Wednesday, September 28, 2022
Homeক্রাইমহাত বাড়ালেই ক্যাম্পাসে মাদক

হাত বাড়ালেই ক্যাম্পাসে মাদক

অপরাধ বেড়েছে, নির্বিকার প্রশাসন, অভিযোগের তীর ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের দিকে

হাত বাড়ালেই ক্যাম্পাসে মাদক

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাদক বিক্রি ও সেবনের ‘সেইফ জোনে’ পরিণত হয়েছে। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাত বাড়ালে সহজেই মিলছে মাদক। সহজলভ্যতার কারণে হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অনেক ক্যাম্পাসে আবাসিক হলে ছাত্রদের মাদক গ্রহণের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধু-বান্ধবদের পাল্লায় পড়ে ছাত্রীরাও মাদকের মরণনেশায় আসক্ত হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই ক্যাম্পাসে চলে মাদকের কেনা-বেচা। বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের আটক করার পর দেখা গেছে, তারা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। মাদকের অবাধ বিস্তারের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অপরাধমূলক কার্যক্রম বেড়েই চলেছে। কিন্তু মাদক ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কার্যকরী তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম গতকাল প্রতিবেদককে বলেন, একজন শিক্ষার্থী মাদকে আক্রান্ত হবে আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটি জানবে না, হল প্রভোস্ট জানবে না- এটি বিশ্বাস করি না। কোনো কোনো উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন না। তারা যদি দায়িত্ব পালনে অপারগ হন তবে জানিয়ে দিতে পারেন। সরকার সেখানে অন্যকে দায়িত্ব দেবে। আর প্রভোস্ট বা প্রক্টর যদি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করেন, তবে তাদের সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তো উপাচার্যকে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হলগুলোতে মাদক ঢুকে যাচ্ছে, এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই আমি দায়ী করব। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও এর পার্শ্ববর্তী সোহরাওয়াদী উদ্যান মাদকের অন্যতম আখড়া। এখানে মাদকের অন্যতম ক্রেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী ও ঘুরতে আসা মানুষ। সম্প্রতি মাদক ব্যবসার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বে বেলাল নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর মুত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতেও বিভিন্ন সময় মাদক সেবনের অভিযোগ রয়েছে। গত ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র, ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ তিন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। এখনো হলের কিছু কক্ষে গাঁজা সেবন করা হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হলের একটি সূত্র জানিয়েছে। মাদক গ্রহণ ও মাদক ব্যবসার অভিযোগে বিভিন্ন সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খবরের শিরোনাম হতে দেখা গেছে। গত বছরের ২৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রলীগের উপ-দফতর সম্পাদক আকতারুল করিম রুবেল এক মামলায় গ্রেফতার হন। তার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাস-সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে।

জাবিতে বাড়ছে নারী মাদকসেবী : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) দিন দিন বেড়েই চলেছে মাদকের ভয়াবহতা। মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাদ পড়ছেন না নারী শিক্ষার্থীরাও। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বহিরাগতদেরও মাদক সেবনের নিরাপদ স্থান হয়ে উঠেছে এ ক্যাম্পাস। কিন্তু এসব নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ নেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। জানা যায়, জাবিতে যেসব মাদকের বেশি উপস্থিতি চোখে পড়ে তার মধ্যে রয়েছে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল ও দেশি-বিদেশি মদ। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী সিগারেট দিয়ে শুরুর পর ধীরে ধীরে অন্যান্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। আর এসব মাদকের উৎস হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ছাত্রবলয়। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে সবচেয়ে ভয়াবহ যে তথ্য উঠে আসে সেটি হলো- বিশ্ববিদ্যালয়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী মাদকসেবীর সংখ্যা। কারণ হিসেবে মাদকের সহজলভ্যতা, মাদকাসক্ত বন্ধুদের প্ররোচনা ও প্রশাসনিক অবহেলাকেই দায়ী করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু জায়গা সন্ধ্যার পর মাদক সেবনের আখড়ায় পরিণত হয়। এ ছাড়া আবাসিক হলগুলোর ছাদ ও নির্দিষ্ট কিছু কক্ষেও বসে মাদকের আসর। বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে আবাসিক হলগুলোতে মাদক সেবন পরিণত হয়েছে অলিখিত প্রথায়। বহিরাগতরাও মাদক সেবনের জন্যই ক্যাম্পাসে আসেন। সেবন শেষে আবার নির্বিঘ্নে চলে যান। সর্বশেষ গত ১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের পাশ থেকে তিন মাদক বিক্রেতাকে আটক করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, মাদকের ভয়াবহতা রুখতে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্র?য়াসের প্রয়োজন। মাদকসেবী ও মাদক সরবরাহকারী বহিরাগতদের সঙ্গে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরাই জড়িত থাকে। নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে তাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। 

ইবিতে হাতে হাতে মাদক : প্রশাসনের উদাসীনতায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সহজলভ্য হয়েছে মাদক। একই সঙ্গে বেড়েছে মাদকসেবী শিক্ষার্থীরা সংখ্যা। ফলে ক্যাম্পাসে ইভ টিজিং, ছিনতাই, চুরি, মারামারিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতাকেই এজন্য দুষছেন সচেতন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ব্লকের বেশ কয়েকটি রুমসহ বিভিন্ন আবাসিক হলে বসে মাদকের আসর। কক্ষগুলোতে গভীর রাত পর্যন্ত চলে আসর, গানবাজনা ও হই-হুল্লোড়। এ নিয়ে সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু হলের প্রভোস্ট বরাবর লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন সচেতন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু হল পুকুরপাড়, সাদ্দাম হলের সামনের মাঠ, শহীদ মিনার, টিএসসি, মফিজ লেকের প্রাচীরের ওপরে ও ঝোপঝাড়ের আড়ালে ও প্রকাশ্যে চলে মাদক সেবন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আরফিন বলেন, যে রুমগুলোর ব্যাপারে তথ্য পেয়েছি সত্যতা পেলে সেসব রুমের শিক্ষার্থীদের সিট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জানা গেছে, সম্প্রতি ইবি ছাত্রলীগের দুই কর্মী রেজওয়ান সিদ্দিকী কাব্য ও আল আমিন হোসেন ক্যাম্পাসের সামনে মহাসড়কে ট্রাক আটকে ৫ হাজার টাকা ছিনতাই করেন। চাঁদাবাজির এই টাকা দিয়ে তারা মাদক সেবন করেন। তারা ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল সিদ্দিকী আরাফাতের ছত্রচ্ছায়ায় ক্যাম্পাসে নানা অপকর্ম করেন।

চবির ক্যাম্পাস মাদকের আখড়া : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) দিনদিন বাড়ছে মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্য। জানা গেছে, বিভিন্ন আবাসিক হলে বসে মদ, গাঁজা আর ইয়াবার আসর। কিন্তু এসব দেখেও যেন চোখ বুঁজে আছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশন, এ এফ রহমান হলের বিপরীতে ট্যাঙ্কির পাহাড়, টেনিস কোর্ট, স্লুইস গেট, চবি কলেজের পেছনের অংশ, সোহরাওয়ার্দী হলের পেছনের লাল পাহাড়, জাদুঘরের সামনে, ফরেস্ট্রি হ্যালিপ্যাড, ফরেস্ট্রি গ্যারেজের পেছনে, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের পশ্চিমপাড়, চাকসুর পেছনসহ বিভিন্ন স্পট মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলে জানা গেছে।  বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক ব্যবসা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে প্রকাশ্যে মাদকের আসর বসলেও কোনো পদক্ষেপ নেয় না হল প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ছাদ, ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়, খামারসহ বিভিন্ন স্থানে মাদকের আসর বসে বলে জানা গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের মাদকসেবী বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়েই এ নেশা গ্রহণে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। ক্যাম্পাসের ইবলিশ চত্বর, তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের পেছনের তুঁতবাগান, চারুকলা, কৃষি অনুষদের মাঠ, বধ্যভূমি ও পূর্বপাড়ার কোয়ার্টার সংলগ্ন এলাকায় নিয়মিত মাদক গ্রহণ করছেন শিক্ষার্থীসহ বহিরাগতরা। নেশাজাত দ্রব্যের মধ্যে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের ড্রাগ রয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular