পাইকারি পর্যায়ে ১০-১৫ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা বিদ্যুতের দাম এবার বাড়ছে

 

দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্ল্যাকআউটের (বিদ্যুৎ বিপর্যয়) ঘটনা ঘটে গেল মঙ্গলবার। এতে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় দেশের অর্ধেক অঞ্চল। থেমে যায় শিল্পের চাকা, ব্যাহত হয় হাসপাতালের চিকিৎসা, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ব্যাংকিং থেকে সব ধরনের কর্মকান্ড। এক মাসের ব্যবধানে এটি ছিল দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা। অথচ সাত-আট বছর ধরেই দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বলে দাবি করে আসছিল দায়িত্বে থাকা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। এই সময়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা আপগ্রেডেশনে নেওয়া হয়েছে অসংখ্য প্রকল্প। ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

কী কারণে এমন বিপর্যয়

 

মঙ্গলবারের গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক ইয়াকুব এলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সংস্থাটি। সময় দেওয়া হয়েছে তিন দিন। আরও দুটি তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও এখনো গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ খুঁজে পায়নি পিজিসিবির তদন্ত কমিটি। এ ব্যাপারে কমিটির প্রধান ইয়াকুব এলাহী বলেন, ‘গ্রিড সিস্টেমের সঙ্গে অনেক প্রযুক্তিগত বিষয় জড়িত। আমরা কাজ শুরু করেছি। সাবস্টেশন, পাওয়ার স্টেশন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা পরিদর্শন করে তথ্য সংগ্রহ করছি। এর পর বোঝা যাবে বিপর্যয়ের কারণ। উপসংহারে পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে।’

এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর গ্রিড বিপর্যয়ে কুষ্টিয়া, যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো প্রায় দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিল। মঙ্গলবারের (৪ অক্টোবর) বিপর্যয়ে ব্ল্যাকআউটের মুখে পড়ে দেশের অর্ধেক অঞ্চল। টানা ছয়-সাত ঘণ্টা অন্ধকারে ছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও আশপাশের এলাকা। যারা জেনারেটর দিয়ে কাজ চালাচ্ছিলেন, তাদেরও অনেকের তেল ফুরিয়ে যায়। দেখা দেয় পানির সংকট। এটিএম থেকে টাকা তোলা যাচ্ছিল না। শেষ হয়ে গিয়েছিল আইপিএস ও চার্জার লাইটের চার্জ। ব্যাহত হয় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাসেবা। জেনারেটরের মাধ্যমে জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রাখতে হিমশিম খেতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এক পর্যায়ে মোবাইল নেটওয়ার্কে বিভ্রাট দেখা দেয়। ছিল না ইন্টারনেট সংযোগ। এর আগে ২০১৪ সালের নভেম্বরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার ব্ল্যাকআউট হয়। ২০০২, ২০০৭, ২০০৯ ও ২০১৭ সালেও বিপর্যয়ে পড়ে জাতীয় গ্রিড। এ ছাড়া নিম্নমানের সঞ্চালন লাইনের কারণে আঞ্চলিক গ্রিডে হরহামেশা বিপর্যয় ঘটছে। 

সংশিষ্টরা বলছেন, সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎপ্রবাহের ফ্রিকোয়েন্সিতে গরমিল হলে বড় রকমের বিপর্যয় এড়াতে নিজ থেকে বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। তখনই গ্রিড বিপর্যয় দেখা দেয়। সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাড়িয়ে গেলেও সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। মান্ধাতা আমলের সঞ্চালন ব্যবস্থার কারণে প্রায়ই ফ্রিকোয়েন্সিতে ভারসাম্যজনিত তারতম্য দেখা দিচ্ছে। এখনো স্মার্ট গ্রিডের যুগে পা রাখতে পারেনি সঞ্চালন ব্যবস্থা। ফলে কোন এলাকায় কত সময়, কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও উৎপাদন হবে, তা এখনো ফোন করে ঠিক করে দেয় জাতীয় লোড ডেসপাস সেন্টার (এনএলডিসি)। এতে কোনো বিপর্যয় ঘটলে তা সামাল দিতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। কারণ খুঁজে পেতেও লাগে দীর্ঘ সময়। বুয়েটের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের গ্রিডে সরবরাহ ব্যবস্থা অনেক পুরনো। ৩০-৪০ বছরের পুরনো যন্ত্রপাতিও আছে। এই পুরনো যন্ত্রপাতির কারণে সামনেও বারবার দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’

তবে পিজিসিবির প্রধান প্রকৌশলী (সঞ্চালন-১) মোরশেদ আলম খান বলেন, ‘আমাদের এখানে পুরনো যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুযোগ নেই। বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিই আমরা ব্যবহার করছি। ফ্রিকোয়েন্সি ডাউন হয়েছে মূলত টেকনিক্যাল কারণে। কেন এটা হলো তা খুঁজতে তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তারা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে। সেগুলো হাতে পেলে বোঝা যাবে কোথায় সমস্যা।’

এদিকে গ্রিড বিপর্যয়ের পর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। জানা গেছে, জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় দেখা দিলে বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ করা যায় না। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর বলেন, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘিরে যে আধুনিক সঞ্চালন ব্যবস্থা করা হচ্ছে তাতে ঝুঁকি নেই বললেই চলে। সাতটি সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন শহরের সঙ্গে সংযোগ করা হচ্ছে। একদিকে বন্ধ হলে অন্যদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে গ্রিড ট্রিপ করলে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

গ্রিড ট্রিপ নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, অনেকেই যন্ত্রপাতির কারণে বিপর্যয়ের কথা বলছেন। মূলত গ্রিডের সঙ্গে গ্রিড কোডের নির্দেশনার সমন্বয়হীনতা দেখা দিলে এ ধরনের বিপর্যয় ঘটে। এখনো ৩০ শতাংশ প্ল্যান্ট গ্রিডের আওতাভুক্ত হয়নি। এতে সাপ্লাই-ডিমান্ডে বড় রকমের সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। সরবরাহের বিপরীতে চাহিদা যখন মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যায় তখন জেনারেটরগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়। খুব কম সময়েই বড় বিপর্যয় ঘটে যায়। যত দিন পর্যন্ত গ্রিড কোডের নির্দেশনা লঙ্ঘন হবে, তত দিন এমন বিপর্যয়ের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

সর্বশেষ