১৫ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ১০০ কোটি ডলার

 

দেশ বড় ধরনের ডলার সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে-এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল ৬ বছর আগেই। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দেয়। টানা ছয় বছর চলে ওই ঘাটতি। ওই ঘাটতির কারণে ডলার সংকটের আভাস অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্টরা পেয়েছিল।
ডলার

 

কিন্তু তারা সতর্কতামূলক যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। উলটো ডলারের বিপরীতে টাকার মান বাজারে ঘনঘন হস্তক্ষেপ করে ধরে রেখেছে। একদিকে রিজার্ভ বাড়িয়েছে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। রিজার্ভ থেকেও ঋণ দিয়ে এর খরচ বাড়িয়েছে।

করোনার পর গত বছরের আগস্ট থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম হুহু করে বেড়ে গেলে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলসহ সব পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হলে আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি কমে যেতে শুরু করে। এর প্রভাবে ডলার সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। রিজার্ভে প্রবল চাপ পড়ে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ওই সময়ে সতর্ক হলে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে সাশ্রয়ী এবং আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ থাকলে এখন এত বড় সংকট হতো না। তবে এ সংকট হয়তো এখনই হতো না যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু না হতো। এই যুদ্ধ ডলার সংকটকে দ্রুত প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এ সংকট যে হবে, তা আগে থেকে আঁচ করা গিয়েছিল। সূত্র জানায়, সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি দেখা দেয়। এ ঘাটতি অব্যাহতভাবে চলতে থাকলে ডলারের সংকট প্রকট হয়। মূল্যস্ফীতির হারও বেড়ে যায়। আবার চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকলে বাড়তি ডলার রিজার্ভে জমা হয়। তখন রিজার্ভ রাড়তে থাকে। এতে ডলারের বাজারে স্বস্তি থাকে। টাকার মানজনিত কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে মানুষ স্বস্তিতে থাকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ঘাটতি শুরু হয়। এখন পর্যন্ত ওই হিসাবে ঘাটতি চলছে। প্রতিবছরই গড়ে ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে। টানা ছয় বছর ঘাটতি চলছে। ওই ছয় বছর সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়েছে। এর বিপরীতে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে রিজার্ভের ওপর চাপ কমিয়েছে।

কিন্তু এখন একদিকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহে নিুগতি দেখা দিয়েছে। যদিও গত অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে। ফলে এখন চাহিদার তুলনায় ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে রিজার্ভ থেকে ডলার নিয়ে সংকট মোকাবিলা করা হচ্ছে। এভাবে চলমান সংকট বেশি দিন মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এদিকে এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত এ হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয় হয়েছে কম। ফলে বাজারে ডলারের সংকট ছিল না। টাকার মান স্থিতিশীল ছিল।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর. ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, চলতি হিসাবে ঘাটতি মানেই ডলারের আয় কম হচ্ছে, ব্যয় বেশি হচ্ছে। এ ঘাটতি অব্যাহতভাবে চলতে থাকলে ডলার সংকট অবশ্যই দেখা দেবে। তখন টাকার মান কমে গিয়ে মূল্যস্ফীতির হারও বাড়বে। এটি সবাই আঁচ করেছিলেন। কিন্তু আগে থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, এ সংকট মোকাবিলায় এখন রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে হুন্ডি ও আমদানিতে টাকা পাচার বন্ধ করতে হবে। তাহলে সংকট কিছুটা কমবে। রপ্তানি বাড়ানোও দরকার। কিন্তু এ মুহূর্তে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এটি বাড়ানো সম্ভব হবে না। ফলে হুন্ডি, টাকা পাচার বন্ধ ও আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এখন বড় বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না। ঋণ পেয়েও সাময়িক উপশম হবে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান হবে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে চলতি হিসাবে ঘাটতি চলছে, যা গত অর্থবছরে এসে রেকর্ড হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টেও এ হিসাবে ঘাটতি হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে চলতি হিসাবে ঘাটতি হয়েছে ১ হাজার ৬৭০ কোটি ডলার, যা আগে কখনোই হয়নি। বৈদেশি মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ার কারণেই এত ঘাটতি হয়েছে। অর্থাৎ ওই বছরে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে, তার চেয়ে ১ হাজার ৬৭০ কোটি ডলার বেশি খরচ করা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৪৫৮ কোটি ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে ঘাটতি ছিল ৪৮৫ কোটি ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৫১০ কোটি ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ৯৩৮ কোটি ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঘাটতি হয়েছিল ২২২ কোটি ডলার।

এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ৬/৭ বছর উদ্বৃত্ত ছিল। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উদ্বৃত্ত ছিল ৩৭১ কোটি ডলার, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ২৮৮ কোটি ডলার, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ছিল ২৩৯ কোটি ডলার, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ছিল ১৫৫ কোটি ডলার, ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ৮৯ কোটি ডলার এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে ছিল ১৭০ কোটি ডলার।

সূত্র জানায়, চলতি হিসাবে টানা ঘাটতির কারণে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ওই চিঠিতে এ ঘাটতির কারণে কোন খাতে কী ধরনের ঝুঁকি আসতে পারে, সে বিষয়ে একটি সমীক্ষা করতে বলা হয়। ওই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সমীক্ষা করে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল মন্ত্রণালয়ে। ওই প্রতিবেদনে ডলার সংকটের আশঙ্কা করা হয়েছিল।

সূত্র জানায়, সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপে বেসরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার অনুমোদন দেওয়ায় ব্যাপকভাব ঋণ নেওয়া হয়েছিল। ফলে এ খাতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়নি। উলটো ঋণের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়। এখন সেই বিদেশি ঋণই গলার কাঁটা হিসাবে দেখা দিয়েছে। ৩০ জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ১ হাজার ১৩৭ কোটি ডলার। এর মধ্যে মূল ঋণ ১ হাজার ২৭ কোটি ডলার। সুদ বাবদ বকেয়া আছে ১৪৬ কোটি ডলার।

বহুমুখী বিধিনিষেধ আরোপ করে আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ অব্যাহত রয়েছে। এ চাপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

সর্বশেষ