ইডেনে কী হচ্ছে এসব

 

স্বস্তি ফেরেনি ইডেন কলেজ ক্যাম্পাসে। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের পর কমিটি স্থগিত, ১৬ নেত্রী-কর্মীকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হলেও এখনো ক্যাম্পাসে অস্বস্তি কাটেনি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও দিন কাটাচ্ছেন শঙ্কার ভিতর দিয়ে। এমন পরিস্থিতিতেও কলেজের অধ্যক্ষকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকাই পালন করতে দেখা যায়নি। তার রহস্যজনক ভূমিকায় শিক্ষা সংশ্লিষ্টসহ অভিভাবকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অভিজ্ঞ মহলের প্রশ্ন, ইডেন কলেজে কী হচ্ছে এসব।

ইডেনে কী হচ্ছে এসব

ইডেন কলেজে গতকাল মানববন্ধন

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের একাধিক নীতি নির্ধারণী ফোরামের নেতা জানিয়েছেন, ইডেন কলেজের ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি ছাত্রলীগের কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে আরও কেউ যদি দোষী প্রমাণিত হয়, সেক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু বহিষ্কৃত নেত্রীরা ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে চাচ্ছে গণমাধ্যমে লাগাতার মিথ্যাচার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের লক্ষ্য ছাত্রলীগকে বিতর্কিত করা এবং আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সুমা মল্লিক পপি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌস সাবেক নেত্রীদের বেশকিছু রুম দেখভাল করেন। সেসব রুম টাকার বিনিময়ে গণহারে বরাদ্দ দেন। কলেজ প্রশাসন রুম ছাড়তে ছাত্রলীগের ওপর চাপ প্রয়োগ করলে মূল ঝামেলা শুরু হয়। জান্নাতুল ফেরদৌসের মূল টার্গেট ছিল সভাপতিকে বিতর্কিত করা। সভাপতিকে কোনোভাবে সরাতে পারলে পদাধিকার বলে সভাপতির দায়িত্ব পেতেন। সে কারণে গণমাধ্যমে মিথ্যাচার করেছেন যার বাস্তবতা নেই। এর পেছনে সরকারবিরোধী গোষ্ঠী যুক্ত হয়েছে।’ বিষয়টি আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে খতিয়ে দেখার দাবি করেন পপি।

জানা যায়, হল দখল, সিটবাণিজ্য নিয়েই মূলত ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে আসে। এরপর হামলা-পাল্টাপাল্টি হামলা, চুলোচুলির ঘটনা ঘটে। এরপর বহিষ্কার ও কমিটি স্থগিত করা হয় কেন্দ্র থেকে। বহিষ্কৃত অনেক নেত্রীর দখলে রয়েছে একাধিক হল। তারা সাবেক কমিটির আহ্বায়ক, যুগ্ম আহ্বায়কের অনুসারী হিসেবে হলগুলো দেখভাল করে আসছিলেন। গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টায় ইডেন ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা ও সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। এর আগে এই দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের প্রতিবাদ ও বহিষ্কৃত নেত্রীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে কলেজের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে এর আয়োজন করা হয়। শতাধিক শিক্ষার্থী এ মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নেন। শিক্ষার্থীরা ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ী বহিষ্কৃত ১৬ নেত্রীর প্রশাসনিক শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন তারা। ইডেন কলেজের ছাত্রীদের নিয়ে বহিষ্কৃত কয়েক নেত্রী গণমাধ্যমে যে আপত্তিকর মন্তব্য দিয়েছেন তার প্রতিবাদ জানান তারা। 

ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনা যেন স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতি বছরই থেমে থেমে চলে এসব ঘটনা। এর নেপথ্যে কাজ করেছে সিটবাণিজ্যসহ নানা ধরনের চাঁদাবাজি। এ লক্ষ্যে আধিপত্য বিস্তারে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। বিভিন্ন সময়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুবার ছাত্রলীগের কলেজ কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা-কর্মীকে। কিন্তু আসেনি কোনো কার্যকর ফল। আর রহস্যজনক কারণে সব সময়ই ‘নীরব দর্শকের’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। কখনই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার নজির নেই। ফলে পুনরাবৃত্তি ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা।

২০১৪ সালের ২৪ জুন রাতে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখাকে কেন্দ্র করে ইডেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি জেসমিন আক্তার নিপা এবং সাধারণ সম্পাদক ইশরাত জাহান অর্চির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওইদিন রাতে আর্জেন্টিনা ও ইরানের মধ্যে খেলা চলাকালে সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের একদল মেয়ে এসে খেলা বাদ দিয়ে হিন্দি সিরিয়াল দেখতে চায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সভাপতি গ্রুপের কর্মীরা। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ ঘটনায় দুজন আহত হন। ঘটনার দুই দিন পর সভাপতি ক্যাম্পাসে এলে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আগের ঘটনার জের ধরে আয়েশা সিদ্দিকা হলের সামনে আবার শুরু হয় সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষের ঘটনায় তৎকালীন ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি।

সর্বশেষ