশ, ডাইং ৫০ শতাংশ ও সুতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে।

সর্বশেষ