নিত্যপণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে ৩১ শতাংশ

 

 

মে-জুলাইয়ে আয় বেড়েছে ৩৫ পয়সা, ব্যয় ৫.৮৫ টাকা

এক যুগে সর্বোচ্চ আগস্টে ৯.৫ ও সেপ্টেম্বরে ৯.১ শতাংশ * মূল্যস্ফীতির এ হারকে এখনো কম বলা যায় না-পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী * মূল্যস্ফীতির তথ্য নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়-ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম
 হামিদ-উজ-জামান

 ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
85Shares
facebook sharing button
messenger sharing button
whatsapp sharing button
twitter sharing button
linkedin sharing button
মূল্যস্ফীতিতে বিপর্যস্ত ভোক্তা

এক যুগের মধ্যে দেশের মূল্যস্ফীতির হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এ হার যেভাবে বেড়েছে সেভাবে মানুষের আয় বাড়েনি।

একদিকে খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে আয় কমেছে। এই দুইয়ে মিলে চড়া মূল্যস্ফীতির চোখ রাঙানিতে মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সমন্বয় না হওয়ায় ভোক্তারা জীবনযাত্রার মানে অনেক ছাড় দিতে বাধ্য হচ্ছে। এদিকে মূল্যস্ফীতির যে হিসাব প্রকাশ করা হচ্ছে তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অনেকেই মনে করেন মূল্যস্ফীতির হার ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। কারও কারও মতে এ হার আরও বেশি হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে গত আগস্টে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৯ দশমকি ৫ শতাংশ। যা গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ২০১০-১১ অর্থবছরে গড় হিসাবে এ হার ছিল ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ। এরপর আর কখনো ওই পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির হার ওঠেনি। শুধু এবার আগস্টে এ হার সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ শতাংশে উঠল। যদিও তা সেপ্টেম্বরে সামান্য কমে ৯ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং জুনে ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ বছরের জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৫ দশমকি ৮৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি থেকেই এ হার বাড়তে শুরু করে।

সূত্র জানায়, করোনার পর হঠাৎ করে পণ্যের চাহিদা বাড়ায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম হু-হু করে বাড়তে থাকে। গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন আক্রমণ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে দেশীয় বাজারেও। আমদানিসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে গত বছরের মে মাস থেকে ডলারের দামে পাগলা ঘোড়া দেখা দেয়। এর দাম মে মাসে ছিল ৮৫ টাকা। এখন তা বেড়ে ১০৭ টাকা হয়েছে। এতে টাকার মান কমে গেছে। ফলে পণ্যের দাম বেড়েছে। এসব মিলে মূল্যস্ফীতির পালে হাওয়া লেগেছে। যে জন্য এ হার বেড়েই চলেছে।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বুধবার যুগান্তরকে বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির কারণে আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছিল। সেপ্টেম্বরে তা কমে ৯ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে।’ এটাকে এখনো কমেছে বলা যায় না বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর সব দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক এখন মূল্যস্ফীতি। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠেছে।

এক মাস ধরে মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশ নিয়ে সময়ক্ষেপণ করছিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবারও পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান যুগান্তরকে বলেন, আমি বলেছি সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি কমেছে। তবে কবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া হবে সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। তথ্য নিয়ে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং করা হবে না।

এদিকে বিবিএসের মজুরি হার সূচকে (ডব্লিউআরআই) দেখা যায়, গত মে মাসে যে কর্মী ১৯৪ টাকা ৪৭ পয়সা আয় করতেন, গত জুলাইয়ে তিনি আয় করেছেন ১৯৪ টাকা ৮২ পয়সা। ওই সময়ে তার আয় বেড়েছে মাত্র ৩৫ পয়সা।

এদিকে মূল্যস্ফীতির হিসাবে গত মে মাসে ৩০৯ টাকা ২৮ পয়সায় যে পণ্য কেনা যেত, একই পণ্য জুনে কিনতে খরচ হয়েছে ৩১৫ টাকা ১৩ পয়সা। আলোচ্য সময়ে খরচ বেড়েছে ৫ টাকা ৮৫ পয়সা। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে মে থেকে জুলাই মাসে আয় বেড়েছে মাত্র ৩৫ পয়সা। অথচ খরচ বেড়েছে ৫ টাকা ৮৫ পয়সা।

সরকারি হিসাবের বাইরে বাস্তবের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। আলোচ্য সময়ে মানুষের আয় তো বাড়েইনি। উলটো কমেছে। করোনার আঘাত ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনৈতিক মন্দায় অনেকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অনেকের বেতন-ভাতা কমেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার কমায় ওইসব খাতেও খণ্ডকালীন কাজের সংস্থান কমেছে।

এদিকে পণ্যমূল্যের দাম বেড়েছে আকাশছোঁয়া গতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমলেও দেশের বাজারে কমেনি। উলটো ডলারের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে দাম আরও বেড়েছে। গত আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার কম দেখানো হয়েছে। বাস্তবে সেপ্টেম্বরে পণ্যের দামও বেড়েছে। চাল, আটাসহ প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। কিন্তু তারপরও জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা কমানোর কারণ দেখিয়ে মূল্যস্ফীতির হার দশমিক শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমানো হয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মূল্যস্ফীতির হিসেবে নানা প্রশ্ন থেকে যায়। সরকারি সংস্থার লোকজন একদিন বাজারে গিয়ে হিসাব নিয়ে আসে তারপর সেটি গড় করে মূল্যস্ফীতির হিসাব করে থাকে। ফলে প্রকৃত চিত্র উঠে আসে কিনা সেটি নিয়ে সমালোচনা হয়। কিন্তু তারপরও আগস্টে যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে সেটি অনেক বেশি। বলা হচ্ছে সেপ্টেম্বর মাসে কমেছে। কিন্তু ৯ দশমিক ৫ আর ৯ দশমিক ১-এর মধ্যে পার্থক্য তেমন নেই। দেশে এই মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি। এটা কমানোর ক্ষেত্রে যেসব উদ্যোগ দরকার সেগুলো দ্রুত নিতে হবে সরকারকে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কয়েক মাস ধরেই দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়া-কমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জুলাই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এ সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ। তার আগে জুন মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ওই সময় খাদ্য ৮ দশমিক ৩৭ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। সে সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয় ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয় ৬ দশমিক ০৮ শতাংশ।

বিবিএস-এর তথ্যে আরও দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির হার গত এক যুগের মধ্যে সামান্য ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে কখনো অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত করেনি। কিন্তু এবার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় চড়া মূল্যস্ফীতির হার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এর আগে ২০২০ সালের আগস্টে ৫ দশমিক ৬৮ এবং সেপ্টেম্বরে ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ ছিল। ২০১৯ সালের আগস্টে ৫ দশমিক ৪৯ এবং সেপ্টেম্বরে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ২০১৮ সালের আগস্টে ৫ দশমিক ৫৩ এবং সেপ্টেম্বরে ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ওই সময়ে মূল্যস্ফীতির হার ৫ শতাংশের ঘরেই ওঠানামা করেছে। এরপর থেকে সামান্য বেড়ে কখনো ৬ শতাংশের ঘরে উঠেছে।

বিবিএসের হিসাবে ২০১৭ সালের আগস্টে ৫ দশমিক ৮৯ এবং সেপ্টেম্বরে ৬ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৬ সালের আগস্টে ৫ দশমিক ৩৭ এবং সেপ্টেম্বরে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ হয়। এছাড়া ২০১৫ সালের আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বর মাসে হয় ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ।

সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বে কয়েক মাস ধরেই দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছিল। এরই মধ্যে গত ৫ আগস্ট সরকার জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। ডিজেলের দাম লিটারে ৩৪ টাকা, অকটেনের দাম লিটারে ৪৬ টাকা ও পেট্রোলের দাম লিটারে ৪৪ টাকা বাড়ানো হয়। এটি ছিল একবারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার রেকর্ড বৃদ্ধি। এর পরপরই সব ধরনের পরিবহণ ভাড়া বাড়ানো হয়। এরই প্রভাব পড়ে দেশের অন্যান্য পণ্যের দামের ওপর। এরপর গত ২৯ আগস্ট দাম সমন্বয়ের নামে জ্বালানি তেলের দাম ৫ টাকা কমায় সরকার। কিন্তু এর প্রভাব বাজারে তেমন পড়েনি। সেপ্টেম্বর মাসে দেশে দেশে মূল্যস্ফীতির হার এখন ৯ দশমিক ১ শতাংশ। এর অর্থ হলো গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের মানুষ যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় পেয়েছিলেন, এ বছর সেপ্টেম্বর মাসে তা কিনতে ১০৯ টাকা ১০ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। আগস্টে একই পরিমাণ পণ্য কিনতে তাদের লেগেছিল ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা।

সর্বশেষ