পর্যটন পুনরুদ্ধারে পথনকশা নেই

বৈচিত্র্যপূর্ণ পর্যটনসম্পদ থাকা সত্ত্বেও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে পেছনের সারিতে বাংলাদেশ। করোনা মহামারির সংকট থেকে উত্তরণে এশিয়ার অনেক দেশ পর্যটক আকর্ষণে নানা উদ্যোগ নিলেও বাংলাদেশে উল্টো চিত্র। বাংলাদেশ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করতে যেমন দেরি হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত—এই তথ্যও ঠিকভাবে প্রচার করা হয়নি।

মহামারির আগে ২০১৯ সালে দেশে তিন লাখ ২৩ হাজার পর্যটক এলেও করোনা-পরবর্তী সময়ে পর্যটকের হিসাব দিতে পারছে না দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সংকট উত্তরণে কার্যকর পথনকশা না থাকা, প্রচার-প্রচারণার অভাব, দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, অদক্ষতা, বিনিয়োগের অভাবে নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের পর্যটন।

অথচ কক্সবাজারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার কুয়াকাটা, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, নিঝুম দ্বীপ, চা-বাগান, নদী, পাহাড়, হাওর, পুরাকীর্তিসহ নানা আকর্ষণ আছে বিদেশি পর্যটকদের জন্য। সঙ্গে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এক দশকের অবকাঠামো উন্নয়ন—কোনো কিছুই কাজে লাগাতে পারছে না পর্যটন খাত।

বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচকে ১১৭টি দেশের মধ্যে একেবারেই পেছনের সারিতে বাংলাদেশের অবস্থান, ১১০তম। ২০১৯ সালে ছিল ১১৩তম।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল বলছে, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের পর্যটন খাত যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও পর্যটনশিল্প নবজাতক পর্যায়ে রয়ে গেছে। দেশের জিডিপিতে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের অবদান ২.২ শতাংশ। আর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান ১.৮ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশের চেয়ে দুর্বল অবকাঠামো নিয়েও পর্যটনে অনেকটা এগিয়ে নেপাল। দেশটির জিডিপিতে এই খাতের অবদান ৯ শতাংশ।

করোনার ক্ষতি কাটাতে নেই বড় উদ্যোগ

মহামারির প্রভাবে দেশের পর্যটন খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। এ সময়ে বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা ছিল না বললেই চলে। একটি জরিপের তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, করোনায় পর্যটন খাতে চাকরি হারিয়েছে এক লাখ ৪১ হাজার মানুষ। মোট ক্ষতির মধ্যে পরিবহনে ৪০ শতাংশ, হোটেলে ২৯ শতাংশ এবং রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় ক্ষতি ২৫ শতাংশ। কিন্তু কভিড-১৯-এর ধাক্কা সামলে আবারও নতুন করে পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়াতে নেই বড় কোনো কর্মসূচি।

উদ্যোক্তারা যা বলছেন

পর্যটন খাতের শীর্ষ সংগঠন ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের যথেষ্ট পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে, কিন্তু আমরা বিশ্বের কাছে সেভাবে তুলে ধরতে পারছি না। এ দায় সর্বদা সরকারের ও ট্যুরিজম বোর্ডের। যাঁরা বিদেশি দূতাবাসগুলোতে বাংলাদেশের পতাকা বহন করেন, সেখানেও আমাদের পর্যটনসংক্রান্ত কার্যক্রম নেই বললেই চলে। সম্ভাবনাময় বাজার যেমন—ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইংল্যান্ড, চীনে আমাদের প্রচারণা বাড়াতে হবে। ’

সেন্টার ফর ট্যুরিজম স্টাডিজের চেয়ারম্যান জামিউল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের আন্তরিকতার অভাব, পৃথক ও শক্তিশালী মন্ত্রণালয় না থাকা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সঠিক পরিকল্পনার অভাব, পর্যটন ব্যবস্থাপনার অভাব, পর্যটন আইনের অভাব, অর্থের অভাব, পর্যটনসম্পদ চিহ্নিত না করা, গবেষণা না করা, পর্যটন তথ্যভাণ্ডার না থাকা, শিল্প সহায়ক সুবিধা নিশ্চিত না করা, দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত না করা, ট্যুরিজম স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও ঐক্য না থাকা পর্যটনে পিছিয়ে পড়ার কারণ।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় ট্যুর অপারেটরদের সংগঠন প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব তৌফিক রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে প্রধান সংকট সরকারি মহলের সমন্বয়হীনতা। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, নৌপরিবহন, বন ও পরিবেশ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়হীনতাই এই মুহূর্তে বড় সংকট। এর পরও দেশে পর্যটনে যা কিছু দৃশ্যমান, তা বেসরকারি খাত থেকেই হয়েছে। ’

জানতে চাইলে ট্যুরিজম ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিডাব) চেয়ারম্যান সৈয়দ হাবিব আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের হোটেলগুলোর এখনো সঠিক স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা যায়নি। অনেকে টু স্টার মানের না হলেও ফাইভ স্টার হিসেবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তদারকি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটকদের আরো ভালো সেবা দেওয়ার জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দরকার, যেগুলো অন্যান্য দেশে আছে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ’

যা বলছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আবু তাহের মো. জাবের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শেষ করব। মাস্টারপ্ল্যানে দুই ধাপে আমরা এক হাজার ৫১টির বেশি পর্যটন আকর্ষণ চিহ্নিত করেছি। এগুলো নিয়ে স্থাপত্য, বিনিয়োগ ও মার্কেটিং পরিকল্পনা করা হবে। সেগুলোতে সরকার কিছু বিনিয়োগ করবে। একই সঙ্গে আমরা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করব। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এখনো পর্যটনের হালনাগাদ তথ্য নেই। তবে করোনার ক্ষতি আমরা নিরূপণ করেছি। ’

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, ‘আমরা বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা অবকাঠামো সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। এখন টেকসই পর্যটন উন্নয়ন নিশ্চিতে পদক্ষেপ নিচ্ছি। ’

করণীয়

বিআইডিএসের মহাপরিচালক বিনায়ক সেন বলেন, ‘করোনা সংকটে অন্যান্য খাতকে টেনে তুলতে সরকার যেভাবে উদ্যোগ নিয়েছে, সেভাবে পর্যটন খাতে দেখিনি। উদ্যোগ থাকলে এই খাতে এত ক্ষতি হতো না। এমনকি এতসংখ্যক মানুষ কাজও হারাত না। এখন পর্যটন খাতেও সরকারের নজর দেওয়া জরুরি।

সূত্র: কালেরকন্ঠ

সর্বশেষ