নিত্যপণ্যের মূল্য সপ্তাহে বাড়ছে ৩ শতাংশ

সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে মানুষ । কেউ কমিয়েছে খাওয়ার পরিমাণ । একই বিনিয়োগে কম মাল পাচ্ছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা

মূল্যস্ফীতির চাপে দিশাহারা মানুষ। আয় না বাড়লেও বাড়ছে ব্যয়। এক মাস আগে যেসব পণ্য কিনতে খরচ হতো ১০ হাজার টাকা, বর্তমানে একই পণ্য কিনতে লাগছে ১১ হাজার টাকার বেশি। গড়ে প্রতি সপ্তাহে ৩ শতাংশের মতো দাম বাড়ছে নিত্যপণ্যের। এক সপ্তাহে আটা, চিনির দাম বাড়লে পরের সপ্তাহে বাড়ছে বিস্কুট, চানাচুরের। চালের উচ্চমূল্য কয়েক মাস ধরে বজায় রয়েছে। ডিম, সবজি, মাছ, মাংস, শিশুখাদ্য, সাবান-শ্যাম্পু, তেল, টুথপেস্ট- সবকিছুর দাম বেড়েই চলেছে। বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে খাওয়া কমাচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষ।

নিত্যপণ্যের মূল্য সপ্তাহে বাড়ছে ৩ শতাংশ

 

ঊর্ধ্বমুখী বাজারে আয়ের সঙ্গে সংসার খরচের সমন্বয় রাখতে অনেকেই এখন নিয়মিত মাসের হিসাব রাখতে শুরু করেছেন। রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার এমনই একজন সাখাওয়াত হোসেন। বেতন পান ৪০ হাজারের মতো। ভালোই চলছিল সংসার। কখনো হিসাব করেননি। গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত হিসাব রাখতে শুরু করেছেন। খরচের হিসাব দেখিয়ে তিনি বলেন, প্রতি মাসে বেতন পেলেই মাসের অতি প্রয়োজনীয় পণ্যগুলো কিনে ফেলি। গত মাসে ২০ কেজি মিনিকেট চাল, দুই কেজি মসুর ডাল, দুই লিটার সয়াবিন তেল, চার কেজি ব্রয়লার মুরগি, দুই কেজি তেলাপিয়া মাছ, দুই কেজি সাগরের মাছ, এক কেজি গুঁড়ো দুধ, ১০০ গ্রাম  টুথপেস্ট, এক কেজি গুঁড়া সাবান, দুটা কাপড় কাচার বল সাবান, দুটা গায়ে ব্যবহারের সাবান, তিন ডজন ডিম, ৫০০ মিলি ডিসওয়াশ, এক বোতল নারকেল তেল, দুই কেজি চিনি, এক বোতল শ্যাম্পু, তিন কেজি পিঁয়াজ, এক কেজি রসুন কিনতে খরচ হয়েছিল ৫ হাজার ৮৩৮ টাকা। এ মাসে একই পণ্য কিনতে খরচ হয়েছে ৬ হাজার ৬৫৮ টাকা। বেশি লেগেছে ৮৪০ টাকা। এগুলোর মধ্যে শুধু মসুরের ডাল ও সয়াবিন তেলের দাম কিছুটা কমেছে। কেজিতে চালের দাম পাঁচ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ৪০ টাকা, তেলাপিয়া মাছ ৪০ টাকা, সাগরের নারকোলি মাছ ৬০ টাকা, গুঁড়া দুধ ৭০ টাকা, গুঁড়া সাবান ৫০ টাকা, চিনি ২০ টাকা, পিঁয়াজ ২০ টাকা, রসুন ১০ টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া ১৮ টাকা দামের বল সাবানের দাম ২৪ টাকা, ডিমের ডজন ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকা, ১৩৫ টাকার নারকেল তেলের বোতলের দাম ১৪৫ টাকা, ২০০ টাকার শ্যাম্পু ২৩০ টাকা হয়েছে। ডায়াপারের দাম প্রতি প্যাকেটে বেড়েছে ৪০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত। খরচ সামলাতে গরুর তরল দুধ রাখা বন্ধ করে দিয়েছি। এ ছাড়া বাজারে সব ধরনের বিস্কুট, চানাচুর, পাউরুটি, নুডলসের দাম বেড়েছে। সাখাওয়াত হোসেনের বাজারের হিসাব থেকে দেখা যায়, এক মাসের ব্যবধানে গড় খরচ বেড়েছে ১৪ শতাংশের ওপরে। প্রতি সপ্তাহে বেড়েছে প্রায় ৩.৫০ শতাংশ। একই এলাকার মুদি দোকানদার আলমগীর হোসেন বলেন, কিছু বিস্কুটে প্যাকেটের দাম বেড়েছে। কোনোটির ভিতরে বিস্কুটের ওজন কমে গেছে। প্রতি সপ্তাহে কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ছে। ক্রেতারা মনে করে আমরা বাড়াচ্ছি। অথচ, দাম বাড়ায় আমাদের মতো ছোট খুচরা ব্যবসায়ীরাও বিপদে আছে। একই পণ্যের জন্য বেশি টাকা বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। আবার কমিশনও কমে গেছে অনেক পণ্যে। এদিকে সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে পণ্যের মূল্য সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন দেশের পণ্যমূল্য তুলে ধরে বলা হয়, আধা কেজি পাউরুটির দাম পাকিস্তানে ৪৫ টাকা; ভারত ও নেপালে ৪৮ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ৫০ টাকা, যা বাংলাদেশে ৬২ টাকা। এ ছাড়া দেশে বর্তমানে ১ কেজি গরুর মাংস কিনতে গুণতে হয় অন্তত ৬৮৪ টাকা, যা দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলে সর্বোচ্চ। তাছাড়া, বিশ্বব্যাপী গরুর মাংসের গড় দামের (৫৪৯ টাকা) চেয়েও বেশি এটি। সংস্থাটি আরও জানায়, চলতি অক্টোবরে মাছ-মাংস না খেয়েও ঢাকা শহরের চার সদস্যের এক পরিবারের খাবার কিনতে মাসিক খরচ গড়ে ৯ হাজার ৫৯ টাকা। মাছ-মাংস খেলে খরচ হয় ২২ হাজার ৪২১ টাকা। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা শহরের একটি পরিবার মাছ-মাংস খেলে খাবারে খরচ হতো ১৭ হাজার ৫৩০ টাকা। আর মাছ-মাংস না খেলে এ খরচ ছিল ৬ হাজার ৫৪১ টাকা। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলমান মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ ভয়াবহ সমস্যায় পড়েছে। এদিকে, গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস ২০২২-এ বাংলাদেশকে খাদ্য সংকটে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপে অনেক মানুষই এখন সঞ্চয় ভেঙে খাওয়া শুরু করেছেন। নতুন করে সঞ্চয়পত্র বিক্রিও কমে গেছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের সঞ্চয়পত্র বিক্রির তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে মাত্র ৮ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। গত বছরের আগস্টে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬২৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে ঋণ নিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন অনেক মানুষ।

সর্বশেষ