ফের জোটমুখী বিএনপি

 

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও জোটমুখী হচ্ছে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। এ লক্ষ্যে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে শেষ দফা সংলাপও শুরু করেছে দলটি। গত দুই দিনে তিনটি দলের সঙ্গে সংলাপ করেছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে এবার গতানুগতিক পন্থা পরিহার করে ভিন্ন কৌশলে নির্বাচনী বৃহদাকৃতির জোট করতে যাচ্ছে বিএনপি।

ফের জোটমুখী বিএনপি

 

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো দলের সঙ্গেই কাগজপত্রে কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হবে না বিএনপি। ‘ড্রয়িং-রুমে’ বসে কিংবা গোলটেবিলের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখার নামসর্বস্ব ঐক্যও আর করতে চাচ্ছে না সংগঠনটি। বিএনপি এবার ঐক্য করবে রাজপথে। বাস্তবে, আন্দোলনের মাঠে। দল বা সংগঠন যত ছোটই হোক না কেন, রাজপথের ভূমিকার ওপরই নির্ভর করবে তাদের এ ‘বৃহৎ রাজনৈতিক ঐক্যের অংশীদারিত্ব’। মাঠের কর্মসূচিতে শতভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে যারা থাকবেন এবং কর্মসূচি পালন করবেন, মূলত তাদের সঙ্গেই ঐক্য করবে বিএনপি। এ ক্ষেত্রে প্রথমে যুগপৎ ও পরে ঐক্যবদ্ধভাবেও আন্দোলন কর্মসূচি পালন করা হতে পারে। বিএনপির নীতি-নির্ধারণী মহল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।   বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার পতন আন্দোলনে বৃহত্তর ‘ঐক্য জোট’ হতে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে কীভাবে কী হবে, সেটা নির্ধারিত হবে রাজপথের যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, যে কোনো রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা সংগঠন যারাই এই কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য, ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলন করবেন, তাদের সবার সঙ্গেই আমরা যুগপৎ আন্দোলন করব। নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ের পর সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করব।

দলের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায়ে যুগপৎ আন্দোলন ও নির্বাচনোত্তর ‘জবাবদিহি রাষ্ট্র তথা রূপান্তরমূলক’ কর্মসূচির রূপরেখা প্রায় চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পরিপ্রেক্ষিতেই এ রূপরেখা প্রণয়ন করছেন দলের নীতি-নির্ধারকরা। নির্বাচনের আগে ও পরের জন্য দুটি পর্বের পরিকল্পনাই প্রণয়ন করেছেন তারা। দ্বিতীয় বা শেষ দফা সংলাপ শেষে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আগামী মাসে কিংবা সুবিধামতো কোনো সময়ে দেশবাসীর সামনে এ রূপরেখা উপস্থাপন করা হবে। জানা গেছে, রূপরেখার প্রথম পর্বে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কিছু ‘শর্তের ভিত্তিতে’ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে ‘নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের’ অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়টি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। আন্দোলনের গতি ও মাত্রার ভিত্তিতে পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী যুগপৎ, নাকি নিজ নিজ প্রণীত ছক অনুযায়ী চলবে-  সে বিষয়গুলোও নির্ধারণ করা হবে। তবে আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ নিলে সেক্ষেত্রে যুগপৎ থেকে বের হয়ে এসে একযোগে সবাই একত্রে একই কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টিও রাখা হতে পারে। 

রূপরেখার দ্বিতীয় পর্বে ‘রাষ্ট্র-রূপান্তর’ কর্মসূচিতে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ আন্দোলনে ভূমিকা রাখার পর (জাতীয় নির্বাচনে) বিজয়ী ও পরাজিত দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, সাংবিধানিক সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠনসহ ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায়ের সংগ্রামের পাশাপাশি জনগণের ভোটাধিকারের দাবি আদায়ে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে ‘বৃহত্তর ঐক্য  জোট’ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া অনেক দিন ধরেই চলছে। তাদের দ্বিতীয় দফা সংলাপ চলছে। এতে সব দলের পক্ষ থেকেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়াসহ যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হচ্ছে। যুগপৎ আন্দোলন ও নির্বাচনোত্তর রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা প্রকাশ করার পর ‘লিয়াজোঁ কমিটির’ সঙ্গে আবারও আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। জানা গেছে, যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ডান-বাম ও ইসলামীসহ ২৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছে বিএনপি। ২০ দলীয় জোটের কয়েকটি দলসহ নবগঠিত ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’র অন্তর্ভুক্ত সাতটি দলের সঙ্গেও সংলাপ করেছে তারা। দলগুলো যথাক্রমে- জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।

সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, তার অধিকাংশই বিএনপির রূপরেখায় স্থান পেয়েছে। বিএনপির চিন্তার সঙ্গে সমমনা ওই সব দলের পরিকল্পনাও প্রায় একই হওয়ায় রূপরেখা নিয়ে তেমন মতপার্থক্য থাকছে না। বিএনপির পক্ষ থেকে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণার পরই দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় পর্বের সংলাপ শুরু হয়েছে। এ সংলাপ শেষে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি যৌথভাবেও ঘোষণা হতে পারে।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে এলডিপি সবসময়ই আছে। প্রয়োজনে বিএনপির নেতৃত্বে আমরা সবাই একযোগে অংশ নেব। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের মতে, সরকারের পতন এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রশ্নটাই গণতন্ত্র মঞ্চের কাছে মুখ্য। সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান করণীয়ই হলো জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে অন্যান্য সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন অথবা বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলার স্বার্থেই এ ঐক্য প্রয়োজন। আন্দোলন ও ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই যৌথ রূপরেখা বাস্তবায়ন করা হবে। একই কথা বলেন, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, আমরাও একমত যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে। বিএনপির সঙ্গে এ নিয়ে দুই দফা আলোচনা হয়েছে। আরও হবে। আশা করছি আমরা খুব শিগগিরই যুগপৎ এ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারব। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, বিএনপির সঙ্গে এ নিয়ে আমাদের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি খুব শিগগিরই আপনারা তার ফলাফল দেখতে পাবেন।

জানা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারবিরোধী আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিএনপি। নির্বাচনকালীন সরকার, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে গত ২২ আগস্ট থেকে গতকাল পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। আগামী কয়েক মাস এভাবেই মাঠ গরম রাখবে দলটি। এরপর মোক্ষম সময়ে সরকার পতনের এক দফা নিয়ে রাজপথ দখলের চিন্তাভাবনা রয়েছে তাদের। চূড়ান্ত আন্দোলনের আগেই সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার কাজ শেষ করবে সংগঠনটি। এমনকি যারা বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবেন তাদেরও মাঠে নামানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। হামলা-মামলা কিংবা গ্রেফতার কোনো কিছুতেই রাজপথ না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাধা এলে আপাতত পালটা হামলা এড়িয়ে কৌশলে কর্মসূচি পালনের জন্য কেন্দ্র থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছে। কখন কীভাবে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে তাও সময়মতো হাইকমান্ড থেকে জানিয়ে দেওয়া হবে। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চলমান আন্দোলনে সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। সারা দেশে জনগণ জেগে উঠেছে।

 

সর্বশেষ