হুংকার দিয়ে আর লাভ হবে না: ফখরুল

 

 

পথে পথে বাধা ও পরিবহন সংকটের কারণে নৌকা-ট্রলারে ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে ময়মনসিংহের গণসমাবেশে অংশ নিয়েছেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। গতকাল শনিবারের এই কর্মসূচিকে ঘিরে দুই দিনের উত্তেজনার মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁদের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষও হয়েছে।

সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, গণতন্ত্রের নামে সরকারকে একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে দেওয়া হবে না। দেশের মানুষ এখন জেগেছে।

তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত আন্দোলনের যে জোয়ার উঠেছে, সেই জোয়ারে আওয়ামী লীগ ভেসে যাবে।

 

গতকাল বিকেলে স্থানীয় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠে বিভাগীয় গণসমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়, জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের kalerkanthoমূল্যবৃদ্ধি এবং চলমান আন্দোলনে বিএনপির চার কর্মী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সম্মানে একটি চেয়ার খালি রাখা হয়।

 

নৌকা-ট্রলারে এসে সমাবেশ করলেন বিএনপিকর্মীরা

ময়মনসিংহে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠে গতকাল বিএনপির সমাবেশে বক্তব্য দেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির মহাসচিব বলেন, এক হাজার ৩৮০টি সিসি ক্যামেরা ছিল। নিরাপত্তাব্যবস্থাও নাকি পর্যাপ্ত ছিল। পুলিশ-র‌্যাব পাহারায় ছিল। তার পরও নির্বাচন দুপুরের মধ্যে বন্ধ ঘোষণা করতে হয়েছে। এ থেকেই প্রমাণ হয়, দলীয় সরকারের অধীনে কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই এ সরকারকে বিদায় করে নির্দলীয় সরকারের দাবি পূরণ করতে হবে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন গঠনের পর নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে।

পথে পথে নেতাকর্মীদের বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ককটেল, গুলি, লাঠিসোঁটা ও মোটরসাইকেলের মহড়া উপেক্ষা করে নেতাকর্মী সমাবেশে এসেছেন। ঢাকা থেকে আসার পথে গাজীপুর পার হতেই মহাসড়ক যানশূন্য ছিল, যেন হরতাল বা কারফিউ চলছে। তিনি বলেন, গত শুক্রবার রাত থেকেই বিএনপির বিভিন্ন জেলার অনেক নেতাকর্মী সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয়ে সেখানে রাত কাটান। দুই দিন ধরে মহানগর আওয়ামী লীগ নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের ঠেকানোর নামে মাঠে ছিল।

মহানগর বিএনপি আহ্বায়ক শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্ব এবং মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু ওয়াহাব আকন্দ ও উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদারের পরিচালনায় বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, কেন্দ্রীয় নেতা মশিউর রহমান, কায়সার কামাল, এমরান সালেহ প্রিন্স প্রমুখ।

বর্তমান সরকারের আমলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল, তারা ১০ টাকা কেজি দরে চল খাওয়াবে। সেই চলের দাম এখন ৯০ টাকা হয়েছে। তারা বলেছিল, ঘরে ঘরে চাকরি দেবে; এখন চাকরি পেতে হলে আওয়ামী লীগের লোকজন ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেয়।

ট্রলার ও নৌকায় চড়ে সমাবেশে

ময়মনসিংহের সঙ্গে আশপাশের জেলার যান চলাচল বন্ধ থাকায় নদীপথে সমাবেশে অংশ নেন নেতাকর্মীরা। কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, ময়মনসিংহ এবং আশপাশের এলাকা থেকে ট্রলার ও নৌকায় চড়ে সমাবেশে যোগ দিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। নৌপথে ট্রলার ও নৌকায় করে ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে নেতাকর্মীদের কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে। একই দৃশ্য দেখা যায় নান্দাইল, গফরগাঁও ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী কিশোরগঞ্জ পাকুন্দিয়া হোসেনপুর উপজেলার আশপাশের এলাকা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে নৌকা ও ট্রলারে করে ময়মনসিংহে এসেছেন নেতাকর্মীরা। ট্রলার ও নৌকায় নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতে দিতে নদী পার হন। নান্দাইল উপজেলার চরভেলামারী বালিপাড়া সেতুর নিচ দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ পার হন সেখানকার নেতাকর্মীরা। নদীর ঘাট পর্যন্ত আসতেও নেতাকর্মীদের দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। কেউ কেউ কয়েকবার যান পরিবর্তন করে নদী ঘাটে আসেন।

শেরপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এ বি এম মামুনুর রশীদ পলাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, গণপরিবহন না থাকায় সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অন্তত ৩০টি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নেতাকর্মীরা ময়মনসিংহে যান।

ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া

বিকেলের দিকে রেলস্টেশন এলাকায় আওয়ামী লীগ বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ির ঘটনায় পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। দুই পক্ষের ইটপাটকেল নিক্ষেপের মধ্যে পড়ে এক পুলিশ সদস্য ও নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মাসুমসহ চারজন আহত হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, আওয়ামী লীগ রেলওয়ে কৃষ্ণচূড়া চত্বরে ‘সতর্ক’ সমাবেশ করে। বিকেল ৪টার দিকে দলীয় নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হতে থাকেন। বিএনপির নেতাকর্মীরা সমাবেশ থেকে ট্রেনে বাড়ি যাওয়ার জন্য স্টেশনে যাওয়ার পথে দুই দলের কর্মীরা সংঘর্ষে জড়ান।

ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা তাঁদের ওপর এই হামলা চালিয়েছেন। ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আবু ওহাব আকন্দ বলেন, তাঁদের নেতাকর্মীরা বাড়ি ফেরার পথে সরকারি দলের লোকজন হামলা করেছে।

পথে পথে বাধা, পরিবহনসংকটে দুর্ভোগ

সমাবেশে যাওয়ার পথে বাধা ও মারধরের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। সমাবেশের আগে অভ্যন্তরীণ রুটসহ ময়মনসিংহ থেকে আন্ত জেলা বাসও চলাচল করেনি। সমাবেশের আগের দিন থেকেই ময়মনসিংহের সঙ্গে জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের জেলার পরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শহরের ভেতরেও চলেনি যানবাহন। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছে যাত্রীরা।

গতকাল সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়ক ও শম্ভুগঞ্জ মোড় এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরের পাটগুদাম আন্ত জেলা বাস টার্মিনালেও কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও নেত্রকোনাগামী কোনো বাস ছাড়তে দেখা যায়নি। ওই তিন জেলা থেকে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকাগামী যেসব বাস চলাচল করে, সেগুলোও চলেনি। তবে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় সীমিত পরিসরে বাস চলাচল করেছে। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, নেত্রকোনা থেকে ছেড়ে আসা উত্তরবঙ্গগামী হাতে গোনা কয়েকটি বাস ময়মনসিংহ হয়ে চলতে দেখা গেছে।

সূত্র জানায়, ময়মনসিংহে চলাচলকারী শালবল পরিবহনের ৭০টি বাসই বন্ধ ছিল। ৯টার দিকে বিএনপির নেতাকর্মীদের নৈরাজ্য ঠেকানোর নামে মহাসড়কে অবস্থান নেন ত্রিশাল উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। দূরপাল্লার যানসহ ট্রাক-সিএনজিসহ অন্যান্য বাহনও আটকে দেন তাঁরা। তবে বিএনপি নেতাকর্মীরা অটোরিকশা, ভ্যানগাড়ি এমনকি পায়ে হেঁটেও সমাবেশে যোগ দিয়েছেন।

নেত্রকোনা থেকে ময়মনসিংহ ও ঢাকাগামী সব বাসও বন্ধ ছিল।

যানবাহন বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়ে এসএসসির কৃষি ব্যাবহারিক পরীক্ষার্থীরা। হেঁটে তাদের কেন্দ্রে যেতে দেখা গেছে। অফিসগামীরা হেঁটে কিংবা ভ্যানে করে গন্তব্যে যান।

লাঠিসোঁটাসহ চার বিএনপি সমর্থককে আটক

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে লাঠিসোঁটাসহ বিএনপির চার সমর্থককে আটক করেছেন পাগলা থানা পুলিশ। গত শুক্রবার দিবাগত রাত ২টায় মশাখালী ইউনিয়নের স্কুলের বাজার ব্রিজ এলাকা থেকে তাঁদের আটক করা হয়। পুলিশ জানায়, তাঁদের বহনকারী সিএনজি থেকে দুটি প্লাস্টিকের বস্তায় তিন ফুট লম্বা ১৪০টি বাঁশ ও লাঠি জব্দ করা হয়।

সর্বশেষ