Wednesday, October 5, 2022
Homeজাতীয়দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ধুঁকছেন ফুটপাথের ব্যবসায়ীরা

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ধুঁকছেন ফুটপাথের ব্যবসায়ীরা

তপ্ত দুপুরে চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ ৭২ বছর বয়সী আরশ আলীর। বিক্রির জন্য কলার পসরা সাজিয়ে বসেছেন ফুটপাথে। অপেক্ষা ক্রেতার। বিশ বছর ধরে ক্ষুদ্র এই ব্যবসা করে অভাবের সংসার সচল রেখেছেন। বয়সের ভাড়ে দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকতে পারেন না তিনি। ঘুমে টলোমলো তার চোখ। পরিবারের সবাইকে ছেড়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য ছুটে এসেছেন শহরে। স্ত্রী ও ৬ ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সংসার। পরিবারের সদস্যদের জন্য দু’মুঠো খাবার জোগাতে মরিয়া তিনি। শরীরে বয়সের ভাঁজ পড়লেও এখনো জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

কিন্তু বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে থমকে গেছে তার এই যুদ্ধ। দিন ফুরালেও ঘুরছে না আর আরশ আলীর জীবনের চাকা।  শুধু আরশ আলী নয়, এই শহরে ফুটপাথে ব্যবসা করে সংসারের চাকা সচল রাখেন অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকে বদলাচ্ছেন পেশা। শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন গ্রামে। তারা স্বল্প জিনিসপত্র নিয়ে ফুটপাথে ব্যবসা করেন। বাবা-মা ও পরিবারকে নিয়ে দেখেন স্বপ্ন। পান-সিগারেট, সবজি, পেয়ারা, আখের রস, ফল, জুতা, পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ফুটপাথে। অনেকে বিশ-ত্রিশ বছর ধরে এই ব্যবসার আয় দিয়ে সংসারের খরচ চালান। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে তারা কেউ ভালো নেই।  আরশ আলী বলেন, বেচাবিক্রি একদম নেই। গত বিশ বছর ধরে এই ব্যবসা করি। এখনকার মতো অবস্থা কখনো হয়নি। সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এভাবে আর দিন চলে না। সারাদিন বসে থাকলেও বিক্রি নেই। ভাত না খেয়ে মানুষ থাকতে পারে না কিন্তু এসব না খাইলেও মানুষের চলে। আমি তো গরিব মানুষ এই ছোট ব্যবসা ছাড়া কী করবো। ভারি কিছু করতে পারি না। বেশিক্ষণ হাঁটতেও পারি না। হাঁটলে দুই পা লেগে আসে। বেশিক্ষণ বসতেও পারি না। এই অল্প অল্প জিনিস নিয়ে সকাল ৮টায় বেরিয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত বসে থাকি। দিনে ৩ থেকে ৪শ’ টাকা আয় হয়। এই আয় দিয়ে সংসার চলে না। পরিবারের সবাই গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে থাকে। তাদেরকে টাকা পাঠাতে হয়। এখন ঠিকমতো তাদের টাকা পাঠাতে পারি না। ঢাকায় কাজীপাড়ায় থাকি। আমি হোটেলে খাবার খাই। সেখানেও অনেক খরচ। আগে ৩০ টাকায় একবেলা খেতাম আর এখন ৫০ টাকায়ও খাবার মেলেনা।  সুশেন সিকদার (৬৮)। বিশ বছর ধরে ফুটপাথে ব্যবসা করেন। বলেন, আগে অনেক বিক্রি হতো। এখন ক্রেতাদের পকেটে পয়সা নেই। আমার পকেটে টাকা নেই। সবকিছুর দাম বাড়তি। দ্বিগুণ খরচ হলে মানুষ বাঁচবে কি করে। আজ দুপুরে হোটেলে করলা ভাজি ও মাছ ছাড়া মাছের মসলা দিয়ে খেয়েছি। এতেই ৫০ টাকা খরচ। তাল, কাঁঠাল, চালতা এসব বিক্রি করে এতটাকা পাবো কই? আমার ৩ মেয়ে, কোনো ছেলে নেই। খরচ কমাতে কখনো কখনো রাস্তায় থাকি। আবার কখনো মেসে থাকি। তিনি বলেন, দিনে ৩ থেকে ৪শ’ টাকা আয় হয়। বাড়িতে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারি না। আগে সপ্তাহে ২-৩ হাজার টাকা পাঠাতাম। এখন এক হাজার টাকাও পাঠাতে পারি না। এত বছরের কাজে এত কষ্ট কখনো করতে হয়নি। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। এখন ছোট মেয়েটা বাকি আছে। সে পড়াশোনা করে। আগে হোটেলে তিনবেলা খাইতাম এখন এক বেলা ভাত ও এক বেলা রুটি খাই। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ। সেখানে কোনো বাড়িঘর, জমিজায়গা নেই। বাবা অনেক আগে ভারতে যাওয়ার জন্য সব বিক্রি করে দিয়েছে। এখন পরের জায়গায় কোনোমতে থাকি।  সালমা বেগম ফুটপাথে সাজিয়ে বসেছেন মরিচ, ঢেঁড়শ, কচুর লতিসহ অন্যান্য সবজি। তিনি বলেন, আমরা না খেয়ে থাকলে কেউ কী খবর রাখে। গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিলাম অভাব ঘোঁচাতে। কিন্তু এতদিন খেয়ে পরে কোনোমতে চললেও সেই পুরনো অভাব আবার শুরু হয়েছে। বাজারে যাই কিনতে যাই সবকিছুরই দাম বাড়ছে। আমাদের তো বিক্রি বাড়ে না। আমার স্বামী ৫ বছর আগে মারা যান। সেই থেকে ৩ মেয়েসহ ফুটপাথে ব্যবসা করে সংসার চালাই। ৩০ বছর আগে গ্রামের বাড়ি বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছি। আজমল হোসেন বলেন, ৫ বছর ধরে ঝুড়িতে করে পেয়ারা বিক্রি করি। দিনে যা আয় হতো তা দিয়ে সংসার ভালোভাবে চলে যেতো। এখন দেখি আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। কখনো কখনো না খেয়ে দিন পার করতে হয়। আর্থিক সংকট থাকায় বড় কিছু নিয়ে ব্যবসা করতে পারি না। স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে ঢাকার তেজকুনি পাড়ায় থাকে। মাসে ঘর ভাড়া ৬ হাজার টাকা দিতে হয়। এক কেজি চাল আর তেল কিনলে টাকা শেষ। এই ব্যবসা দিয়ে ঘর ভাড়ার টাকাটি ঠিকমতো উঠাতে পারি না। অভাবের কারণে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছি। এখন কী আমরা সবকিছুর দামের কারণে না খেয়ে মরবো? নাকি ঢাকা ছেড়ে যাবো। তিনি আরও বলেন, বাড়িতে গিয়েও কোনোকিছু করার উপায় নেই। শুধু একটা ভিটে আছে। জমি থাকলে চাষাবাদ করে খেতে পারতাম। সে কপালও আমার নেই।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular