খেলাপির ৬২.৫ শতাংশই শীর্ষ ১০ ব্যাংকে মূল্যস্ফীতিতে আর্থিক খাতে অস্থিরতা

 

নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতির চাপে আর্থিক খাতে অস্থিরতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থায় ঝুঁকি বেড়েছে। ব্যাংকের আয় ও আমানত কমেছে। কিছু ব্যাংকের মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি খাতে মাত্রাতিরিক্ত স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধনের পতন, ঋণ মানের অবনতিতে ঝুঁকির মাত্রা বেড়েছে।

সোমবার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা রিপোর্ট ২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের আর্থিক খাত সম্পর্কে এসব আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে ওই বছরের আর্থিক খাতের ঝুঁকিগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

খেলাপী

 

সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ডিসেম্বরের পর দেশের আর্থিক খাতের সার্বিক পরিস্থিতিতে আরও অবনতি ঘটেছে। খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ডলার সংকটে ব্যাংকগুলোতে নাভিশ্বাস উঠেছে। আমানত প্রবাহ আরও কমেছে। রেমিট্যান্স নিুমুখী। ডলারের দাম বেড়েছে। আয় কমেছে। সব মিলে আর্থিক খাত গত নয় মাসে আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে আর্থিক খাতে বড় ঝুঁকি নেই। যেগুলো আছে সেগুলো ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক পদক্ষেপ নিয়েছে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা ও ঝুঁকির মাত্রা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রতি তিন মাস পরপর আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বছরে একবার প্রকাশ করা হয় আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন। ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনটি সাধারণত একটি প্রান্তিক শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে আগে প্রকাশ করা হতো। এখন পর্যন্ত এপ্রিল জুন প্রান্তিকের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। যদিও ইতিমধ্যে প্রান্তিক শেষ হওয়ার সাড়ে তিন মাস চলে গেছে। বার্ষিক আর্থিক স্তিতিশীলতা প্রতিবেদনটি বছর শেষে হওয়ার তিন মাসের মধ্যে আগে প্রকাশ করা হতো। এবার সাড়ে নয় মাস পর প্রকাশ করা হলো।

দেশে ও বৈশ্বিকভাবে আর্থিক খাতের ঝুঁকি বাড়ায় প্রতিবেদনটি প্রকাশ করতে দেরি হচ্ছে কিনা-এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোনো কথা বলতে চাননি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যস্ফীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ বাড়ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আর্থিক বাজারে। টাকার মান কমে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর সম্পদও কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির কারণে আয় কমে গেছে ও আমানত কমার মুখে পড়েছে ব্যাংকগুলো। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট হওয়ায় ডলারের বিপরীতে টাকার মানও কমে যাচ্ছে। এর প্রভাবে আর্থিক খাত অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছে। আগামীতে এই অস্থিরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা কম থাকায় মধ্যমেয়াদি আর্থিক খাতে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। কেননা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারী ঝুঁকি নেবেন না। বিদেশে পণ্যমূল্য বাড়ায় এবং টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ায় আমদানিজনিত কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বেড়েছে। যা আগামী ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিকভাবে গত বছর আর্থিক খাত ঝুঁকিতে ছিল। এর প্রভাবও বাংলাদেশে পড়েছে। বৈদেশক মুদ্রার চলতি হিসাবের অব্যাহতভাবে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক খাতে চাপ বেড়েছে। এজন্য আর্থিক খাত মাঝারি ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। বৈদেশিক ঋণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে বেশ হারে। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এ ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। যা ভবিষ্যতে উদ্যোক্তাদের পুঁজির মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ পুঁজিতে ক্ষয় দেখা দিতে পারে। এটি হলে তা হবে বড় উদ্বেগের কারণ।

২০২১ সালে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। গত বছর তা বেড়ে ৯ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণ বেড়েছে ৬৪ দশমকি ৬ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বেড়েছে ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। স্বল্পমেয়াদি ঋণ বেশি বাড়ায় ঝুঁকির মাত্রাও বেড়েছে। কেননা এগুলো পরিশোধ করতে হয় স্বল্পসময়ে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে।

২০২১ সালে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের মধ্যে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশই ছিল বেসরকারি খাতের। বেসরকারি খাতে এ ঋণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ায় আর্থিক খাত উচ্চ ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর আকস্মিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদিও বাংলাদেশ পর্যাপ্ত পরিমাণ বৈদেশিক রিজার্ভ সংরক্ষণ করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে রিজার্ভ ৩ হাজার ৬৩৩ কোটি ডলার। নিট রিজার্ভ ৩ হাজার কোটি ডলারের নিচে। যা দিয়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আইএমএফ মনে করে, বিদ্যমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রিজার্ভ আরও বাড়ানো উচিত। কমপক্ষে ৫ মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান রিজার্ভ থাকা উচিত।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তুলনামূলকভাবে কম খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু ব্যাংকিং খাতে ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। এতে আর্থিক খাতের সম্পদের মান খারাপ হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণ নবায়নের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ব্যাংকিং খাতে সম্পদ ও খেলাপি ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। এতে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়েছে। ঋণের প্রবাহ কয়েকটি ব্যাংকে বেশি। যে কারণে এসব ব্যাংকের কারণেই ঝুঁকির মাত্রাও বেশি। শীর্ষ ৫ ব্যাংকের কারণে ঋণ ঝুঁকি বেড়েছে সাড়ে ২৫ শতাংশ। শীর্ষ ১০ ব্যাংকের কারণে ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ।

শীর্ষ ৫ ব্যাংকের কারণে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি বেড়েছে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। শীর্ষ ১০ ব্যাংকের কারেন এ ঝুঁকি সাড়ে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। কেননা এসব ব্যাংকের সার্বিকভাবে ব্যবস্থাপনার মানে অবনতি হয়েছে। যে কারণে ঝুঁকি বেড়েছে। আমানতের মধ্যে বেশিরভাগই সংগ্রহ করে বড় কয়েকটি ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের অর্ধেক সংগ্রহ করে শীর্ষ ১০ ব্যাংক। বাকি ৫২ ব্যাংক সংগ্রহ করে অর্ধেক। খেলাপি ঋণের দিক থেকেও কয়েকটি ব্যাংকে ঝুঁকির মাত্রা বেশি। মোট খেলাপি ঋণের সাড়ে ৬২ শতাংশই রয়েছে শীর্ষ ১০ ব্যাংকে। বাকি ৫২ ব্যাংকে সাড়ে ৩৭ শতাংশ। ফলে এসব ব্যাংকের কারণে ঝুঁকির মাত্রাও বেড়েছে। শীর্ষ ৫ ব্যাংকের সুদের হারজনিত ঝুঁকি ৬২ দশমিক ২ শতাংশ, শীর্ষ ১০ ব্যাংকে এ ঝুঁকি ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি শীর্ষ ৬ ব্যাংকে সাড়ে ৩৫ শতাংশ, শীর্ষ ১০ ব্যাংকে ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ। সম্পদের দিক থেকে ৩১ দশমিক ৪ শতাংশই শীর্ষ ৫ ব্যাংকে। অন্যান্য ব্যাংকে ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ। শীর্ষ ১০ ব্যাংকে সম্পদ ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ, অন্যান্য ব্যাংকে ৫৪ দশমিক শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গত বছর ছিল বেশকিছু উদ্বেগের কারণ। এদের সম্পদ কমেছে, আমানত কমেছে। বেড়েছে খেলাপি ঋণ। ঋণ আদায়ও কমেছে। তাদের জন্য সম্পদের গুণগত মান একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ