Thursday, September 29, 2022
Homeজাতীয়হাওর এলাকার আশংকাজনকহারে জলাভূমি হ্রাস বন্যার ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিচ্ছে : আইপিডি

হাওর এলাকার আশংকাজনকহারে জলাভূমি হ্রাস বন্যার ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিচ্ছে : আইপিডি

হাওর এলাকার আশংকাজনকহারে জলাভূমি হ্রাস বন্যার ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিচ্ছে : আইপিডি

 

ঢাকা ২৪ জুন ২০২২ :

 

বিগত ৩২ বছরে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলার হাওর অঞ্চলের শুষ্ক মৌসুমের জলাভূমির পরিমাণ কমেছে শতকরা প্রায় ৮০ ভা্গের ও বেশি। ফলে হাওর এলাকায়  মৌসুমী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের  ‍কারণে সৃষ্ট পানি ধারণ করবার প্রাকৃতিক ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাবার কারণে বন্যা দূর্যোগ এই এলাকায় নিয়মিতভাবে দেখা যাচ্ছে।

দেশের সিলেট-সুনামগঞ্জসহ উত্তরপূর্বাঞ্চলের অতি সাম্প্রতিক বন্যায় ভয়াবহতা ও ব্যাপকতার পেছনে অতিবৃষ্টির পাশাপাশি হাওর এলাকার জলাভূমি বিনষ্ট হয়ে যাবার দায় রয়েছে অনেক। হাওর এলাকার বর্তমান জলাভূমিসমূহকে বাঁচানোর যথাযথ উদ্যোগ ও হাওর এলাকার হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল, নদী-নালা সমূহের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ও পানিধারণ ক্ষমতাকে বাড়ানো না গেলে আগামী দিনগুলোতেও বন্যার ভয়াবহতা থেকে জীবন-জীবিকা ও প্রাণ-প্রকৃতিকে রক্ষা করা যাবে না।

২৪ জুনজাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ইনস্টিটিউড ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত ’হাওর এলাকার ভূমি ব্যবহারের কয়েক দশকের পরিবর্তন ও এবারের ব্যাপকতা’ “হাওর এলাকার ভূমি ব্যবহারের কয়েক দশকের পরিবর্তন ও এবারের বন্যার ব্যাপকতাঃ গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন ও সংশ্লিষ্ট আলোচনা” শীর্ষক ‘আইপিডি বাংলাদেশ সংলাপে উপরোক্ত পর্যবেক্ষণ ও মতামতসমূহ উঠে এসেছে।

বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. শাকিল আকতার এর তত্ত্বাবধানে  ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) এর সহযোগিতায়   হাওর এলাকার ১৯৮৮-২০২০ সালের শুষ্ক মৌসুমের জলাভূমি এলাকার ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন সম্পর্কিত এই গবেষণাটি করেন   বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও  পরিকল্পনাবিদ ইনজামামউল হক রিফাত, যার গবেষণাকালের ব্যাপ্তি ছিল ২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২২ সালের জুন, যা গবেষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের গবেষণার অংশও ছিল । গবেষণায় ১৯৮৮, ১৯৯৪, ২০০৬, ২০১৩ ও ২০২০ সালের স্যাটেলাইট ইমেজ ক্লাসিফিকেশনের মাধ্যমে তথ্য- উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়।

‘আইপিডি বাংলাদেশ সংলাপে’ গবেষণাটির সারাংশ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউড ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। উক্ত গবেষণার সূত্র ধরে অধ্যাপক আদিল বলেন, ১৯৮৮ সালকে ভিত্তি ধরে হাওর এলাকার জলাভূমি ১৯৮৮ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ৪০ ভাগ কমে যায় এবং ২০০৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আরও ৩৭ ভাগ কমে গিয়ে এখন প্রায় ১৩ ভাগ এলাকা অবশিষ্ট আছে। এর বিপরীতে হাওর এলাকায় নির্মিত এলাকা (বিল্ট আপ এরিয়া) ২০০৬ সালে ২.২ গুণ ও ২০২০ সালে ৩.৮ গুণ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি হাওর এলাকায় পতিত জমি, কৃষি জমি ও বনজ এলাকাও কমেছে আশংকাজনকভাবে। হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মধ্যে ১৯৮৮ সালের তুলনায় ২০২০ সালে শুষ্ক মৌসুমের জলাভূমির পরিমাণ সিলেটে ৭৫ ভাগ, সুনামগঞ্জে প্রায় ৮০ ভাগ, নেত্রকোনায় প্রায় ৯০ ভাগ, কিশোরগঞ্জে প্রায় ৮৫ ভাগ, ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় প্রায় ৭০ ভাগ,  হবিগঞ্জে প্রায় ৯০ ভাগ এবং মৌলভীবাজারে প্রায় ৭০ ভাগ হ্রাস পেয়েছে।

অধ্যাপক আদিল বলেন, ১৯৮৮ সাল থেকে হাওরের শুষ্ক মৌসুমের জলাভূমির পরিমাণ প্রায় ৫ ভাগের ১ ভাগে হ্রাস পায় এবং বাকি ৪ ভাগ জমিতে বসত-বাড়ি, সড়ক সহ বিভিন্ন ধরনের নির্মিত এলাকা তৈরি হবার কারণে (বিল্ট আপ এরিয়া) ধূসর অবকাঠামোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। হাওর এলাকার উল্লেখযোগ্যভাবে  জলাভূমি ধ্বংস হয় ২০০০-২০০৬ ও ২০০৬-২০১৩ সময়কালে। আইপিডি’র নির্বাহী পরিচালক বলেন, জলাভূমির পরিবর্তন জীববৈচিত্র্যে তাৎপর্যমুলক প্রভাব ফেলছে যা উপেক্ষা করে জলবায়ু পরিবর্তন ও বন্যার প্রভাব মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।। পূর্ববর্তী বছরগুলো থেকে বর্তমানে বন্যার ভয়াবহতা আরও বেশি হওয়ার কারণ অতিবৃষ্টি- নদী-নালার নাব্যতা সংকটের পাশাপাশি জলাভূমির ভরাট করে বাড়িঘর ও বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মান। ২০১২ সালে হাওর এলাকার মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন হবার পর এই ধ্বংসের পরিমাণ কিছুটা কমতে থাকে।

তিনি আরও বলেন, “হাওর এলাকা রক্ষা ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের যথাযথ তদারকির  মাধ্যমে হাওর অঞ্চল কিছুটা হলেও রক্ষা করা সম্ভব। সারা বাংলাদেশের হাওর এলাকার ভূমি রক্ষা করা ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে বন্যা ব্যবস্থাপনা ও প্রতিবেশ রক্ষা করা সম্ভবপর নয়।”

 

 

পরিকল্পনাবিদ ইনজামামউল হক রিফাত বলেন, স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণে নানাবিধ চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করেই এই গবেষণা সম্পন্ন করা হয়েছে। হাওর এলাকার জলাভূমির আশংকাজনক পরিবর্তন এখনই রোধ না করা গেলে এই এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি বন্যার আশংকা আরো ব্যাপকতর হবে।

এই সংলাপে আই.পি.ডির পরিচালক পরিকল্পনাবিদ আরিফুল ইসলাম বলেন, এবারের বন্যার জন্য দায়ী আন্তঃ দেশীয় নদীর অতিরিক্ত পানির প্রবল চাপ, পলি জমাটের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা সংকট ও নদী-জলাশয়ের পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়া।  আমাদের উৎকন্ঠার জায়গা, হাওর এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম টেকসই হচ্ছে কিনা।  ভৌগোলিক স্বাতন্ত্য থাকবার কারণে হাওর এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ-প্রতিবেশকে গুরুত্ব দেবার আহবান জানান এই পরিকল্পনাবিদ।

চৌধুরী মোঃ যাবের সাদেক বলেন, “হাওর অঞ্চলের বর্তমান আয়তন যাতে আর ১ শতাংশও না কমে তার জন্য ডিজিটাল মনিটরিং এর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পরপর ইমেজ অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে এর পরিবর্তন বুঝা যায় এবং সে অনুসারে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। হাওর এলাকার মহাপরিকল্পনা, সরকারি আইন এবং বিধিবিধান এর যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের হাওর অঞ্চল সংরক্ষনে সচেষ্ট হতে হবে।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও পরিকল্পনাবিদ ফরহাদুর রেজা বলেন, এবারের বন্যার কারন যদিও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে সর্বোচ্চ কতটুকু বৃষ্টি হতে পারে তার একটা সম্ভাব্য প্রজেকশন ও হাওর এলাকার জলধারণ করবার সক্ষমতা জানা থাকলে এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্যোগ মোকাবিলা আমাদের জন্য সহজতর হবে। হাওর এরিয়ার জন্য সেখানে কতটুকু রোড দরকার, ডিমান্ড অ্যানালাইসিস এবং ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট এর মাধ্যমে ইনট্রিগ্রেটেড পদ্ধতিতে মাস্টার প্ল্যান তৈরীর করে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সেখানকার জীবন-মানের উন্নয়ন সম্ভব।”

আইপিডি আয়োজিত সংলাপে আরো বলা হয়, আমাদেরকে বাঁচতে হলে সামনের দিনগুলোতে আমাদের হাওর-বাঁওর, নদী-খাল, জলাশয়-জলাভূমি প্রভৃতি প্রাকৃতিক জল ধারণ এলাকা আমাদের সংরক্ষণ করতেই হবে, টেকসই উন্নয়নে এর কোন বিকল্প নেই। আমাদের উচ্চ আদালত ঘোষিত এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জীবন্ত সত্বাসমূহের দখল-ভরাটের সাথে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় নিয়ে যথাযথ প্রতিবিধান করে এগুলো

পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি আমাদের ভূমি শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী পরিবেশ-প্রতিবেশগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাসমূহে যে কোন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প ও উদ্যোগ নেবার আগে  পরিবেশগত সমীক্ষা ও   পরিকল্পনাগত প্রভাব বিশ্লেষণ প্রতিবেদন তৈরি করা প্রয়োজন। আমাদের বন্যার সাথে সহবাস করবার মৌলিক নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে হাওর এলাকা রক্ষা করতে হবে – এর অন্যথা হলে সামনের দিনগুলোতে আমাদের বন্যা দূর্যোগের ভয়াবহতা আরো বাড়তে পারে, যা মোকাবেলা করা আমাদের রাষ্ট্র-সরকার ও সাধারণ জনগণের জন্য কোনভাবেই সম্ভবপর হবে না।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular