দুশ্চিন্তা খাদ্য ও জ্বালানি খাতে

খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানি অগ্রাধিকারের নির্দেশ। মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনা। সরকারি পর্যায়ে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত মজুদ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ লাখ টনে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে এটা ছিল ২০ লাখ টন

চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দেশে সরকারি পর্যায়ে খাদ্য মজুদ ছিল ২০ লাখ ৭ হাজার টন। ৬ নভেম্বর পর্যন্ত এটা নেমে এসেছে ১৫ লাখ ৮১ হাজার টনে। গত বছরে নভেম্বরে মোটা চালের কেজি ছিল ৪৫-৪৮ টাকা। এখন ৫২-৫৫ টাকা। এর সঙ্গে মনিটরিং না থাকায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে মাছ, মাংস, শাকসবজি, বেকারি পণ্য, আটা-ময়দা, ভোজ্য তেলসহ সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম। তবে এর জন্য বৈশ্বিক প্রভাবও অনেকটা দায়ী। যার ফলে মানুষের জীবন ধারণের ব্যয় বেড়েছে। এ ছাড়া সব ধরনের জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। অথচ শিল্প ও আবাসিক উভয় খাতেই কমেছে গ্যাসের চাপ। ফলে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। এ ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খাতের খরচ বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। উৎপাদন খরচও বেড়েছে তরতর করে। আসছে বছরে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক।

দুশ্চিন্তা খাদ্য ও জ্বালানি খাতে

 

ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য সংকট চলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সারা বিশ্বকে অনিবার্য এক সংকটের দিকেই ঠেলে দিয়েছে। ফলে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রবিবার গণভবনে দেশের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে সংশ্লিষ্ট দফতর ও মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে বৈঠক করে এসব নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া ২০২৪ সালের শুরুতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তারও একটা প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও খাদ্যশৃঙ্খলের ওপর। তাই সামনের দিনগুলোয় মানুষের খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি আমন মৌসুমে ধানের দাম কেজিতে ১ টাকা ও চালের দাম ২ টাকা বাড়িয়ে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। এবার সরকারিভাবে সারা দেশের কৃষক ও চালকল মালিকদের কাছ থেকে মোট ৩ লাখ টন ধান ও ৫ লাখ টন সিদ্ধ চাল কেনা হবে। গত বছরের আমন মৌসুমে ২৭ টাকা  কেজি দরে ধান ও ৪০ টাকা কেজি দরে চাল সংগ্রহ করেছিল সরকার। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, চলতি বছর আমন ধানের সরকারি ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ২৮ টাকা এবং চালের মূল্য প্রতি কেজি ৪২ টাকা। এ লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন। 

এদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আসছে ২০২৩ সালে ৫৪ লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। এর মধ্যে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত দুই ধরনেরই তেল রয়েছে। এ তেল আমদানি করা হবে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি); যা ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে জিটুজি ভিত্তিতে ৩৮ লাখ ৬০ হাজার টন পরিশোধিত তেল আমদানি করা হবে। আর সৌদি আরবের আরামকো ও আবুধাবির এডিএনওসি থেকে ১৬ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম)। ডলার সংকটের কারণে সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়ে আসছে। দেশের খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য ও জ্বালানি আমদানিকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে এলসি খোলার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

বিপিসির তথ্যানুযায়ী, বছরে দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। মোট চাহিদার ৯০ শতাংশই আমদানি করা হয়। আর দেশে জ্বালানি তেলের মোট বার্ষিক ব্যবহারের ৬৩ শতাংশই ব্যবহার হয় পরিবহন খাতে, বাকিটা সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে। চলতি ২০২২ বছরের জানুয়ারি-জুনের মধ্যে বিপিসি ৭ লাখ ৯১ হাজার টন অপরিশোধিত তেল ও ২৭ লাখ ৯০ হাজার টন পরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। পরিশোধিত তেলের মধ্যে আছে ডিজেল, জেট ফুয়েল, অকটেন ও ফার্নেস।

এদিকে খাদ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরে দেশে ৪ কোটি ২৭ লাখ টন চাল ও গম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ লাখ টন আউশ, ১ কোটি ৬৪ লাখ টন আমন, ২ কোটি ১৫ লাখ টন বোরো ও ১১ লাখ ৬০ হাজার টন গম। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদন হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে আরও উদ্বৃত্ত থাকবে। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কিছুটা কমতে পারে। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ তাদের এক প্রতিবেদনে আগাম পূর্বাভাস দিয়েছে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপীই বৈশ্বিক সংকট ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে খাদ্য উৎপাদন কমার পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকও। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সার, সেচের জন্য জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে কৃষির উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তারও একটা প্রভাব রয়েছে। এমনকি খাদ্যের চাহিদা ও লোকসংখ্যার হিসাবের মধ্যে কিছুটা গরমিল থাকায় খাদ্যেও সঠিক চাহিদা নিরূপণ করা যায় না। ফলে এখানেও এক ধরনের ঘাটতি বিরাজ করে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে এটাকেও এক ধরনের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন খাদ্য অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালনক সারোয়ার মাহমুদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির জায়গা হলো বেশির ভাগ মানুষই তাদের বার্ষিক খাদ্য চাহিদার সিংহভাগ নিজেরাই নিজেদের ঘরে মজুদ করেন। সরকারকে শুধু আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য খাদ্য মজুদ রাখতে হয়।

সর্বশেষ