লঞ্চে অগ্রিকান্ডে প্রাণহানি : নৌযান মালিকদের থেকে ক্ষতিপূরণ দাবীতে মানববন্ধন পবা’র

লঞ্চে অগ্রিকান্ডে প্রাণহানি : নৌযান মালিকদের থেকে ক্ষতিপূরণ দাবীতে মানববন্ধন পবা’র

লঞ্চে অগ্রিকান্ডে প্রাণহানি : নৌযান মালিকদের থেকে ক্ষতিপূরণ দাবীতে মানববন্ধন পবা’র

 

ঢাকা ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ :

 

যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য তুলনামুলক ভাবে সহজ ও ব্যয় সাশ্রয়ী হবার কারনে মানুষ নৌ-পথকে গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করে আসছে প্রাচীনকাল থেকেই। নৌ-পথের গুরুত্ব বিবেচনা করে অন্যান্য দেশ যাতায়াত ব্যবস্থাকে আধুনিক ও নিরাপদ করলেও আমাদের দেশে নৌ-পথের নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

আমাদের বিভিন্ন নৌ-রুটে অসংখ্য যাত্রী ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাতায়াত করছে এবং প্রায় দুঘর্টনায় শিকার হচ্ছে। বারবার আমাদের দেশের নৌ-পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও এর কোন সুরাহা হয়নি। অহরহ নৌ-পথে দুঘর্টনা ঘটছে এবং ভোগান্তি হচ্ছে যাতায়াতকারী যাত্রীদের। শত শত প্রাণ হারালেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না।

অনিয়ম ও দুর্নীতি বিরাজ করছে নৌ-পরিবহন ব্যবস্থাপনায়। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩টায় এমভি অভিযান-১০ নামে যাত্রীবাহী লঞ্চে এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। এতে নিহত হয় ৪৪ জন, হাসাপাতালে নেওয়া হয়েছে শতাধিক জনকে। এইসব দুঘর্টনা মেনে নেওয়া যায় না।

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর ইতিমধ্যে প্রাথমিক তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেছে; এটা ভালো উদ্যোগ। আমরা চাই দুঘর্টনায় প্রাণ হারানো এবং আহত ব্যক্তির প্রত্যেক পরিবারকে লঞ্চ মালিকসহ দায়ীদের পক্ষ থেকে ক্ষতি পূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা প্রদান করার জন্য এবং সারা জীবন চলার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করার দাবী জানায়।

আজ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান-এর সভাপতিত্বে, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) সহ ১৫াট সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ২৮ ডিসেম্বর ২০২১, মঙ্গলবার, সকাল ১১ টায়, জাতীয় জাদুঘরের সামনে“ নিরাপদ নৌ-চলাচলের জন্য নৌ-অগ্নিকান্ডে মালিকসহ দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নৌযান মালিকদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় নিশ্চিত কর” শীর্ষক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র চেয়ারম্যান আবু নাসের খান ও নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলন সদস্য সচিব আমিনুর রসুল এর সঞ্চালনায় উক্ত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন পবা’র সাধারণ সম্পাদক প্রকৌ. মো. আবদুস সোবহান, নাসফ-এর সাধারণ সম্পাদক মো: তৈয়ব আলী, পুরান ঢাকা নাগরিক উদ্যোগ এর সভাপতি নাজিমউদ্দীন, নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষাকারী কমিটি এর সাধারণ সম্পাদক আশিশ কুমার দে, নাসফ’র সহ সম্পাদক মো: সেলিম, মানবাধিকার সংরক্ষণ ফোরাম এর মহাসচিব মাহবুল হক, মৃত্তিকা’র সভাপতি খাদিজা খানম, বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট সাইক্লিস্ট এর প্রধান সমন্বয়ক রোজিনা আক্তার, নাসফ’র সহ সভাপতি কে এম সিদ্দীক আলী, নোঙ্গর এর সভাপতি সুমন শামস প্রমুখ।

মানববন্ধনে সম্প্রতি ঝালকাঠি সুগন্ধা নদীতে ঘটে যাওয়া লঞ্চে অগ্রিকান্ডে প্রাণহানির ঘটনায় পবা’র নেতৃত্বে একটি বেসরকারী কমিটি গঠন ও আগামী ৭ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পরিদর্শন ও বিভিন্ন স্টেক হল্ডার এর সাথে মত বিনিময় মাধ্যমে কি কি অনিয়ম রয়েছে তার সুপারিশসহ একটি পূণাঙ্গ রির্পোট জন সম্মুখে প্রকাশ করা হবে এবং তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এছাড়াও মানববন্ধনে নিরাপদ নৌ-চলাচলের জন্য নৌ-অগ্নিকান্ডে মালিকসহ দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নৌযান মালিকদের কাছ থেকে আহত ও নিহত পরিবারকে জীবন জীবিকা প্রতিষ্ঠার জন্য পুর্নবাসনে সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ আদায়ে দাবী জানানো হয়।

সভায় বক্তরা বলেন-মহান স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশ অনেক বদলে গেছে এবং বদলে যাওয়ার কাতারে রয়েছে যোগাযোগ খাতের অন্যতম নৌপথ। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দিতে দেখা যায়, দেশের নৌ-পরিবহন সেক্টরের রয়েছে যেমনি সমৃদ্ধ ইতিহাস, গুণগতমান উন্নয়ন এবং নিরাপদ-নির্বিঘেœ নৌচলাচল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রশংসনীয় ভূমিকা; পাশাপাশি রয়েছে প্রতিনিয়ত দখল, ভরাট, দুষণ, দুর্নীতি, দুর্ঘটনা, অপরিণামদর্শী উন্নয়ন বা অপরিকল্পিত নগরায়ন-শিল্পায়নসহ মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের শিকার হয়ে নদী ও নৌপথের করুণ চিত্র। বিগত পাঁচ-ছয় দশকে নদীমাতৃক এই দেশ থেকে হারিয়ে গেছে ৫২০ নদী। ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ থেকে উধাও হয়ে গেছে ১৮ হাজার কিলোমিটারের বেশি নৌপথ। এখন বর্ষায় প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও শুষ্ক মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩৪৭ কিলোমিটারে। এরমধ্যে বেদনাদায়ক হল, গত ৫০ বছরে নৌদুর্ঘটনায় ২০ সহ¯্রাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন শত শত মানুষ, স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অনেকে।

আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার) ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে দেশের মোট যাত্রীর ৫৪ শতাংশ সড়কপথে, ৩০ শতাংশ রেলপথে ও ১৬ শতাংশ অভ্যন্তরীণ নৌপথে যাতায়াত করত। ১৯৯৬ সালেও নৌপথে মোট যাত্রীর ১৫ শতাংশ যাতায়াত করত। ২০০৫ সালে একটি কমে হয় মাত্র ৮ শতাংশভৌগোলিক কারণে অনেক নদীর পানি কমে যাওয়া, নদী-খাল দখল হয়ে যাওয়া, ভারত থেকে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নদ-নদী ও খাল খনন না করা এবং বাজেটে এ খাতে উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ কম রাখা উল্লেখযোগ্য। উন্নত ও আধুনিক যাতায়াতের নামে সড়কপথের প্রতি অধিক মনোযোগের বিষয়টিও নৌপথকে উপেক্ষার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। উপকূলীয় জেলাগুলোতে নৌপথ প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকান্ড হিসেবে এর প্রসার ঘটলেও নদীতীরবর্তী এলাকা এবং হাওড় অঞ্চলে তেমন প্রসার ঘটেনি। হাওড় অঞ্চলে অবস্থা আরো সমস্যাসংকুল, চরম অব্যবস্থাপনা এমনকি সরকারের কাছেও এ সকল নৌপথ গুরুত্বহীন। যার প্রমাণ নদী ও হাওর অঞ্চলে ট্রলারডুবি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লঞ্চ দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু।

মানববন্ধনে বিশেজ্ঞরা বলেন, ৫০ বছরে বিভিন্ন নদীতে ২ হাজার ৫৭২টি নৌদুর্ঘটনায় ২০ হাজার ৫০৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, আহত হয়েছেন শত শত মানুষ। অস্থাবর সম্পদ ধ্বংস হয়েছে ৩ হাজার ৪১৭ কোটি ২০ লাখ টাকার। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের ৮০ ভাগ লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটেছে ত্রুটিপূর্ণ নকশার নৌযান ও অদক্ষ চালকের কারণে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত দেশে ৫৬৫ টি বড় ধরনের নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে যেখানে মৃতের সংখ্য প্রায় ৯ হাজারের উপরে। এ সকল দুর্ঘটনার পর সরকার দুর্ঘটনা এড়াতে এক বা একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং কমিটিগুলো দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে কিছু পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা দিয়ে প্রতিবেদনও দাখিল করেছেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ৫৬৫ টি নৌ দুর্ঘটনার বিপরীতে ৮৬৩ টি তদন্ত কমিটি সুপারিশ প্রণয়ন করে প্রতিবেদন জমা দিলেও সেগুলো যেমন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি, তেমনি এগুলোর কোনো সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি। অনুসন্ধানে যে তিনটি মূলক্ষেত্রকে কারণ হিসেবে তুলে ধরা যায় তাহলো-

নৌযান অবকাঠামো ও মালিক কেন্দ্রিক কারণের মধ্যে- ত্রুটিপূর্ণ নৌযান, অদক্ষ মাস্টার/চালক ও ইঞ্জিন অপারেটর, চালকের অবহেলা, অসাবধানতা, বেপরোয়া মনোবৃত্তি, বায়ু প্রবাহ পরিমাপের ব্যবস্থা না থাকা, আবহাওয়া পূর্বাভাস ও প্রচলিত আইন অমান্য করা, অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন, মালিকের অতিরিক্ত মুনাফাবৃত্তি, চলার পথে প্রতিযোগিতা ও নির্ধারিত পথে না গিয়ে প্রবল ঘূর্ণিস্রোতের মধ্যে দিয়ে লঞ্চ চালনা, যাত্রীদের সাথে অসদাচরণ ও মারধর করা, কুয়াশার মধ্যে যথাযথ সতর্ক ব্যবস্থা না নেয়া অন্যতম কারন।

নৌযান নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রিক কারণ- দায়িত্বহীন নৌ কর্তৃপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা, সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের দুর্নীতির মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন ও সার্ভে সনদ প্রদান, সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের পরিদর্শকদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা। নিয়মিত ও কার্যকর নৌযান পরদর্শন ব্যবস্থা না থাকা, আগে জাহাজ নিমার্ণ করে পরে নকশা অনুমোদন করা। পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের অভাব এবং অনৈতিক অর্থ উপার্জনের মানসিকতা, ল্যান্ডিং স্টেশনের অব্যবস্থাপনা ও ত্রুটি, পর্যাপ্ত বয়া-বিকন বাতি, মার্কা না থাকা, প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও লঞ্চ চালনার সুযোগ দেয়া, যাত্রী সংখ্যা যাচাই না করেই মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ঘাট ছেড়ে যাওয়ার অনুমতিপত্র দেয়া।

সর্বশেষ