পাচারের অর্থ ফেরানোর কাজে নেই সমন্বয়

দেশে ডলারের ভিন্ন ভিন্ন রেটের কারণে আমদানিনির্ভর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নির্ধারণে জটিলতা দেখা দিয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক এই মুদ্রাটির যে রেট ধরে পণ্যের দাম হিসাব করছে, এলসি (ঋণপত্র) নিষ্পত্তির সময় ব্যবসায়ীদের পরিশোধ করতে হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের হিসাব মিলছে না। এরই মধ্যে ভোজ্য তেল ও চিনি এই দুটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণে সরকারি সংস্থাগুলোর হিসাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে এসব খাতের ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে এই দুটি পণ্যের মূল্য পর্যালোচনায় আজ আবার বৈঠক ডেকেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সরকারের সঙ্গে হিসাব মিলছে না ব্যবসায়ীদের

 

সূত্র জানায়, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও ঋণপত্র খোলার জটিলতার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেও অবহিত করেছে ভোজ্য তেল ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নেতারা। বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা সম্প্রতি তাদের সমস্যা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর সিনিয়র সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন।

ভোজ্য তেল, চিনিসহ নিত্যপণ্য আমদানি ও পরিশোধনকারী একটি কোম্পানির কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, সরকার ডলারের যে রেট নির্ধারণ করে দিচ্ছে, সেই রেটে কোনো ব্যাংকে তারা এলসি নিষ্পত্তি করতে পারছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন ডলারের রেট ৮৯ টাকা নির্ধারণ করেছে, তখন এলসি করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে ১১০ থেকে ১১২ টাকা পরিশোধ করেছেন ব্যবসায়ীরা। দেখা যাচ্ছে, শুধু ডলারের রেটের ভিন্নতার কারণে প্রতি এলসিতে ব্যবসায়ীদের কোটি টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলো যখন পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে, তারা ডলারের সরকারি রেট হিসাব করছে; ঋণপত্র নিষ্পত্তির সময় ডলারের এই উচ্চরেট আমলে নিচ্ছে না। এর ফলে সরকারের হিসাবের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের হিসাব মিলছে না। বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম মোল্লা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শুধু ডলারের উচ্চরেট নয়, ব্যবসায়ীরা এখন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটেও পড়েছেন। আগে যেখানে তিন শিফটে কারখানায় কাজ হতো গ্যাস সংকটের কারণে এখন সেখানে দুই শিফটে পণ্য পরিশোধন হচ্ছে। সব কারখানা আবার চালু করার মতো গ্যাসও মিলছে না। এর ফলে পণ্যের সরবরাহজনিত সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের এই নির্বাহী কর্মকর্তা। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের অ্যাসোসিয়েশন থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠিও পাঠানো হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

ব্যবসায়ীদের ডলার রেটের এই জটিলতার বিষয়টি ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। গত আগস্টে ট্যারিফ কমিশন ভোজ্য তেলের মূল্য পর্যালোচনা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যে প্রতিবেদন পাঠায় তাতে বলা হয়েছে, আমদানিকারকরা দুই মাস আগে যে রেটে ঋণপত্র খুলেছিলেন (এলসি ওপেন) এখন তা নিষ্পত্তি (এলসি সেটেলমেন্ট) করতে গিয়ে প্রতি ডলারের বিপরীতে প্রায় ২০ টাকা বেশি পরিশোধ করতে হচ্ছে। উপরন্তু জ্বালানির দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়েছে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। এর ফলে ব্যবসায়ীদের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন ও পামতেলের দাম ৩০ থেকে ৩৫ হ্রাস পেলেও আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধে ব্যবহৃত বৈদেশিক মুদ্রা মার্কিন ডলারের দাম কার্ব মার্কেটে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পরিবহন ব্যয় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই পণ্য পরিবহনে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের মূল্য যে হারে হ্রাস পেয়েছে, স্থানীয় বাজারে সে হারে দাম কমবে না বলে পর্যালোচনা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে ট্যারিফ কমিশন। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, ডলারের উচ্চরেট নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ আমলে নিয়ে এরই মধ্যে ট্যারিফ কমিশনকে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঋণপত্র নিষ্পত্তির সময় ডলারের যে রেট থাকে, সেই রেট ধরে ভোজ্য তেল ও চিনির মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ট্যারিফ কমিশনের কাছে একটি রিপোর্টও চাওয়া হয়েছে। ওই রিপোর্টের ওপর পণ্য দুটির মূল্য পর্যালোচনা করতে তাঁর মন্ত্রণালয়ে আজ বৃহস্পতিবার বৈঠক ডেকেছেন বলেও জানান তিনি।

সর্বশেষ