ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের আঘাত ৩৫ প্রাণহানি, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

তবে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে বড় কোনো বিপর্যয়ের খবর পাওয়া যায়নি। দেশের উপকূলীয় তিন বিমানবন্দরে বিমান চলাচল আবার শুরু হয়েছে।

তিনটি মহাসড়কেও সোমবার রাতে কয়েক ঘণ্টা থেমে থাকার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। এদিকে উপকূলের কিছু স্থানে বেড়িবাঁধে ক্ষয়ক্ষতির কিছু খবর পাওয়া গেছে।

সিত্রাং নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দেশের ৪১৯টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ইউনিয়নে আনুমানিক ১০ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ৬ হাজার হেক্টর ফসলের জমি নষ্ট হয়েছে এবং ১ হাজার মাছের ঘের ভেসে গেছে।

৩৫ প্রাণহানি, ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রকৃত ক্ষতির প্রতিবেদন পেতে ৭ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগবে।

এদিকে সচিবালয়ে অপর এক ব্রিফিংয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনো ৮০ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। এর মধ্যে ৬০ লাখ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের গ্রাহক। আজ বুধবারের মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন নসরুল হামিদ।

গাছচাপায় মৃত্যু বেশি

ঘূর্ণিঝড়ে গতকাল পর্যন্ত ৩৫ জনের প্রাণহানি হয়েছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপকূলের সন্দ্বীপ চ্যানেলে বালু তোলার ড্রেজার ডুবে আট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ঝড়ের প্রভাবে সোমবার রাতে উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরের ৩ নম্বর জেটি এলাকার পশ্চিমে এ ড্রেজারডুবির ঘটনা ঘটে। মারা যাওয়া শ্রমিকদের সবার বাড়ি পটুয়াখালী সদর উপজেলার জৈনকাঠী এলাকায়।

ভোলায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার রাতে গাছের চাপায় মারা যান বিবি খাদিজা (৬৮)। চরফ্যাশনে গাছের ডাল পড়ে ঘটনাস্থলে মারা যান স্বর্ণ ব্যবসায়ী মাইনুদ্দিন (৪৫)। এ ছাড়া ঘরচাপায় ভোলা চেউয়াখালী গ্রামের মফিজুল ইসলাম (৭০) ও পানিতে ডুবে লালমোহনের ফাতেমাবাদ গ্রামের ফরিদুল ইসলামের স্ত্রী রাবেয়া বেগম (২৫) মারা যান।

টাঙ্গাইলেও চারজন মারা গেছেন। মধুপুরে ঝড়বৃষ্টির সময় মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় পুলিশের দুই কনস্টেবল ও এক আসামি নিহত হয়েছেন। নিহতেরা হলেন পুলিশের কনস্টেবল নুরুল ইসলাম ও মো. সোহেল এবং আসামি লালন। আর বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা যান টাঙ্গাইল শহরের সাবালিয়া পাঞ্জাপাড়া এলাকার শরীফ ফকির।

এ ছাড়া ঝড়ের সময় গাছচাপায় নড়াইলের লোহাগড়ায় এক নারী, বরগুনায় এক নারী, কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে শিশুসন্তানসহ স্বামী–স্ত্রী, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দুই নারী, নোয়াখালীতে এক শিশু, শরীয়তপুরে এক নারী, মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে মা–মেয়ে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন নিহত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জে নৌকা ডুবে মা–ছেলে, পটুয়াখালীতে ট্রলার ডুবে এক শ্রমিক, গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক শিশু ঘরচাপায় এবং কক্সবাজারের টেকনাফে পানিতে ডুবে এক রোহিঙ্গা ও এক শিশু নিহত হয়েছে।

ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি

ভোলার সাগরমোহনার ইউনিয়নগুলোতে সোমবার রাতের জোয়ারে প্রায় ১০ ফুট পানি উঠেছে। অনেক এলাকায় বাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। ঝড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮৯০টি ঘর আংশিক ও ১ হাজার ৪৩৩টি ঘর বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচরের ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম হাওলাদার জানিয়েছেন, এ ইউনিয়নে কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নেই। মানুষজন পুলিশ ফাঁড়ি, কোস্ট ফাউন্ডেশন ও বন বিভাগের ভবনে গাদাগাদি করে রাত কাটিয়েছেন।

বরগুনায় ৯৭২টি ঘর আশিংক ও ৬৮টি বসতঘর সম্পূর্ণ বিধস্ত হয়েছে। বরগুনা সদর উপজেলার গৌরিচন্না ইউনিয়নের সোনার বাংলা গ্রামের আবু হানিফ বলেন, ‘বইন্নায় মোগো ঘরের হক্কল দিকে পানিতে ডুইব্যা গ্যাছে। ঘর হইতে বাইরে হইতে হইলে এখন ক্যালাগাছে ভোর খিলাইতে হইব।’

ঝড়ে নুইয়ে পড়া ধানগাছ সোজা করে বেঁধে দিচ্ছেন কৃষক কৈলাস চন্দ্র দাস। গতকাল সকালে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার গন্ডগ্রামে

ঝড়ে নুইয়ে পড়া ধানগাছ সোজা করে বেঁধে দিচ্ছেন কৃষক কৈলাস চন্দ্র দাস। গতকাল সকালে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার গন্ডগ্রামে

পিরোজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল বারী জানিয়েছেন, মৎস্য বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যে জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৪১৯ জন মৎস্যচাষির ঘের ও পুকুরের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ঝোড়ো হাওয়ায় শরীয়তপুরে ৬ হাজার ৮৪৬ হেক্টর জমির ফসল নুইয়ে পড়েছে। শীতকালীন আগাম জাতের সবজি, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, পান ও রবিশস্যের ক্ষতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন গ্রামে ৯৩০টি বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।

ঋণ করে দুই বিঘা জমিতে লালশাকের আবাদ করেছিলেন শরীয়তপুরের জাজিরার লাউখোলা এলাকার কৃষক দেলোয়ার হোসেন। সিত্রাংয়ের প্রভাবে টানা ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিতে লালশাকের জমি তলিয়ে শাক নষ্ট হয়ে যায়। এখন ঋণ শোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন এই চাষি।

নোয়াখালীতে পাঁচটি উপজেলায় কমপক্ষে ১ হাজার ৩০৩টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে হাতিয়ার ৪৪০টি বাড়িঘর। খুলনায় ১ হাজার ৬০০ ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর জলোচ্ছ্বাস না হওয়ায় ও কোথাও বেড়িবাঁধ ভাঙার খবর পাওয়া যায়নি। ক্ষতির হাত থেকে বেঁচেছে মাছের ঘের ও জমির ফসল।

কয়েক লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন

ঘূর্ণিঝড় চলার সময় প্রবল বাতাসে বিদ্যুতের অনেক খুঁটির ওপর গাছ ভেঙে পড়ে। এতে অনেক স্থানে আগুন লেগে যায়। রাজধানীতে ১৭টি স্থানে এমন আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। রাজধানীতে পড়ে যাওয়া গাছের মধ্যে অনেক স্থানে সড়ক বিভাজকের গাছ উপড়ে পড়ে। ধানমন্ডির ১১ নম্বরে একটি গাছ পড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে যায়। বেলা ১১টার দিকে সেখানে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে বিদ্যুতের খুঁটিটি সরান।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সূত্র জানায়, দেশের ৩২৯টি জায়গা থেকে তারা গাছ অপসারণ করেছে। এর মধ্যে রাজধানীর ৪৭টি স্থান থেকে গাছ অপসারণ করা হয়।

ঝোড়ো হাওয়া ও প্রবল বর্ষণে বরিশাল বিভাগে পল্লী বিদ্যুতের (আইবি) অন্তত ১৫ লাখ গ্রাহক গতকাল রাত আটটায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন ছিলেন। সরবরাহ লাইনে প্রচুর গাছ উপড়ে পড়ার কারণে বিভাগের সব কটি জেলায় পল্লী বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে পল্লী বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

আরইবির বিভাগীয় কর্মকর্তারা জানান, সরবরাহ লাইন সচল করার কাজ চলছে। তবে বিভাগের পুরো বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সচল করতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।

বরগুনার খাজুরতলা গ্রামের গ্রাহক খলিলুর রহমান বলেন, ‘তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নাই। আমরা অন্ধকারে আছি। ঝড়ের চেয়ে এতে ভোগান্তি আরও বেশি।’

ঝড়ে নোয়াখালীর অধিকাংশ এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। গতকাল দুপুরের দিকে জেলা শহর মাইজদীর কিছু অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও উপজেলাগুলোয় এখনো বিদ্যুৎ নেই। এর মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকার অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। পল্লী বিদ্যুতের লাইনের কমপক্ষে ৩৩টি খুঁটি ভেঙে পড়েছে। এ ছাড়া দুই শতাধিক স্থানে বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি স্থানে ৩৩ কেভিএ ও ১১ হাজার কেভিএ বিদ্যুতের লাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যোগাযোগব্যবস্থা সচল

২১ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর গতকাল দুপুর ১২টায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কক্সবাজার ও বরিশাল বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানায়। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে উপকূলীয় এলাকায় তিন বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট ওঠানামা ২১ ঘণ্টা বন্ধ ছিল।

ঝড়ের কারণে গত সোমবার রাতে তিনটি মহাসড়কে কয়েক ঘণ্টার জন্য যান চলাচল বন্ধ ছিল। মহাসড়কগুলোর নানা স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা–খুলনা ও ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কে সাড়ে ৬ ঘণ্টা এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৩ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।

ঝড়ের কারণে সাগরে পাঠিয়ে দেওয়া পণ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ফেরত আনা হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে চারটি জাহাজ জেটিতে আনা হয়েছে। জাহাজে পণ্য ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বন্দর চত্বর থেকেও পণ্য খালাস শুরু হয়েছে।

জানতে চাইলে বন্দরসচিব মো. ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বন্দরে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। জেটিতে জাহাজ ফেরত আনা হচ্ছে। বন্দরে সব কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

বেড়িবাঁধের ক্ষতি

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে পটুয়াখালী ও সাতক্ষীরায় বেড়িবাঁধের কিছু ক্ষতি হয়েছে।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের ১০০ মিটার সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পটুয়াখালী কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় মোট বাঁধ রয়েছে ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২১ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ আছে, যা মেরামতের কাজ চলছিল, তা আরও ক্ষতির মুখে পড়ল।

মির্জাগঞ্জ উপজেলার ডাকুয়া ইউপির চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ দাস জানান, ঝড়ে বাঁধ আরও ভেঙেছে। জরুরি মেরামত না করলে যেকোনো সময় জোয়ারের পানির চাপে ভেঙে যেতে পারে।

সিত্রাংয়ের আঘাতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বেড়িবাঁধের সাতটি স্থানে ধস নেমেছে। এসব বাঁধের কয়েক ফুট করে পাশের নদীতে ধসে যাওয়ায় স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

পাউবো-২ শ্যামনগরের দায়িত্বরত উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ রানা জানান, তাঁরা ধসে যাওয়া বাঁধের বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেছেন। আজ বুধবার থেকে ওই সব এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধে কাজ শুরু করা হবে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]

সর্বশেষ