খেলাপি ঋণ-অর্থ পাচারে উদ্বেগ আইএমএফ’র

মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত নিয়ে আইএমএফের উদ্বেগ

বাংলাদেশের তফশিলি ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিএআর) আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে বলে ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ) সরকারকে দেওয়া এক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে। আন্তর্জাতিক ঋণদাতা এই সংস্থাটি বলছে, কভিড সংকটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের নীতি সহায়তা দিলেও কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বেড়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সিএআর কমে যাওয়ার বিষয়টি এর মধ্যে একটি বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশ ম্যাক্রোপ্রুডেনশিয়াল স্ট্রেস টেস্টিং শীর্ষক আইএমএফের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তফশিলি ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত বা ক্যাপিটাল এডিকোয়াসি রেশিও ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংকগুলোর সিএআর কমেছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

সুরক্ষা কমছে ব্যাংক আমানতকারীদের

 

ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের যে কোনো ব্যাংকের মূলধনের পরিমাপক হলো মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত বা সিএআর। এ অনুপাতকে আমানতকারীদের সুরক্ষা, ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা পরিমাপের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে কোনো ব্যাংকের সিএআর কমে যাওয়া মানে ওই ব্যাংকের আমানতকারীদের ঝুঁকির মধ্যে পড়া। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি খাতের ১৪ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। সূত্র মতে, করোনা মহামারিতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া, বেশি সুদে তহবিল নিয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়া, ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও নামে-বেনামে পরিচালকদের ঋণ নেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাতের দিক থেকে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো উন্নত দেশগুলোর ব্যাংকের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর  চেয়েও পিছিয়ে আছে দেশের ব্যাংকিং খাত। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী, ২০১৯ সাল শেষে (ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়নের শেষ বছর) দেশের ব্যাংকিং খাতের সিএআর হওয়ার কথা সাড়ে ১২ শতাংশ। বাংলাদেশে এটি ছিল ১১ শতাংশের কাছাকাছি। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে এ অনুপাত ছিল ১৭, শ্রীলঙ্কায় ১৬ দশমিক ৫০ এবং ভারতে ছিল ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যাংকিং রীতি অনুযায়ী ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বর্তমান নিয়মে ব্যাংকগুলোকে ৪০০ কোটি টাকা অথবা ঝুঁঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশের মধ্যে যা বেশি সেই পরিমাণ অর্থ ন্যূনতম মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। এর বাইরে আপৎকালীন সুরক্ষা সঞ্চয় হিসেবে ব্যাংকগুলোকে ২০১৬ সাল থেকে অতিরিক্ত মূলধন রাখতে হচ্ছে। কিন্তু দেশের এক পঞ্চমাংশ ব্যাংক এক্ষেত্রে রীতি মেনে পর্যাপ্ত মূলধন রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আইএমএফ প্রতিবেদনে মূলধন পর্যাপ্ততা কমার যে হার দেওয়া হয়েছে, সেটি হয়তো সব ব্যাংকের সমহারে কমেনি। কিছু ব্যাংকের বেশি কমেছে, কিছু ব্যাংক ভালো অবস্থায় আছে। তবে যে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা কমে যায়, সেখানে আমানতকারীদের ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সাবেক গভর্নর বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে তারা ভালো ব্যবসা করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সিএআর রেশিও বা মূলধন পর্যাপ্ততা কমে যায়। যে ব্যাংকগুলোর সিএআর আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে, সেগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে রেখে মূলধন বাড়ানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত  কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।

সর্বশেষ