Wednesday, October 5, 2022
Homeঅর্থনীতিডিমের বাজার ফের অস্থির

ডিমের বাজার ফের অস্থির

 

গত মাসের মাঝামাঝি দাম কমে স্থিতিশীল থাকার পর ডিমের বাজারে আবারো নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। সপ্তাহ খানেকের ব্যবধানে ফের ডজনে ডিমের দাম বেড়েছে ২০-২৫ টাকা। বাজারে এখন বিক্রি হচ্ছে প্রতি ডজন ১৪৫ টাকায়। তবে মহল্লার দোকানে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা দরে। ডিমের দাম আবারো বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পোল্ট্রি ফিড ও পরিবহন খরচ বাড়ায় মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে। আর খুচরা বিক্রেতারা জানান, ডিমের দাম আরও বাড়তে পারে। তবে অনেকেই বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা আবারো ডিম নিয়ে খেলা শুরু করেছে। ডিমের দাম যতটা বেড়েছে, ততটা বাড়ার কথা নয়। শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে ও সংশিশ্লষ্টদের সঙ্গে কথা  বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

 

রাজধানীর খুচরা বাজার ও বিভিন্ন মহল্লার দোকান ঘুরে দেখা গেছে, দেশের বাজারে ফার্মের মুরগির দুই ধরনের ডিম পাওয়া যায়; সাদা ও লালচে বাদামি। বাজারে ফার্মের মুরগির লাল ডিম ৪৫ টাকা হালি কেনা যাচ্ছে। তবে মুদি দোকানগুলোতে তা ৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর মহল্লার দোকানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। ফার্মের মুরগির সাদা ডিম কিছুটা কমে পাওয়া যাচ্ছে। দোকানগুলোতে সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে হালিপ্রতি ৪০ টাকা। তবে এক ডজন কিনলে মোটের ওপর ৫ টাকা কম রাখা হচ্ছে। 

আর ৩০টি কিনলে কোথাও কোথাও ১০ টাকা কমে মিলছে।  টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, ফার্মের মুরগির ডিমের হালি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৪৭ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। সে হিসেবে কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ২.৩৫ শতাংশ। জানা গেছে, গত আগস্ট মাস থেকেই ডিমের দামে চলমান অরাজকতা শুরু হয়েছে। ওই সময় বিক্রেতাদের অজুহাত ছিল পরিবহন খরচ এবং পোল্ট্রি ফিডের মূূল্যবৃদ্ধি। প্রতি ডজন ডিমের দাম তখন গিয়ে দাঁড়ায় ১৬০ টাকায়। এর আগে কখনো ডিমের দামের এতটা বৃদ্ধি দেখা যায়নি। তবে ডিম আমদানির ঘোষণার পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের ফলে সেই দাম কমে ১২০ টাকা হয়। ফের একই অজুহাতে ডিমের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাই আবার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান ও সংশ্লিষ্টদের কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা।

রামপুরা বাজারের ডিম বিক্রেতা হযরত আলী বলেন, বুধবার রাত থেকে ডিমের দাম হুট করে বেড়েছে। তার আগেও দুদিন দাম বেড়েছে। তবে সেটা ৫/৭ টাকা। বৃহস্পতিবার সকালে পাইকারিতে দাম ১৪০ টাকা ঠেকেছে। তিনি বলেন, মঙ্গলবারেও তিনি প্রতি একশ’ ডিম ১০৫০ টাকায় কিনেছেন, যা এখন ১১৭০ টাকা। এ হিসেবে প্রতিটি ডিমের দাম পড়ছে ১১ টাকা ৭০ পয়সা, যা অন্যান্য খরচ মিলে এখন সাড়ে ১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে ডিমের সরবরাহ কমের জন্য দাম বাড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।  তেজগাঁও আড়তের ডিমের পাইকার ব্যবসায়ী নাজিম উদ্দিন বলেন, চলতি সপ্তাহের হুট করে আবারও ডিমের দাম অস্থিতিশীল হয়েছে।  মালিবাগের বাসিন্দা আফজাল বলেন, সব কিছুর দাম এখন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। মানুষ এখন ডিম কেনা কমিয়ে দিয়েছে। এমন অবস্থায় গরিব মানুষ অনেকে ডিম খাওয়া ছেড়ে দিবেন। মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাচ্ছে। কাপ্তান বাজারের এক পাইকারি ডিম ব্যবসায়ী বলেন, সারা দেশে দিনে ৪ কোটি ডিমের চাহিদা। এই চাহিদার বিপরীতে এক দিনে ২০ থেকে ২৫ লাখ ডিম কম সাপ্লাই দেয়া হলেই ডিমের বাজার অস্থির হয়ে পড়ে।

এখন আবার দাম বাড়ার পেছনে প্রধান কারণই হচ্ছে এটি। হঠাৎ করেই ডিমের সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। মূলত দাম বাড়ানোর জন্যই এটি করা হয়েছে।  সূত্র জানায়, গত মাসে যখন ডিমের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছিল তখন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ডিম, ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির দাম বাড়িয়ে ভোক্তা ও ক্ষুদ্র খামারিদের কাছ থেকে ৫২০ কোটি টাকা লুটে নিয়েছে পোলট্রি খাতের সিন্ডিকেট চক্র। এ অভিযোগ করেন সাধারণ খামারিরা। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত রয়েছে পোল্ট্রি খাতের করপোরেট ১০-১২টি দেশি-বিদেশি কোম্পানি। সংবাদ সম্মেলন করেও এমন তথ্য জানানো হয়। পরবর্তীতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন অভিযানে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডিমের দামে সিন্ডিকেটের প্রমাণ মেলে। কাজী ফার্মসের বিক্রয় কেন্দ্রে ডিমের দাম এক রাতে ৩ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করার তথ্য পাওয়া যায় সেই অভিযানে। এরপর ওইসব কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একটি প্রতিবেদন দেয় ভোক্তা অধিদপ্তর। তবে এরপর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত নেয়া হয়নি। বাংলাদেশ এগ প্রডিউসার এসোসিয়েশনের সভাপতি তাহের আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে ডিমের বাজার অস্থিতিশীল করতে একটি চক্র সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছে। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এর আগেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

তখন সরকারের পদক্ষেপে দাম কমে যায়। এ জন্য নিয়মিত বাজার তদারকি দরকার। তার মতে, খামারে ডিমের দাম বাড়েনি। উৎপাদনও কমেনি। আমরা ডিম উৎপাদন করলেও দাম নির্ধারণ করতে পারি না। আমরা তো এক টাকাও বাড়তি পাচ্ছি না। আড়তদার আর বড় বড় কোম্পানি সিন্ডিকেট করছে। তারা দিনে ৫ লাখ ডিম উৎপাদন করে। ২ টাকা দাম বাড়াতে পারলে দিনে ১০ লাখ টাকা লাভ করেন। তারাই দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। খামারিরা জানান, খামার পর্যায়ে প্রতি পিস ডিম বিক্রি হয় ৯ টাকা ৫০ পয়সায়। অর্থাৎ হালি পড়ে ৩৮ টাকা আর ডজনের দাম আসে ১১৪ টাকা। অথচ তিন থেকে চার হাত ঘুরে সেই সাড়ে ৯ টাকার ডিম ভোক্তার হাতে এসে পৌঁছাচ্ছে ১২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১৩ টাকায়। হালি পড়ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকা, আর ডজন পড়ছে ১৫০ থেকে ১৫৬ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিটি ডিমে বেশি পড়ে সাড়ে ৩ টাকা, হালিতে বেশি হচ্ছে ১২ থেকে ১৪ টাকা এবং ডজনে বেশি হচ্ছে ৩৬ থেকে ৪২ টাকা পর্যন্ত। অথচ প্রতিটি স্তরে ডিমপ্রতি সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ পয়সা লাভ করার কথা, কিন্তু লাভ করা হচ্ছে প্রতিটি স্তরে এক টাকারও বেশি। এ কারণেই ডিমের দাম বাড়ছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মঞ্জুর শাহরিয়ার বলেন, আমরা যেখানে যাচ্ছি হয়তো সেখানে কিছুক্ষণ সব ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু কয়েকদিন পর আবার যা তাই হচ্ছে। যার যার জায়গা থেকে সবাইকে ঠিক হতে হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular