দলকে সুসংগঠিত করতে কাজ করবে সলঙ্গা থানা বিএনপির নেতৃবৃন্দ

মামলা-হামলায় কোণঠাসা না হয়ে বিএনপিতে বাড়ছে ঐক্য। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে সৌহার্দ ও সহানুভূতি। হামলায় আহত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তারা। বিরোধ ভুলে পারস্পরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। শুধু আহত নেতাকর্মী নয়, তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছে হাইকমান্ড।

নিহত ও আহতদের পরিবারের পাশে হাইকমান্ড
বিএনপি

কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে যে অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক বা দৃশ্যমান দ্বন্দ্ব ছিল তা অনেকটাই কমে এসেছে। কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় অনেকের মধ্যে ছিল ক্ষোভ ও হতাশা। দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন তারা। সেই ক্ষোভকে মনের মধ্যে পুষে রেখে দলের স্বার্থে সক্রিয় হচ্ছেন নেতাকর্মীরা। এখনও যারা সক্রিয় হননি শিগগিরই তাদের রাজপথের আন্দোলনে দেখা যাবে বলে প্রত্যাশা দলটির নীতিনির্ধারকদের।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, হামলা-মামলা, নির্যাতন করে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার মিশন নিয়ে নেমেছে সরকার। কিন্তু হিতেবিপরীত হয়েছে। বিএনপি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ। তিনি বলেন, দেশের এ দুর্দিনে দলের নেতাকর্মীরা জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমে আসছেন। দিন যত যাচ্ছে সভা-সমাবেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়ছেই। সাধারণ মানুষও এতে অংশ নিচ্ছে। একটি কার্যকর গণআন্দোলনের মাধ্যমে এ সরকারকে বিদায় করে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা হবে। এর বিকল্প আমরা কিছু ভাবছি না।

বিএনপির দাবি, এক যুগের বেশি সময়ে ৬ শতাধিক নেতাকর্মীকে গুম-খুন করা হয়েছে। লক্ষাধিক মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩৫ লাখ। ২২ আগস্ট নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে তৃণমূলসহ রাজধানীতে সমাবেশ করে বিএনপি। প্রায় অর্ধশত সমাবেশে ক্ষমতাসীন দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলা চালায়। এসব হামলায় ৫ জন নিহত ও আড়াই হাজারের বেশি নেতাকর্মী আহত হন। নতুন করে ৭৫টি মামলায় ৫ হাজার ৪৭০ জনের নাম উল্লেখ করে ২৫ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। নতুন করে হামলা-মামলার পর নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্য আরও বাড়ছে বলে দাবি নীতিনির্ধারকদের। হামলার পর তাদের বন্ধন আরও মজবুত হচ্ছে।

১ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে যুবদল নেতা শাওন মারা যাওয়ার পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতারা তার বাসায় ছুটে যান। পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকার আশ্বাসও দেন।

সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যায় যুবদল নেতা শহিদুল ইসলাম শাওন। এরপর শাওনের বাসায় ছুটে যান দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। সেখানে শাওনের পরিবারের সঙ্গে স্কাইপে কথা বলেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শাওনের পুরো পরিবারের দায়িত্ব নেয় বিএনপি।

এ ছাড়া বিগত হামলায় যেসব নেতাকর্মী আহত হয়েছেন তাদের চিকিৎসার সার্বিক খোঁজখবর রাখছে কেন্দ্র। যাদের নামে মামলা হচ্ছে তাদের আগাম জামিনের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। দলের এমন কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন নেতাকর্মীরা। যার প্রভাব পড়ছে দলীয় কর্মসূচিতে। সভা-সমাবেশে বাড়ছে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, হামলা-মামলায় ভীত না হয়ে নেতাকর্মীরা আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন। সরকার হটানোর আন্দোলনে দিন দিন তাদের উপস্থিতি বাড়ছে। কোনো বাধাই এবারের আন্দোলনকে দমাতে পারবে না।

তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের যেকোনো বিপদে অতীতের মতো আগামীতেও দল তাদের পাশে থাকবে। এতে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হবে। দল তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে ভেবে একটা ভরসা পাবে।

জানা গেছে, পুনর্গঠনসহ নানা ইস্যুতে দলের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হন। কাঙ্ক্ষিত পদ না পেয়ে তারা দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিরত ছিলেন। ক্ষোভ-অভিমান ভুলে এসব নেতারাও সক্রিয় হচ্ছেন। সম্প্রতি যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটির সহসভাপতি হন আগের কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন। প্রত্যাশিত পদ না পেয়ে কিছুটা ক্ষুব্ধ হন তিনি। কয়েকদিন দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিরত ছিলেন। কিন্তু ক্ষোভ ভুলে ফের সক্রিয় হয়েছেন নয়ন। দলীয় কর্মসূচিতে সামনের সারিতে দেখা যাচ্ছে এ নেতাকে।

স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি ঘোষণার পরও সৃষ্টি হয় ক্ষোভ। ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু তাকে কমিটিতে রাখা হয়নি। এতে কিছুটা ক্ষুব্ধ হলেও দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় আছেন এ নেতা। স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি যেদিন শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে যায় সেদিন আকরামকে দেখা যায় সামনের সারিতেই।

জানতে চাইলে আকরামুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি নেতাকর্মীদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দল এখন ঐক্যবদ্ধ। রাজনীতিতে নেতৃত্বের প্রতি সবারই একটা আকাঙ্ক্ষা থাকে। কিন্তু পদ না পেলেই রাজনীতি করার সুযোগ থাকবে না সেটা আমি মনে করি না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সবকিছু ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। তার সিদ্ধান্তের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। অঙ্গসংগঠনের কমিটিতে রাখেনি বলে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখব এমনটা আমি বিশ্বাস করি না।

ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণার পরও পদ না পেয়ে ক্ষোভে অনেকেই দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরে রাখেন। মহানগর উত্তর বিএনপির আগের কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবদুল আলীম নকীকে নতুন কমিটিতে না রাখায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। বিরত থাকেন দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে। কিন্তু সম্প্রতি দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়েছেন এ নেতা। রাজধানীতে বিক্ষোভ-সমাবেশে তার সরব উপস্থিতি দেখা যায়।

একইভাবে মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি বজলুল বাছিত আঞ্জুও দীর্ঘদিন পর সক্রিয় হয়েছেন। নকী ও আঞ্জুর মতো নিষ্ক্রিয় থাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ এবং বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের অনেক নেতাকর্মীই এখন দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হচ্ছেন। রাজধানীর বাইরে তৃণমূলেও একই চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এছাড়া নির্বাহী কমিটির অনেক নেতাকেও দেখা যাচ্ছে মিছিল সমাবেশে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা পালন করেন চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। সম্প্রতি প্রায় প্রত্যেকটি সমাবেশেই তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাখছেন বক্তব্যও।

জানা গেছে, সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন বিভিন্ন সময়ে দলের বহিষ্কৃত নেতারা। দলের হাইকমান্ডেরও তাদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। সারা দেশের শতাধিক নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দলের এমন সিদ্ধান্তের পর অনেকেই বহিষ্কার প্রত্যাহারে কেন্দ্রে আবেদন করছেন। শিগগিরই তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, হামলা-মামলা করে বিএনপিকে ধ্বংস করার নীল নকশা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। কিন্তু সরকারের এমন কর্মকাণ্ডে বিএনপি আরও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নেতাকর্মীদের ঐক্য আরও সুদৃঢ় হয়েছে। নিজেদের মধ্যে মান-অভিমান ভুলে ক্ষমতাসীনদের হামলা মোকাবিলায় সবাই একসঙ্গে মাঠে আছেন।

তিনি বলেন, এ সরকার দেশের গণতান্ত্রিক সিস্টেমটাকে ভেঙে ফেলেছে। ভোট বলতে দেশে কিছু নেই। মানুষ এ অবস্থার পরিবর্তন চায়। গণমানুষের দল হিসাবে বিএনপি সেই কাজটিই করছে। সরকার পতনের আন্দোলনে আমাদের প্রতিটি নেতাকর্মীই জীবন বাজি রেখে রাজপথের চূড়ান্ত আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সর্বশেষ