বাজারে আটা-ময়দার সংকট, বাড়ছে চালের দাম

হঠাৎ করে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে আটা ও ময়দা। অনেক দোকানে এখন বেশি দামেও পাওয়া যাচ্ছে না নিত্য প্রয়োজনীয় এ দুইটি পণ্য। তবে যেখানে আটা-ময়দা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। সীমিত আয়ের ও সাধারণ মানুষের পক্ষে এ দামে এ দুইটি পণ্য‌ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজধানীতে খোলা ময়দা এখন বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা কেজি দরে। গত সপ্তাহে এই ময়দার দাম ছিল ৬৮ টাকা কেজি। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে প্যাকেট ময়দার দাম ছিল ৭৭ টাকা কেজি। শুক্রবার (১১ নভেম্বর) সেই একই ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৮২ টাকা কেজি দরে। আর গত সপ্তাহের ৬৮ টাকা কেজি দরের খোলা ময়দা এ সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা কেজি দরে। টিসিবির হিসাবে গত এক সপ্তাহে খোলা আটার দাম বেড়েছে কেজিতে ৬.৯৬ শতাংশ।

টিসিবির তথ্যমতে, গত এক বছরের ব্যবধানে বাজারে আটার দাম ৭৯ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়েছে।  টিসিবি বলছে, বছরের ব্যবধানে ময়দার দাম ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। খোলা ময়দার দাম গত বছরের এই সময়ে ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকার মধ্যে।

আটা-ময়দার এই সংকটের পাশাপাশি হু হু করে বাড়ছে চালের দামও।  গত সপ্তাহে যে সরু চাল বিক্রি হয়েছে ৭৫ টাকা কেজি দরে, এই সপ্তাহে সেই একই চাল বিক্রি হচ্ছে ৮৪ টাকা কেজি দরে। শুধু তাই নয়, গরিবের মোটা চালের দামও বেড়েছে কেজিতে তিন টাকার মতো। টিসিবির তথ্য বলছে, গত এক সপ্তাহে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম বেড়েছে ৯.৫৭ শতাংশ।

আর খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত সপ্তাহে যে মোটা চাল ৫২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা সম্ভব ছিল, এই সপ্তাহে সেই একই চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজি দরে।

বাজারে আসা ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে কোনও পণ্যেই স্বস্তি মিলছে না। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য নিয়ে। তারা বলছেন, চালের দাম বাড়লেও  বাজারে চালের সরবরাহে ঘাটতি নেই। কিন্তু চিনি, সয়াবিন তেল, আটা ও ময়দা বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে। পাড়া-মহল্লার মুদি দোকানগুলোতেও দেখা গেছে, এক দোকানে চিনি আছে তো সয়াবিন তেল নেই, আরেক দোকানে সয়াবিন তেল আছে তো আটা ময়দা নেই।  কাঙ্ক্ষিত পণ্য পেতে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটতে হচ্ছে ক্রেতাদের। কেউ আবার বাধ্য হয়ে বেশি দামে পণ্য কিনছেন। সীমিত আয়ের মানুষেরা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতির মধ্যে সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের ঘোষণা আসার পর বাজারে পণ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। রাজধানীর মানিক নগর এলাকার বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া কামাল বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘পণ্য সরবরাহ ঠিকমতো না করে বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা সবাইকে জিম্মি করে রেখেছে কিছু কোম্পানি।’

মিরপুর-২ এলাকার অর্ণব জেনারেল স্টোরের দোকানি  মিজানুর রহমান বলেন, ‘আটার দাম বেড়ে গেছে। দোকানেও প্যাকেট আটা ৬-৭ পিস আছে। এখন ১ কেজির প্যাকেট ৬৫ টাকা এবং ২ কেজির প্যাকে ১৩০ টাকা বিক্রি করছি। কাল হয়তো আরও বেড়ে যেতে পারে।’ আটা নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আটার দাম বেশি তাই রাখি না। আবার কোম্পানিও ছোট দোকানে দিতে চায় না। কখন আসে বোঝা যায় না। এসে বড় দোকানগুলাতে আটার ১২-২৪ পিসের বস্তা দিয়ে চলে যায়। আমাদের দোকান ছোট বলে তাদের আগ্রহ কম।’ খোলা আটার দামই এখন প্যাকেটের আটার দামের সমান হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি উল্লেখ করেন, ৭০ টাকা কেজি চিনি এখন ১২০ টাকা বিক্রি করতে হচ্ছে। স্থানীয় বড় দোকান ‘গোল্ড স্টার বিপনী  বিতান’। সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু  তীর মার্কা ২ কেজি  আটার প্যাকেট রয়েছে। দাম ১৩০ টাকা। স্থানীয় কয়েকটি ছোট দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে দোকানে আটা রাখেন না। এ বিষয়ে ‘মায়ের দোয়া’ নামে এক দোকানের কর্মী বলেন, ‘পুঁজি কম। আটা রাখলে অনান্য জিনিস রাখার টাকা থাকে না৷’

রামপুরা কাঁচা বাজারের গলিতে ছয়টি মুদি দোকানের মধ্যে দু-একটি দোকান বাদে অধিকাংশ দোকানেই সংকট সয়াবিন তেলের। মাত্র একটি দোকানে ভোজ্যতেল পাওয়া গেলেও সেখানে বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে। নেই খোলা কোনও সয়াবিন বা পাম তেল।

মুদি দোকানিরা বলছেন, কয়েকদিন থেকে কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা আসছেন না। মাঝেমধ্যে এলেও কাঙ্ক্ষিত পণ্য দিতে পারছেন না। বিশেষ করে তেল দেওয়া প্রায় বন্ধ রেখেছে কোম্পানিগুলো।

বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে সয়াবিন তেল। কোথাও রূপচাঁদার ২ লিটারের তেলের বোতল ৩৬০ টাকা বিক্রি হতে দেখা গেছে, আবার কোথাও একই তেল ৩৮৪ টাকা। একই পরিমাণ তেল বসুন্ধরা ব্র্যান্ডের দাম ৪১০ টাকাও বিক্রি হতে দেখা গেছে। তীর ব্র্যান্ডের এক লিটার বোতলজাত তেল ১৭৮ টাকা, আবার কোথাও একই তেল ১৯২ টাকাও লেখা বোতলের গায়ে। ক্রেতাদের বড় দানার মসুর ডাল কিনতে কেজিতে ৫-১০ টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে বড় দানার মসুর ডালের কেজি ছিল ৯৮-১০৫ টাকা। আর চলতি সপ্তাহে তা বিক্রি হচ্ছে ১০৫-১১০ টাকায়।

এছাড়া এক মাস আগে দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ৪০-৪৫ টাকা। বর্তমানে ৫৫-৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আমদানি করা চীনা রসুনের দর বেড়ে প্রতি কেজি ১৩০-১৪০ টাকা হয়েছে। মাসখানেক আগেও দাম ছিল ১১০-১৩০ টাকা কেজি। আবার গত মাসে মানভেদে আদার কেজি ছিল ৯০-১৮০ টাকা। আর বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২০০ টাকা কেজি দরে।

অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত অক্টোবরে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে সাড়ে ৮ শতাংশ হয়েছে। অথচ গত এক মাসে দু-তিনটি ছাড়া বেশির ভাগ নিত্যপণ্যের দামই বেড়েছে। যদিও বিবিএসের কর্মকর্তাদের দাবি, অক্টোবরে চালের দাম কমেনি, আবার বৃদ্ধিও পায়নি। তবে ভোজ্যতেলের দাম কমেছে। চাল-তেলের মূল্যবৃদ্ধি না পাওয়ায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কম হয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, চালের দাম বাড়লে গরিব মানুষ মাছ-মাংস, ডাল, ফলমূলের মতো পুষ্টিকর খাবার খাওয়া কমিয়ে দেন। শাকসবজি খাওয়া বাড়িয়ে দেন তারা। আবার গরিব মানুষ যত খরচ করেন, তার এক-তৃতীয়াংশ খরচ হয় চাল কিনতে। তাই চালের দামের কমবেশি হলে তার প্রভাব গরিব মানুষের ওপর বেশি পড়ে।

গত মাসে প্রতি হালি ডিম ৪৭-৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৪৬ টাকায়। তা ছাড়া ব্রয়লার মুরগির দাম গত মাসে ছিল ১৭০-১৮০ টাকা কেজি। বর্তমানে  ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে  ১৬০-১৭০ টাকা কেজি দরে।

সর্বশেষ