নারীর ক্ষমতায়ন সমাজ উন্নয়নের সোপান

নারীর উন্নয়ন প্রক্রিয়াই নারীর ক্ষমতায়ন। এটিকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। তবে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলার সময়, ক্ষমতায়নের অর্থ হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা নারীদের গ্রহণ করা এবং অনুমতি দেওয়া। এটি রাজনৈতিক কাঠামো এবং আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের ওপর জোর দেয়, এমন একটি আয় বর্ধন করার বিষয় যা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম করে। এটি শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি, সাক্ষরতা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীর মর্যাদা বাড়ানোর কাজও অন্তর্ভুক্ত করে। নারীর ক্ষমতায়ন হলো সমাজের বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে তাদের জীবন নির্ধারক সিদ্ধান্ত নিতে সজ্জিত করা এবং অনুমতি দেওয়া।

নেপোলিয়নের আলোকে ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেব।’ মূলত শিক্ষিত মা একটি জাতির স্তম্ভ, আলোর দিশারি এবং তারা বিভিন্নভাবে বৃক্ষের মতো অবদান রেখে চলেছেন। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নারীদের শিক্ষা বৃত্তি বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নের উন্নয়নের অগ্রণী পদক্ষেপ। স্থানীয় প্রশাসন যেমন ইউএনও, ডিসি, সচিব, ব্যাংকার, শিক্ষক, পুলিশ, বিচার, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এবং বিভিন্ন স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ লক্ষণীয়ভাবে দেখা যাচ্ছে এবং পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে মোকাবিলা করার জন্য এটি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা সফলভাবে প্রতিটি সেক্টরে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। তারা পুরুষের চেয়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই।

নারীর ক্ষমতায়ন দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এবং লিঙ্গ সমতা অর্জন আমাদের সমাজের জন্য অপরিহার্য। অনেক বিশ্ব নেতা এবং পণ্ডিত যুক্তি দিয়েছেন যে লিঙ্গ সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব। টেকসই উন্নয়ন পরিবেশগত সুরক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গ্রহণ করে এবং নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া নারীরা পুরুষের মতো উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না।

শিক্ষা নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং তাদের আরো ভালো চাকরি খুঁজে পেতে সক্ষম করে এবং তারা পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারে। তারা জনস্বার্থে যুক্তি-তর্ক করে এবং স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য অধিকারের জন্য সরকারের কাছে দাবি পেশ করে। বিশেষ করে, শিক্ষা নারীদের এমন পছন্দ করার ক্ষমতা দেয় যা তাদের সন্তানদের স্বাস্থ্য, তাদের সুস্থতা এবং সংগ্রামী জীবনে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে উন্নত করে।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সত্ত্বেও, শিক্ষা সর্বজনীনভাবে উপলব্ধ নয় এবং লিঙ্গবৈষম্য এখনো বজায় রয়েছে। অনেক দেশে একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো শুধু সীমিতসংখ্যক মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, তা নয় বরং যারা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছে তাদের জন্য শিক্ষার পথও ক্ষেত্র বিশেষে সীমিত। আরো বিশেষভাবে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত শিক্ষায় মেয়েদের কম অংশগ্রহণ এবং শেখার অর্জনকে মোকাবিলা করার জন্য আরো প্রচেষ্টা থাকা উচিত।

বাংলাদেশ গত এক দশকে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি রোল মডেল এবং এই বিষয়ে প্রচেষ্টার কারণে দেশটি সমাজে একটি প্রশংসনীয় পরিবর্তন অনুভব করছে। শিশু মৃত্যু হ্রাস, দারিদ্র্য বিমোচন, নারী উদ্যোক্তা বৃদ্ধি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মতো অনেক ক্ষেত্রেই গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্জন অনুকরণীয়। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং তারা প্রায়শই একটি সহযোগিতামূলক ধারায় কাজ করেছে। জন্মহার হ্রাস করার জন্য পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রাথমিক হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল এবং আয় রোজগারের সুযোগ দেওয়ার জন্য ক্ষুদ্রঋণ চালু করা হয়েছিল। গ্রামে গ্রামে এনজিও দ্বারা গ্রামীণ নারীদের সংগঠিত করা এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার সেবা প্রদানের জন্য দ্বারে দ্বারে মহিলা কর্মীদের ব্যবহার শিশু, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য এবং আয় উপার্জনের সুযোগের উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

সাম্প্রতিক নারীদের সাফল্যের হারও খুব ভালো এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের চাকরির অর্জনও সত্যিই প্রশংসনীয়। ব্যবসায়, তারা কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ লোকের চেয়ে ভালো করছে, কারণ তারা যেকোনো ব্যবসায় আরো জবাবদিহি, আন্তরিক, সৃজনশীল এবং নিবেদিত। সমাজে নারীর ক্রমাগত অবদান সামগ্রিকভাবে সমাজকে আলোকিত করার জন্য স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সত্যিই চিত্তাকর্ষক এবং এটি সমাজের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অগ্রগতি এবং টেকসই উন্নয়নকে প্রসারিত করতে সহায়তা করে।

সরকারের উচিত তাদের উন্নতি ও নারীর ক্ষমতায়নের পথের জন্য তাদের দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত রাখা যা তাদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখায়। একজন শিক্ষিত মা শুধু নিজেকেই নয়, একটি পরিবারকেও, ধীরে ধীরে একটি সমাজ এবং অবশেষে একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, আলোর পথ দেখায়, আলোক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

লেখক: সালমা সাজমীন স্বর্না
শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ
প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ