Sunday, October 2, 2022
Homeসম্পাদকীয়একজন মানবিক মানুষের গল্প

একজন মানবিক মানুষের গল্প

জীবনের কোন এক সময়ে প্রখ্যাত লেখক ইব্রাহিম খাঁর একটি অসাধারণ ছোটগল্প পড়েছিলাম। গল্পটির নাম ভাঙ্গা কুলা। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ,অসহায়,বঞ্চিত,মানুষের কথা এলে গল্পটির কথা মনে পড়ে। বিশেষ করে যখন দেখি কিছু নিবেদিতপ্রাণ লোক নিঃস্বার্থভাবে অন্যের সেবা করেন এবং করে যাবার শপথ নেন। গল্পটির সঙ্গে আমার আজকের গল্পের অনেকটা মিল আছে। গল্প বললে মনে হয় ভুল করবো। কারণ, আমি বাস্তব ঘটনা তুলে ধরছি। বর্তমানে ‘ভাঙ্গা কুলা’ গল্পটি পাঠ্যবইয়ে কোনো ক্লাসে পড়ানো হয় বলে আমার সঠিক জানা নেই।
গল্পটি লেখা শুরু করলে শেষ হবে না, তবে শেষ করতে চাই সংক্ষিপ্ত বিবরনের মাধ্যমে,

মানুষের সেবা আর সৃষ্টির সেবাতেই রয়েছে সষ্ট্রার সন্তুষ্টি, তাই বলতে হয় মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই নহে কিছু মহিয়ান। পৃথিবীতে যা কিছু মঙ্গল এবং কল্যানকর তার কোন কিছু ই থেমে থাকে না। জীবন প্রদীপ এক সময় নিভে যাবে কিন্তু মঙ্গল প্রদীপ কখনোই নির্বাপিত হবে না।
“জীবন প্রদীপ নিভে যাবে কিন্তু মঙ্গল প্রদীপ কখনোই নির্বাপিত হবে না” ঠিক যেনো এই কথাকেই জীবনের সূত্র হিসেবে মেনে নিয়েছেন এক যুবক, যার গল্প শুনাতে চাই আপনাদের।

বেশিদিন আগের কথা না যখন আকস্মিক বন্যায় সিলেট, সুনামগঞ্জ,হবিগঞ্জ জেলার বেশির ভাগ মানুষ ছিলো পানিবন্দী,নিজেদের বাড়ি-ঘর হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো সরকারি আশ্রয়ন প্রকল্পে। অনাহারে,অর্ধাহারে অসহায় মানুষগুলো যখন কোন রকম বেঁচে থাকার আশায় দিনযাপন করছে তখনই তাদের জন্য খাদ্য,ঔষধ,নগদ অর্থ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে যান একজন যুবক। যিনি এক মাসের ব্যাবধানে সিলেট,সুনামগঞ্জ,হবিগঞ্জের বর্ন্যাত মানুষের জন্য দুইবার নগদ অর্থসহ খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছেন সূদুর প্রবাসে থেকেও।

সবারই মনে থাকার কথা বিশ্বব্যাপী করোনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। সবাই আতঙ্কিত ও শঙ্কিত। এটা এমনই এক ভাইরাস, কেউ আক্রান্ত হলে বা মারা গেলে তার পাশে কেউ যাচ্ছে না। এই দুর্যোগকালে লকডাউনের জন্য অনেকে বাড়ির বাইরে যেতে পারছে না। খেটে খাওয়া দিনমজুর ও অনেক মধ্যবিত্ত মানুষও খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে অর্ধাহারে বা অনাহারে দিন অতিবাহিত করছে।
এসব অর্ধাহারে বা অনাহারে দিন অতিবাহিত করা মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা, বাড়িতে বাড়িতে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া, অনলাইন ব্লাড ব্যাংকের মাধ্যমে জরুরি রক্তের প্রয়োজনে রক্তের ব্যবস্থা করা, বিনা মূল্যে গরিব মানুষের মধ্যে মাস্ক বিতরণ, মসজিদসহ বিভিন্ন অপরিষ্কার স্থান ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করা, মসজিদে মসজিদে হাত ধোয়ার জন্য সাবান দেওয়া, নিজের কষ্টে উপার্জিত অর্থে এমন অনেক কাজ নিঃস্বার্থভাবে করে যাচ্ছেন নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার এক যুবক, যাঁর নাম মোঃ সোহরাব হোসেন সৌরভ।

শুধু করোনাভাইরাসের সময় নয়, স্কুলজীবন থেকেই নিঃস্বার্থভাবে নীরবে মানুষের সেবা করতেন তিনি। মানুষের উপকার বা সেবা করাই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। ছোট সময়ের সেই ধ্যানজ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ইউসুকা ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। আর্থ-মানবতার সেবা বৃহৎ আকারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিবার জন্যই গড়ে তুলেন ইউসুকা ফাউন্ডেশন। নিজের আয়ের একটা বৃহৎ অংশ প্রতি মাসেই তিনি এই ফাউন্ডেশনে দিয়ে থাকেন। আর এই ফাউন্ডেশন থেকেই এখন তার মানবসেবার সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। ফাউন্ডেশন পরিচালনার জন্য রয়েছে তার বিশ্বস্ত একদল নিবেদিত প্রান কর্মী।
অনেক অসহায় মানুষের আস্থার শেষ ঠিকানা মোঃ সোহরাব হোসেন সৌরভ। এলাকার অসহায় গরিব মানুষের ক্যানসার, ব্রেন টিউমার, প্যারালাইসিস ও দুর্ঘটনায় বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হলে তাদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন মানবপ্রেমী এই মানুষটি।
এই তো খুব বেশিদিন আগের কথা না, আগুনে পুড়ে যখন গোটা পরিবারটি রাস্তায় বসার উপক্রম তখনই সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসেন সৌরভের প্রতিষ্ঠিত ইউসুকা ফাউন্ডেশন। নতুন ভাবে তৈরি করে দেন অসহায় পরিবারটির বসতবাড়ি। এটা শুধু একটি উদাহরণ মাত্র, এমন অসংখ্য অসহায় মানুষদের থাকার জন্য গৃহ নির্মান করে দিচ্ছে ইউসুকা ফাউন্ডেশন।

শুধু অসহায় বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নয় মোঃ সৌরভের ইউসুকা ফাউন্ডেশন। সামাজিক যে কোন কাজে সবার আগে সহযোগিতার হাত বাড়িতে দেন এই মানুষটি। নিজের টাকায় ইতিমধ্যে নিজ বাড়ির পাশেই নির্মান করেছেন দৃষ্টি নন্দিত মসজিদ। শুধু নিজের বাড়ির মসজিদ নির্মানেই থেমে থাকেন নি তিনি বরং মনোহরদী উপজেলার অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানায় নিয়মিত সহযোগিতা করছেন বিনয়ী এই মানুষটি। উনার কাছে সহযোগিতা চেয়ে সাহায্য পান নি এমন মানুষের সংখ্যা বিরল। মোঃ সৌরভ নিজেই বলে থাকেন আমার দরজা সকলের জন্য উন্মুক্ত আমার সামর্থ্য অনুযায়ী সকলের পাশেই আমি থাকবো কেউ খালি হাতে ফেরত যাবে না আমার কাছ থেকে।

নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার খিদিরপুর ইউনিয়নের ডোমনমারা গ্রামের এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম মোঃ সোহরাব হোসেন সৌরভের। বাবা দুদু মিয়া ও মা জরিনা বেগমের ৪ সন্তানের মধ্যে ২য় মোঃ সৌরভ। বয়স খুব বেশি হবে না, ৩৪ বা ৩৫ । কৃষ্ণপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৯ম শ্রেনী পড়া অবস্থায় জীবন ও জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান সূদুর মালয়েশিয়ায়। বিদেশের মাটিতে থেকেও দেশ আর দেশের মানুষদের নিয়ে চিন্তা করেন এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এ ক্ষেত্রে মোঃ সৌরভ অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যার চিন্তা চেতনায় সবসময়ই থাকে দেশ প্রেম আর অসহায় বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।

অসহায় মানুষের পাশে থেকে তাদের জন্য কিছু করতে পারলে আনন্দ খুঁজে পান তিনি। এলাকার অনেক যুবকের আদর্শ এখন তিনি। উনাকে দেখে অনেক মানুষই এখন নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। দেশের দুর্যোগকালে নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার মোঃ সোহরাব হোসেন সৌরভের মতো নিঃস্বার্থ পরোপকারী উদ্যোমী যুবকের সারা দেশে খুবই প্রয়োজন। মানব সেবার ব্রত নিয়েই যার পথচলা তাকে রুখবে এমন সাধ্য কার?
কবি গুরুর একটি কথা বলেই শেষ করতে চাই বাস্তব এই গল্পটি, ধরায় উঠেছে ফুটে শুভ্র সুন্দর গোলাপের মতো সন্তান, ননন্দের এনেছে সংবাদ, ইহাকে করো আশির্বাদ।

লেখকঃ মাসুম বিল্লাহ, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক. জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল ময়মনসিংহ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular